
শান্তির জন্য, ভালোবাসার জন্য...
বেলেঘাটা গান্ধী ভবন থেকে শান্তিনিকেতন পথচলার সূচনা
২ অক্টোবর ২০২৬, গান্ধীজীর জন্মদিন।
এই বিশেষ দিনেই বেলেঘাটার ঐতিহাসিক গান্ধী ভবন, পূর্বতন হায়দারী মঞ্জিল থেকে শুরু হল শান্তির জন্য, ভালোবাসার জন্য এক দীর্ঘ পথচলা। আগামী ১৬ অক্টোবর ঐতিহাসিক রাখিবন্ধন উৎসবের দিনে শান্তিনিকেতনে পৌঁছনোর লক্ষ্য নিয়ে সর্বসেবা সংঘ-এর উদ্যোগে বাংলার বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও শান্তিকামী সংগঠন এবং ব্যক্তিদের সম্মিলিত এই পদযাত্রার সূচনা হয়।
সকাল সাড়ে নটা নাগাদ বেলেঘাটা গান্ধী ভবনে গান্ধী মূর্তিতে সর্বসেবা সংঘ-এর সভাপতি শ্রী চন্দন পাল মহাশয়ের মাল্যদানের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচির সূচনা হয়। উপস্থিত সকলকে শান্তিবাণী পাঠ করান সর্বসেবা সংঘের প্রকাশন কমিটির আহ্বায়ক শ্রী অশোক ভারত মহাশয়। এরপর সমবেত কণ্ঠে গান্ধীজীর প্রার্থনাসভায় বহুল ব্যবহৃত ভজন “রঘুপতি রাঘব রাজা রাম” গাওয়া হয়।

শ্রী দেবাশীষ সেনগুপ্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি” গানটি গেয়ে শোনান। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত সকলেই কণ্ঠ মেলান। অনুষ্ঠানের আবহ আরও গভীর হয়ে ওঠে শান্তি ও সম্প্রীতির নানা বার্তায়। সর্বসেবা সংঘ-এর সম্পাদক শ্রী অরবিন্দ অঞ্জুম স্লোগান তোলেন—“যাহা পরে কদম গান্ধী কে — এক কদম গান্ধী কে সাথ”। বেলেঘাটা গান্ধী ভবনে গাঁধী স্মারক সমিতির সম্পাদিকা শ্রীমতি পাপড়ি সরকার এই পদযাত্রার সাফল্য কামনা করেন। শ্রী চন্দন পাল মহাশয় তাঁর বক্তব্যে এই পথচলার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন। শান্তি, ভালোবাসা, অহিংসা, মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি এবং বিভেদ ও ঘৃণার বিরুদ্ধে জনমানসে সচেতনতা তৈরি করাই এই দীর্ঘ পথচলার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান। অনুষ্ঠানে ২০২৭ সালের সর্বোদয় ডায়েরী প্রকাশ করা হয়। এরপর বাঁশীর সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে সভাস্থল।
এই পথচলার পেছনে যে ভাবনাটি রয়েছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। লিফলেটে রবীন্দ্রনাথের “জয় জগৎ”-এর ভাবনা এবং অতুলপ্রসাদ সেনের “নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান”—এই পংক্তির মধ্য দিয়ে ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের কথাই তুলে ধরা হয়েছে। বুদ্ধ, কবীর, নানক, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, লালন, সুফি-সন্ত, বাউল-ফকির এবং ভক্তি আন্দোলনের সম্প্রীতির ধারাকেও এই পথচলার ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

