প্রথমেই কিছু টুকরো কথা স্মরণ করে নিই-
"আমরা রেলের জমিতে বসে নেই; রেল আমাদের জমিতে বসে আছে" (কুড়মিদের 'রেল টেকা– ডাগার ছেকা' আন্দোলনের সময়ে টাইগার জয়রাম মাহাতো এই কথা বলেন)।

চিত্রণ তথাগত
রেলের ইতিহাসের সঙ্গে উচ্ছেদের ইতিহাস আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। শুধু মানুষেরই উচ্ছেদ নয়। বনভূমি, জীব বৈচিত্র্য এই সমস্ত কিছুর উচ্ছেদের বিনিময়ে আমরা গতি পেয়েছি, আমাদের সভ্যতার চাকা এগিয়েছে! এমন ভয়ঙ্কর বনভূমির ধ্বংস হয় যে, তা’ পুনরুদ্ধার করতে বৃটিশরা একটি সম্প্রদায়ের জন্ম দিয়ে ফেলে; 'টঙ্গিয়া' যাদের নাম। এই টঙ্গিয়া’রা ন্যাশনাল পার্কের মত বিরাট বিরাট বনভূমি গড়ে তুললো, অথচ, জমির অধিকার থেকে শুরু করে নানাবিধ সাংবিধানিক অধিকার থেকে তারা আজও বঞ্চিত। এই ইতিহাসের গভীরে আর বেশি যাব না।
‘হরিদাসের বুলবুল ভাজা টাটকা তাজা খেতে মজা
এ ভাজা খেলে পরে রোচবে না আর খাজা-গজা।
মহারানী ভিক্টোরিয়া এ ভাজা খায় রোজ কিনিয়া
ভাজা খেয়ে বোঝে না সে কেবা রাণী কেবা প্রজা।'
রেলপথ হল, উচ্ছেদ হল, বহু মানুষ পেটের তাগিদে রেল ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনভাবে হকারি করতে নামলেন। এই হকারদের হাঁকডাক, বাচনভঙ্গি থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু গান, কবিতা, সাহিত্য তৈরি হল। সম্প্রতি একজন বাদমওয়ালার গান নিয়েও ভীষণ হইচই হল। কিন্তু এসব আর হবে না; বুঝলেন। 'ছোটলোকের' সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব আর কিছুই রাখা হবে না; কারণ, মহারাণী ভিক্টোরিয়া বুলবুল ভাজা খেয়ে রাণী আর প্রজার তফাৎ ভুললেও, এদেশের প্রধানমন্ত্রী (এককালে রেল ষ্টেশনে চা বেচতেন) ঝালমুড়ি খেয়েও মনুবাদের শপথ ও কর্পোরেটদের খাওয়া-পড়া কিছুতেই ভুলতে পারেননি। তাই মনুবাদ থাকলে ছোটলোক থাকবে পায়ের তলায় আর কর্পোরেট থাকলে গরিব থাকবে জোঁকের খাঁচায়।

চিত্রণ তথাগত
কাছাকাছি যাওয়া
লেখাটি শুরু করি, নতজানু হয়ে। হাঁটু মুড়ে বসে। বেলঘরিয়া ষ্টেশনে প্ল্যাটফর্মের উপর বস্তা পেতে নানান রঙের পাপড় বিক্রি করা অন্ধ হকারটির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে থমকে গিয়েছিলাম, কী বলে বা কী-ভাবে কথা বলা শুরু করব! কারণ, অন্ধ মানুষদের সঙ্গে কথোপকথন বা ভাব বিনিময় করার অভ্যেস আমার নেই। আগে তার হাতের উপর হাত রেখে স্পর্শ করি, ছুঁয়ে থাকি। তারপর কথা বলা, কথা শোনার পর্বটি চলেছিল হাতের পরে-হাত ছুঁয়ে রেখে।
দর্শন শাস্ত্রে অনার্স করে; ছাত্র পড়িয়ে সংসার চালিয়েছেন ১৮ বছর। কয়েকবছর আগে গ্লুকোমা’র জন্য পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গিয়েছেন। তারপর থেকেই এই হকারির জীবন। পাঁপড় আর বড়ি বিক্রি করেন। ওনার ছেলের বয়স ১৩। ষষ্ঠ শ্রেণী অবধি পড়ে অভাবের কারণে স্কুল ছুট হয়ছে তার এক মাত্র ছেলে। ছেলের চোখেও সমস্যা ধরা পড়েছে। বাবার সঙ্গেই ষ্টেশনে বসে, সঙ্গে থাকেন ওর রুগ্ন মা।
