কেন অসমের বন্যা মোকাবিলায় প্রকৌশলের পাশাপাশি প্রয়োজন আদিবাসী প্রজ্ঞা।
একটি কার্টুন, ব্রহ্মপুত্র এবং জলের সঙ্গে সহাবস্থানের বিজ্ঞান।
প্রতি বছর বর্ষা নামলেই ব্রহ্মপুত্র যেন তার আরেকটি রূপ প্রকাশ করে। শীতকালে যে নদী শান্ত ও মহিমান্বিত, বর্ষায় সেই নদীই পৃথিবীর অন্যতম গতিশীল ও অনিশ্চিত নদী ব্যবস্থায় পরিণত হয়। সংবাদমাধ্যমে তখন একের পর এক শিরোনাম—
গ্রাম প্লাবিত, রাস্তা ভেসে গেছে, কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের বন্যপ্রাণী আশ্রয়হীন, লক্ষ লক্ষ মানুষ ত্রাণশিবিরে।
এরপরই শোনা যায় এক পরিচিত প্রতিশ্রুতি—আরও উঁচু বাঁধ, আরও বেশি বাঁধ নির্মাণ, আরও শক্তিশালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো।
কিন্তু একটি আপাতদৃষ্টিতে সরল কার্টুন এই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

কার্টুনটি জিজ্ঞেস করে—
অসমের বন্যা সমস্যার প্রকৃত প্রয়োজন কী? উত্তর আসে, "মিসিং সম্প্রদায়ের মতো আদিবাসী বন্যা-সহনশীল জ্ঞানব্যবস্থাকে জরুরি ভিত্তিতে বিস্তৃত করা।" অন্যদিকে, রাজনীতিবিদেরা আবারও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন আরও উঁচু বাঁধ নির্মাণের।
শেষ ফ্রেমে এক গণ্ডার ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলে—
"আমাদের 'Missing' নয়, 'Mising' হওয়ার মতো সাধারণ বুদ্ধির প্রয়োজন ছিল।"
এই শব্দখেলার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি গভীর বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন—
আমরা কি নদীকে জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাব, নাকি নদীর সঙ্গে বাঁচতে শিখব?
ব্রহ্মপুত্র কোনো সাধারণ নদী নয়, ব্রহ্মপুত্র পৃথিবীর অন্যতম নবীন ও সবচেয়ে গতিশীল বৃহৎ নদী। তিব্বতের মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে হিমালয় অতিক্রম করে অসমে প্রবেশ করা এই নদী বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে। প্রতি বর্ষায় এটি নতুন চর সৃষ্টি করে, পুরোনো তীর ভাঙে, উর্বর পলি ছড়িয়ে দেয় এবং নিজের গতিপথও পরিবর্তন করে।
অর্থাৎ, অসমের বন্যা কেবল একটি "প্রাকৃতিক দুর্যোগ" নয়; এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশগত প্রক্রিয়া। বন্যার জল জলাভূমিকে পুনর্জীবিত করে, ভূগর্ভস্থ জল পুনরায় পূরণ করে, উর্বর পলি ছড়িয়ে দেয় এবং অসমের অসাধারণ জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখে।
সমস্যা শুরু হয়েছে তখন, যখন মানুষ ধীরে ধীরে এই প্রাকৃতিক বন্যাভূমিতেই স্থায়ী বসতি, রাস্তা, শহর এবং কৃষিজমি গড়ে তুলেছে।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রকৌশল:
১৯৫০-এর দশক থেকে অসমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হিসেবে বাঁধ বা এমব্যাঙ্কমেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলি বহু জনপদ ও কৃষিজমিকে নিয়মিত প্লাবন থেকে রক্ষা করেছে।
কিন্তু দীর্ঘ গবেষণা দেখিয়েছে, এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
যখন নদীকে বাঁধ দিয়ে সংকীর্ণ পথে আটকে রাখা হয়, তখন নদীর বহন করা বিপুল পলি নদীর তলদেশেই জমা হতে থাকে। ফলে নদীর তল ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যায়। পরবর্তীকালে বাঁধ ভেঙে গেলে জল আরও বেশি ধ্বংসাত্মক শক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসে।
একইভাবে, বৃহৎ বাঁধ কিছু পরিস্থিতিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও চরম বর্ষণের সময় বা জলাধার পূর্ণ থাকলে তার কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে। পাশাপাশি, এগুলি নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ, পলি পরিবহন এবং নদীকেন্দ্রিক বাস্তুতন্ত্রেও প্রভাব ফেলে।
এর অর্থ এই নয় যে বাঁধ বা এমব্যাঙ্কমেন্টের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং শিক্ষা হল—ব্রহ্মপুত্রের মতো জীবন্ত নদীকে শুধুমাত্র কংক্রিট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
আদিবাসী জ্ঞানের বিজ্ঞান:
প্রকৌশলীরা আসার বহু আগেই মিসিং জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বন্যার সঙ্গে নিরাপদে বসবাসের নিজস্ব বিজ্ঞান গড়ে তুলেছিল।