শুধু বর্তমান নয়, ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাকেও সামনে রেখে লিফলেটে বলা হয়েছে, ভারতীয় সমাজের দীর্ঘ ইতিহাসে ধর্ম, ভাষা ও সম্প্রদায়ের নানা পার্থক্যের মধ্যেও পাশাপাশি থাকার এবং একে অপরের সঙ্গে মিশে যাওয়ার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। জ্যোতিবা ফুলে ও সাবিত্রী ফুলের শিক্ষার উদ্যোগে ফাতিমা শেখের আশ্রয় ও সহযোগিতা, শিবাজীর সেনাবাহিনীতে মুসলমান সেনানায়কদের ভূমিকা, আবার স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত অংশগ্রহণ—এইসব ঘটনাকে সেই ঐতিহ্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই পথচলার সঙ্গে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিও বিশেষভাবে যুক্ত। লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে রাখিবন্ধন উৎসব পালিত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনেই, ১৬ অক্টোবর, শান্তিনিকেতনে পৌঁছনোর লক্ষ্য এই বর্তমান পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী দিক।
গান্ধীজীর সঙ্গে বেলেঘাটার এই স্থানটির সম্পর্কও এই কর্মসূচিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট দেশ স্বাধীন হলেও গান্ধীজী দিল্লির স্বাধীনতা উদযাপনে না গিয়ে দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতায় হায়দারি মঞ্জিলে অবস্থান করেছিলেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনশন করেছিলেন—লিফলেটে সেই ইতিহাসকেই বর্তমান পথচলার অন্যতম প্রেরণা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
গান্ধী ভবন থেকে বেরিয়ে যাত্রীরা কাছেই অবস্থিত কলকাতা হেরিটেজ হিসেবে চিহ্নিত রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহাশয়ের বাড়ি সংলগ্ন জমিতে উপস্থিত হন। সেখানে শ্রী কাজল মুখার্জী মহাশয় রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্রের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সম্পাদক ছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র। তাঁর বাড়ির রাস মন্দিরে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট গান্ধীজী জনসমাবেশ করেছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এই স্থানেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয় শ্রী জীতেন নন্দীর লেখা “পায়ে পায়ে চম্পারণ” এবং চেতনা পত্রিকা (নব পর্যায়)-এর বিশেষ সংখ্যা “দ্বেষ-হিংসার বিরুদ্ধে মহাত্মা ও অহিংসার মন্ত্র”। ফলে প্রথম দিনের পথচলার সঙ্গে গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ, অহিংসা ও মানুষের মধ্যে ভালোবাসার বার্তাও আরও সরাসরি জুড়ে যায়।
এরপর যাত্রীরা বেলেঘাটা থেকে বেরিয়ে শিয়ালদহ ফ্লাইওভার হয়ে বোস ইন্সটিটিউটে পৌঁছন। সেখানে পথসভা হয়। পরে শ্যামবাজার হয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ প্রথম দিনের পথচলা শেষ হয় ডানলপের অখিল ভারত জয়গুরু সম্প্রদায়ের মহামিলন মঠে।
প্রথম দিনের প্রায় ১২ কিলোমিটার পথচলায় মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, বিহার, ঝাড়খণ্ড, আসাম, গোয়া এবং আয়োজক পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা যাত্রীরা অংশ নেন। সারাটা পথ তাঁরা স্লোগান দিয়েছেন, গান গেয়েছেন, রাস্তার দুই পাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং লিফলেট বিলি করেছেন। পথচলা শুধু একটি মিছিলের মধ্যে আটকে থাকেনি; সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং শান্তি ও ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই হয়ে উঠেছিল এই যাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা—বিভিন্ন বয়সের প্রায় শতাধিক মানুষ প্রথম দিনের এই যাত্রায় পা মিলিয়েছেন। তাঁদের হাতে ছিল শান্তির বার্তা, মুখে ছিল গান ও স্লোগান। লিফলেটেও বলা হয়েছে, এই পথচলায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শান্তিকামী মানুষ অংশ নেবেন এবং নাটক, গান ও শিল্পকলার চলমান প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে যাত্রাটি এগিয়ে যাবে।

এই পথচলার বক্তব্যে বর্তমান সমাজে ধর্মীয় বিভাজন, ঘৃণা ও বিদ্বেষের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাসচর্চা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার মতো বিষয়গুলিও সামনে আনা হয়েছে। লিফলেটের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘৃণা ও বিদ্বেষ মানুষের মনকে সংকীর্ণ করে এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও ভালোবাসার জায়গাকে দুর্বল করে। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উদার, যুক্তিবোধসম্পন্ন ও সম্প্রীতিময় সমাজের প্রয়োজনীয়তার কথাই এই পথচলায় তুলে ধরা হচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথের “জনগণমন”-এর দ্বিতীয় স্তবকের ‘হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী’ এবং ‘প্রেমহার হয় গাঁথা’—এই ভাবনাকেও লিফলেটে বর্তমান ভারত-ভাবনার একটি মূল সুর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ভিন্নতা থাকবে, মত ও পথের পার্থক্যও থাকবে, কিন্তু সেই পার্থক্যের মধ্যেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি হবে—এই বার্তাই পথচলার অন্যতম কেন্দ্রীয় বক্তব্য।

২ অক্টোবর বেলেঘাটা গান্ধী ভবন থেকে যে পথচলা শুরু হল, তা তাই শুধুমাত্র একদিনের পদযাত্রা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গান্ধীজীর অহিংসার আদর্শ, রবীন্দ্রনাথের বহুত্ববাদী ভারতভাবনা, বাংলার সম্প্রীতির ঐতিহ্য এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতার আহ্বান। বেলেঘাটার হায়দারি মঞ্জিল থেকে শান্তিনিকেতন পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথচলার প্রতিটি দিনে সেই বার্তাই মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।

আগামীকাল ৩ অক্টোবর ডানলপ মোড় থেকে সকাল সোয়া নটা নাগাদ আবার পথচলা শুরু হবে। গন্তব্য বারাকপুর। এভাবেই এক শহর থেকে আর এক শহর, এক জনপদ থেকে আর এক জনপদ পেরিয়ে ১৬ অক্টোবর শান্তিনিকেতনে পৌঁছবে এই যাত্রা।
শান্তির জন্য, ভালোবাসার জন্য—সত্য, প্রেম ও অহিংসার ভাবনাকে সামনে রেখে শুরু হওয়া এই পথচলা তাই মানুষের কাছে —ঘৃণার বদলে সহমর্মিতা, বিদ্বেষের বদলে ভালোবাসা এবং বিভেদের বদলে সম্প্রীতিকে পাথেয় করে একসঙ্গে চলার আহ্বান।



আলোচনা 1 মন্তব্য