'বাধ্য হয়ে ছেলেকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছি', এ- কথা বলা হকার-পিতা, আবার 'আমার তো ছেলে নেই, মেয়ে; তার-তো আমিই সম্বল! আমি শেষ হলে সব শেষ', এমনতর কথা বলেছেন বেশ কয়েকজন অসহায় পিতা।
মে মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখ নাগাদ বেলঘরিয়া ষ্টেশনের সমস্ত প্ল্যাটফর্ম ও ৪নং প্ল্যাটফর্মের রাস্তার পাশে সকল দোকান ও গ্যারেজে ২১ মে উচ্ছেদ করবার নোটিশ পড়ে। আমরা বেলঘরিয়ার বেশ কয়েকজন গণ আন্দোলনের কর্মী বন্ধুরা মিলে ৫৯ টি দোকানদারদের কাছে গিয়ে সমীক্ষা করি। এই সমিক্ষা থেকে উঠে আসা টুকরো-টুকরো কথা, তথ্য, অভিজ্ঞতা ও মনে হওয়া, এই লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করছি। অভাব, অনটন, মর্মান্তিক আক্রমণ, চোখের জল এইরকম বাস্তবিক কথায় এই লেখাটি ভরিয়ে তোলা যেত। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেছি হকারদের শুধুমাত্র আজকের জীবন্ত-বলি হিসেবে না-দেখে তাদের যাপিত জীবনের উপর দৃষ্টিপাত করতে।

চিত্রণ তথাগত
ঋণী করেছে ব্যবস্থা
এক প্রকার সামাজিক সম্পর্কের দায়িত্ব, শ্রেণীর ঋণ শোধ করার তাগিদেই আমরা হকারদের কাছে পৌঁছেছিলাম। পৌঁছে দেখি, সন্তানের পড়াশোনা, নিজেদের চিকিৎসা ও ভোগ্যপণ্য বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় চোখ ফিরিয়ে না-থাকতে পারার বাধ্যতায় কম বেশি প্রায় সকলেই ঋণে জর্জরিত। একজন চা বিক্রেতা হকার স্পষ্টভাবে বললেন স্ত্রী’র বাইপাস অপারেশনের পর থেকে যে লোন নেওয়া শুরু হয়েছে, তা’ আজ একটার পর একটা নিয়েই চলেছি। একটা লোন মেটাতে আর-একটা লোন নিতে হয়। বয়স্ক মা-কে সঙ্গে নিয়ে ডিম-পাউরুটি বিক্রেতা তার মেয়েকে আনিমেশন পড়াচ্ছেন ব্রেন ওয়ার ইউনিভারসিটিতে। যার খরচ ৪ বছরে ৬ থেকে সাড়ে ৬ লক্ষ টাকার মত। বুঝতেই পারছেন লোন নিতেই হবে। কথা বলে জানতে পারলাম টাটা ক্যাপিটাল, আই ডি এফ সি প্রভৃতির মতো নামী অনামী প্রাইভেট সংস্থাগুলো থেকেই মূলত চড়া সুদে এই লোনগুলি পাওয়া যায়। এরপর স্থানীয় সুদ কারবারিরা-তো আছেই। টাকা পাওয়া-তো হল, মাসিক কিস্তি দিতে না-পারলেই চলে সামাজিক-মানসিক হেনস্তা। খোঁজ নিলেই দেখা যাবে এই সমস্ত প্রাইভেট সংস্থাগুলি বাউন্সার বা পাতি বাংলায় বললে গুন্ডা বাহিনী পোষে কিস্তি আদায়ের জন্য।
২০২৫ সালে খোদ ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর বলেন - “ক্ষুদ্রঋণ(মাইক্রোফিন্যান্স) সেক্টর এখন অতিরিক্ত ঋণভার, উচ্চসুদের হার এবং ঋণ আদায়ে জবরদস্তিমূলক ও চাপ প্রয়োগকারী পদ্ধতির মত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে।” তাহলে দিন শেষে মানুষগুলির জুটলো কী ? আর্থিক অনিশ্চয়তা কাটাতে গিয়ে মিলল সামাজিক ও মানসিক হেনস্তার ঝুঁকি। আর এই অবস্থাতেও হকারকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ক্রেতার সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যেতে হবে, বেফাঁস মেজাজ দেখালেই সেই ক্রেতা হয়ে যেতে পারেন হকার উচ্ছেদের পক্ষে ট্রেনে-বাসে-সোশ্যাল মিডিয়ায় গলা ফাটানো মানুষ। আশ্চর্যের বিষয় এই যে সেই ক্রেতার জীবনেও রয়েছে অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি, হতাশা!