তাদের ঐতিহ্যবাহী চাং ঘর, যা বাঁশ বা কাঠের উঁচু খুঁটির উপর নির্মিত, বন্যার জলকে ঘরের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে দেয়।
তাদের কৃষি ব্যবস্থা ঋতুভিত্তিক বন্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। জীবিকা বহুমুখী। নদীর আচরণ, নিরাপদ স্থান, বন্যার সময় এবং প্রকৃতির নানা সংকেত সম্পর্কে তাদের রয়েছে বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান।
আধুনিক বিজ্ঞান আজ এই ধরনের জ্ঞানকে কুসংস্কার নয়, বরং Traditional Ecological Knowledge (TEK) বা ঐতিহ্যগত পরিবেশগত জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, বহু আদিবাসী সম্প্রদায় শতাব্দীর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রকৃতি সম্পর্কে এমন সূক্ষ্ম জ্ঞান অর্জন করেছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
তারা বন্যাকে থামানোর চেষ্টা করেনি; বরং শিখেছে সহনশীলতা (Resilience)—অর্থাৎ আঘাত সহ্য করে দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষমতা।
জলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, নাকি জলের সঙ্গে সহাবস্থান?
অসম আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়।
আধুনিক প্রকৌশল প্রায়ই প্রশ্ন করে—
"কীভাবে নদীকে থামানো যায়?"
আদিবাসী জ্ঞান প্রশ্ন করে—
"কীভাবে নদীর সঙ্গে নিরাপদে বাঁচা যায়?"
এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক।
যেখানে শহর, হাসপাতাল বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা জরুরি, সেখানে প্রকৌশল অপরিহার্য। কিন্তু বিস্তীর্ণ বন্যাভূমি ও গ্রামীণ অঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে অভিযোজন অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর হতে পারে।
আজ বিশ্বের নদী বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত বন্যা ব্যবস্থাপনার (Integrated Flood Management) কথা বলছেন, যেখানে একসঙ্গে থাকবে—
বিজ্ঞানসম্মত প্রকৌশল,
জলাভূমি ও বন্যাভূমির পুনরুদ্ধার,
উন্নত পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা,
জলবায়ু-সহনশীল ভূমি পরিকল্পনা,
এবং আদিবাসী পরিবেশগত জ্ঞান।
ভবিষ্যৎ কংক্রিট ও সংস্কৃতির মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার নয়; বরং এই দুইয়ের সৃজনশীল সমন্বয়ের মধ্যে।
জলবায়ু পরিবর্তন: সংকটকে আরও গভীর করছে:
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় চরম বর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে, ফলে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের বন্যা আরও তীব্র, আরও অনিশ্চিত এবং আরও ঘন ঘন হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে একটিমাত্র সমাধানের উপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকৃত সহনশীলতা গড়ে ওঠে জ্ঞান ও পদ্ধতির বৈচিত্র্যের মাধ্যমে। নির্মাণের আগে শেখা।
এই কার্টুনটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি বন্যা সমস্যাকে কেবল প্রকৌশলের প্রশ্ন হিসেবে নয়, বিনয়ের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে।
অনেক সময় নতুন সমাধান আবিষ্কার করার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় সেই মানুষদের কাছ থেকে শেখার, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই সমস্যার সঙ্গে সফলভাবে সহাবস্থান করে আসছেন।

মিসিং জনগোষ্ঠীর চাং ঘর, ঋতুভিত্তিক জীবনযাত্রা এবং নদী সম্পর্কে গভীর পরিবেশগত জ্ঞান অতীতের নিদর্শন নয়; এগুলি জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে জীবন্ত গবেষণাগার।
মানবসভ্যতা যখন ক্রমবর্ধমান জলবায়ু অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, তখন হয়তো প্রশ্নটি আর "আমরা কত উঁচু বাঁধ বানাতে পারি?" নয়; বরং "আমরা প্রকৃতি ও প্রাচীন জ্ঞান থেকে কতটা শিখতে পারি?"
কার্টুনের গণ্ডারটি তাই আমাদের শেষবারের মতো স্মরণ করিয়ে দেয়—
"অসমের বন্যা সমস্যার সবচেয়ে বড় অভাব হয়তো আরও কংক্রিট নয়; বরং সেই প্রজ্ঞা, যা বুঝতে শেখায়—নদীকে সবসময় জয় করা যায় না, কিন্তু তাকে বোঝা যায়, তার সঙ্গে বাঁচা যায়"।
সৌজন্য স্বীকার : রোহন চক্রবর্তী (green humour)




Discussion 2 comments