যৌথতার ভাঁটা
৮১ বছর বয়সী ফল বিক্রেতা, ৬১ বছরের হকারির জীবন। সংসারের ছোটো ভাই বোনের দায়িত্ব নিতে নেমে পড়েছিলেন হকারি করতে। যে সময়ে সাক্ষাৎকার নিতে যাই, তখন ভর দুপুর, ষ্টেশনে খালি ঝুড়ি নিয়ে বসেছিলেন। মার্কেটে চড়া দাম, ফল আনেননি, ওই দামে ফল এনে বেলঘরিয়ায় বেঁচে পত্তা করতে পারবেন না। এক সময়ের পারিবারিক যৌথতার শক্তি ওনাকে সাহস জুগিয়েছিল ষ্টেশনে হকারী করার। যৌথতার শক্তিতে ঝুঁকিও নিতে পারতেন। আজ পরিবার টুকরো হয়েছে, যৌথতা নেই, নিজের আর স্ত্রীর পেটের জন্য যেটুকু যা লাগে। ছেলে মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছেলে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। তাই বৃদ্ধ বাবাকেই এখনও নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হচ্ছে। তিনি আরও বললেন, এমন সময়ও ছিল যে, বিপদের সময়ে অনেক নিত্য ক্রেতা নিঃশর্তে কিছু পুঁজি দিতেন কিংবা অন্যভাবে সহযোগিতা করতেন। আবার ব্যবসা ভাল হলে, উনি ঋণ শোধ করতেন।
ওনার এই সমস্ত কথা শুনতে-শুনতে প্রশ্ন করি, সমাজকে তো ভীষণভাবে বদলে যেতে দেখলেন? ঘৃণা বেড়ে গেছে বলে মনে হয়? ক্রেতা-বিক্রেতার যৌথতা, হকারদের একে অপরের সঙ্গে যৌথতা, মমতা এসেবেও তো ভাটা পড়েছে; না-কি ? কাল যারা 'মুসলমান আমাদের দুর্ভোগের কারণ' বলছিল, আজ তারাই কী আপনাদের জবর দখলকারী বলছে ? বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন 'ঘৃণা' বেড়েছে। হয়তো চুপ করে থাকা সময়টুকুতে 'মুসলমান দুর্ভোগের কারণ' বলা লোকগুলির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে একটু যাচাই করে নিলেন।
প্ল্যাটফর্মের উপর স্থায়ী কাঠামোর দোকানের সঙ্গে মেঝেতে বসা দোকানদারদের সরাসরি সংঘাত না থাকলেও রয়েছে একটা চাপা বিভাজন। যা প্রকাশ হয় না ঠিকই কিন্তু একটু খোঁচা পেলেই প্রকাশ হওয়ার সম্ভবনা তৈরি হয়। সদ্য বছর খানেক দেওয়া দোকানের সঙ্গেও রয়েছে দীর্ঘদিনের দোকানদারদের একইরকম চাপা বিভাজন।
এই চাপা বিভাজন কে উস্কে দিতে চেষ্টা করেছিল 'বিএমএস' এর মতো সংগঠন। বেলঘরিয়ার হকারদের কে তারা জানায় বা আশ্বাস দেয় যে, নতুন বসা দোকানগুলি কে পুরানো হকাররা চিহ্নিত করুক, সেগুলিকে সরিয়ে দিল পুরানো হকারদের আর কোনো সমস্যাই থাকবে না। যৌথ উদ্যোগে প্রাথমিকভাবে এই বিভাজন কে রোখা গেছে।
সর্বপরি আমাদের যৌথতার ভাঁটা এমনই যে, বহু জায়গায় দেখা গেছে প্ল্যাটফর্মের হকার উচ্ছেদ হলে রাস্তার হকার রুখে দাঁড়াচ্ছে না কিংবা রেল বস্তির উচ্ছেদ হলে বস্তিবাসীদের সঙ্গে হকাররা রুখে দাঁড়াচ্ছে না।

চিত্রণ তথাগত
বিশ্বাসে আঘাত
'৪০০ বছর পর রাম কে আনলাম, রাম মন্দিরে পুজো দিয়ে এসে এই সরকারকে আনলাম, আর এরা এসেই আমাদের সঙ্গে এসব করছে...' ঠিক এই কথাটিই বলেছিলেন বেলঘরিয়া ষ্টেশনের মেঝেতে বসা বৃদ্ধা ফুল বিক্রেতা।
১৮৪৪ সালে মার্ক্সের লেখা বাক্যটি আর-একবার দেখে নিই— “ধর্মীয় দুঃখবোধ একই সঙ্গে বাস্তব দুঃখের প্রকাশ এবং বাস্তব দুঃখের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ধর্ম হলো নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন সমাজের হৃদয়, আত্মাহীন পরিস্থিতির আত্মা। ধর্ম জনগণের আফিম।” এ-দেশের শ্রমজীবী মানুষ যে দুঃখ, দুর্দশা ও অনিশ্চিয়তার মধ্যে জীবন কাটায় তাদেরকে নিঃসন্দেহে তাদের আরব্ধ দেবতা মনস্তাত্ত্বিক শক্তি যোগায়, আশা যোগায়। এই গরীবদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলরের কাছে যাওয়ার পয়সা নেই কিংবা এদেশে এখনও সে সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। কাউন্সিলরের কাছে যাওয়ার চল থাকলেও তা’ কতটা কার্যকরী উপাদেয় ভূমিকা রাখতো সে নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে। কারণ, এদেশের ব্যথানাশক বৈজ্ঞানিক ওষুধ প্যারাসিটামলেও ভেজাল, এর থেকে এই মানুষগুলির কাছে সস্তার ব্যথানাশক আফিমের ব্যবস্থা অনেক সাশ্রয়ী ও উপাদেয়। যা এখনও একটি নকুল দানা, ধূপ ও কুচো ফুলের মত করে নিজের কাছে রাখা যায়।
এই বিশ্বাসকে অস্বীকার করে আমরা এগোতে বা চলতে পারবো না। এই হকার উচ্ছেদ আমাদের দেখায় মানুষের এই বিশ্বাসে আজ টান পড়েছে। অবচেতন মনে হলেও টান পড়েছে। বেলঘরিয়া ষ্টেশনে ২১ মে উচ্ছেদের দিন সকাল থেকেই দোকানিরা তাদের দোকানের মালপত্র সরিয়ে নিতে থাকেন অন্যত্র। সমস্ত কিছু সরিয়ে ফেলার পরও ফাঁকা দোকানগুলিতে রয়ে যায় ঈশ্বরের মূর্তি, বাঁধানো ফটো। তারা হয়তো আর বিশ্বাস ধরে রাখতে পারলেন না কিংবা ভাবলেন তাদের আরব্ধ দেবতা দোকান আগলে রাখবেন। কিন্তু হল না, বেশ কয়েকটি দোকান হাতুড়ি আর শাবলের ঘায়ে ঈশ্বর সমেত তছনছ হয়ে গেলো।

ছবি সৌরভ
নোটিশের দিন থেকে উচ্ছেদের দিন
নোটিশ পড়ার দিন কয়েক পর থেকেই সিটু’র ব্যানারে লাগাতার মিছিল, মিটিং-এ হকাররা অংশগ্রহণ করে। আমরা বেলঘরিয়ার বিভিন্ন গণ আন্দোলনের কর্মীরা হকারদের এই অংশগ্রহণকে সম্মান জানিয়ে, বলেছি ওনারা যখন যেই কর্মসূচি নেবেন আমরা তা’তে যৌথভাবে উপস্থিত থাকবো, আমরা আলাদা করে এই মুহূর্তে মিটিং, মিছিল সংগঠিত করবো না। সিটু’র স্থানীয় নেতৃত্বকেও আমরা একই কথা জানাই এবং প্রস্তাব দিই, স্থানীয় নাগরিক এবং গণ সংগঠনকে যুক্ত করে যৌথ কর্মসূচি নেওয়ার। এরপর হকার বন্ধুরা আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচির খবর দেন আমরা উপস্থিত থাকি। সিটু’র নেতৃত্বের তরফ থেকে আর কোনও প্রস্তাব বা খবর আমরা পাইনি। উচ্ছেদের আগেরদিন রাতে ষ্টেশন মাষ্টার, হকার ও সিটু’র নেতৃত্বদের মিটিং-এ ঠিক হয়, ৪নং প্ল্যাটফর্মের পাশেই একটি অব্যবহৃত ৫নং লাইন রয়েছে যেটি ভবিষ্যতে চালু হবে, তাই ৪নং’র হকারদের উঠতেই হবে। সেখানে মধ্যস্থতা করে ঠিক হয় ৪নং প্ল্যাটফর্মের একটা অংশের হকারদের তুলে তাদেরকে ৪নং’র আর-এক দিকের বিভিন্ন ফাঁকা অংশে বসতে দেওয়া হবে। উচ্ছেদের দিন এই কথা উড়িয়ে দিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ জানায় ৪নং পুরোটা খালি করা হবে। তারপর দীর্ঘক্ষণ রেলের আধিকারিকদের সঙ্গে হকার ও সিটু নেতৃত্বের বচসা হয়। শেষে আগের কথা মতোই কাজ হবে ঠিক হয়। এরপর হকাররা প্ল্যাটফর্ম জুড়ে মিছিল করে, সিটু’র নেতৃত্বে। ঠিক বেলা ১২টা নাগাদ স্টেশনে ফোর্স ঢোকে। সিটু’র নেতৃত্বরা সেই সময়ে ষ্টেশনে মিছিল সমাপ্ত করে। সকালের কথা মত কয়েকজন হকার নিজেদের দোকান ৪নং’র এক অংশ থেকে সরিয়ে ফেলতে শুরু করে এবং কতৃপক্ষকে জানান রাতের মধ্যে বাকিগুলো তারা সরিয়ে ফেলবে। এরপরই অদ্ভুতভাবে ফোর্স ঢুকেছে দেখা সত্ত্বেও সিটু’র নেতৃত্বরা সেখান থেকে চলে যায়। রেল কতৃপক্ষ কথার খেলাপি করে ৪নং প্ল্যাটফর্মের বেশ কয়েকটি দোকান ভেঙে ফেলেন; যেখানে হকাররা বারবার বলতে থাকেন তারা নিজেরাই রাতের মধ্যে সরিয়ে দেবেন, সে-সবে কর্ণপাত না-করে ভাঙার কাজ চলতে থাকে এবং প্ল্যাটফর্মের রাস্তার পাশের গ্যারেজের শেডগুলিও ভাঙা পড়ে।
উচ্ছেদের পর
এক মাস কেটে যাওয়ার পরও, এখনও কথামতো অনেকে ষ্টেশনের অন্য অংশে জায়গা পায়নি। এবং যারা জায়গা নিয়ে বসেছেন তাদের প্রতিদিন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
ছাউনি দেওয়া যাবে না, আসে পাশে ঘেরা যাবে-না, এরকম অবস্থায় তারা বসচ্ছেন।
১ জুন সোমবার, ‘২৬ বিভিন্ন গণ সংগঠন ও ব্যক্তিদের যৌথ উদ্যোগে গণ স্বাক্ষর সংগ্রহ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত হয় বেলঘরিয়া ষ্টেশনের ১নং প্ল্যাটফর্মের সামনে। আড়াই ঘন্টায় ৩৩০ জন মানুষ হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সই করেন। নিত্য যাত্রীরা ও হকার বন্ধুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ সভায় নিজেদের কথা সোচ্চারে বলেন। দমদম, সোদপুরের মানুষেরাও এই উদ্যোগে উপস্থিত ছিলেন। এরপর সোদপুর-দমদমে একইভাবে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ হয়, সংগ্রহের সংখ্যাটি প্রায় আড়াই হাজার এবং এই সমস্ত গণ স্বাক্ষরের সঙ্গে দাবি সমূহের স্মারকলিপি গত ৯ জুন শিয়ালদহ ডি আর এম-এর কাছে জমা দেওয়া হয়।

যৌথতা শেষ কথা বলবে
এই এত-কথা বিশ্লেষণ করে লেখার কারণ, মনে করছি মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গের এই সন্ধিক্ষণেই মানুষ নতুন বিশ্বাসকে আপন করতে পারবে বা চাইছে। চরম অনিশ্চয়তার সময় তাঁরা নিশ্চয়তা পেলেই তাকে আগলে ধরবে। প্রতি পদে রাষ্ট্রের কাছে অপমান সয়ে সয়ে তারা কোথাও মর্যাদা পেলে সেখানে ছুটে যাবে। আমরা সে বিশ্বাস, নিশ্চয়তা, মর্যাদা কতখানি যোগান দিতে পারবো বা কীভাবে উৎপাদন করবো তা’ সময় বলবে। যাদবপুরে যে বিশাল মানুষের জমায়েত প্রথমদিন হকার উচ্ছেদকে আটকে দিতে পেরেছিল, তা’ কিন্তু কোনও একক সংগঠনের উপর ভিত্তি করে নয়।
আপাতত, আশা একটাই যৌথতার বীজ বুনে প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতে চেতনাকে আগলে রাখা। এই যৌথতার ফসলই বুলডোজার রুখবে, বিশ্বাস, নিশ্চয়তা, মর্যাদার নবরূপ গড়বে। এই যৌথতার জোরেই, আজকের ৮১ বছরের হকার ২০ বছর বয়সে ঝুঁকি নিতে পেড়েছিলেন। রেল বস্তি, স্টেশনের হকার, রাস্তার হকারদের এক হওয়ার পথই হতে পারে আমাদের পথ। একজন এপিডিআর-এর কর্মী, অধিকার আন্দোলনের কর্মী ও সহভাগী, তথ্যচিত্র নির্মাণের কর্মী হিসেবে গত কয়েক সপ্তাহে হকারদের জীবন ও যাপন থেকে এই শিক্ষাই পেলাম।

কখন ভাঙতে আসবে অপেক্ষা করছেন এক হকার,
বুলডোজারের জন্য এই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে আমদের যৌথতার জোয়ার।
ছবি সৌরভ
(মূল লেখাটি এপিডিআর মুখপত্র 'অধিকার' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৪ জুন। এরপর আরও কিছু অংশ সংযোজন করে ইলাস্ট্রেশন সহ দি ডিগ্রোথ ওয়েব সাইটে প্রকাশিত হলো)
আশু কর্তব্য মানুষের ঐক্য মজবুত করা, সমস্ত প্রতিবাদী মঞ্চের সঙ্গে সহযোগিতা করে গণ আন্দোলন কে দৃঢ় করা। লেখাটি শেয়ার করছি। মানুষের পাশে দাঁড়াতেই হবে আর মানুষ কে বোঝাতে হবে আজ হকারদের পাশে থাকার প্রয়োজনীয়তা, বোঝাতে হবে আমি তো হকার না কেন প্রতিবাদ করবো এই মনোভাব থাকলে একে একে সব মানুষ আক্রান্ত হবে, সবচেয়ে শেষে আমি, কিন্তু আমি যখন আক্রান্ত হবো তখন আমার পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকবে না!