অরণ্য, অভয়ারণ্য ও গণতন্ত্র — সংকুচিত হতে থাকা পরিসরের একটি গল্প।
একটি কার্টুন কখনও কখনও একটি দীর্ঘ সম্পাদকীয়ের চেয়েও বেশি কথা বলে।
একটি গণ্ডার এবং একটি হাতি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
গণ্ডার বলছে—“Are you also worried about shrinking of eco-sensitive zones?” [তুমিও কি পরিবেশ সংবেদনশীল অঞ্চলগুলির সংকোচন নিয়ে উদ্বিগ্ন?]
হাতির উত্তর—“Yes, and the shrinking space for dissent!” [হ্যাঁ, আর ভিন্নমতপ্রকাশের সংকোচনশীল পরিসরও!]

সৌজন্যে: ডাউন টু আর্থ, প্রকাশক এবং কার্টুনিস্ট মি. সরিত গুপ্ত, তাঁদের সম্মতির জন্য।
প্রথম দেখায় এটি একটি পরিবেশ-সংক্রান্ত কার্টুন। কাজিরাঙা, গণ্ডার, পরিবেশ সংবেদনশীল অঞ্চল বা ESZ—সবই সেখানে দৃশ্যমান। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি ছবিটির অর্থ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। পরিবেশের নিরাপদ পরিসর এবং নাগরিকের ভিন্নমতের পরিসরকে একই ফ্রেমে এনে কার্টুনটি একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়:
প্রকৃতির জায়গা যেমন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, গণতন্ত্রের জায়গাটিও কি তেমনই সংকুচিত হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় একই সঙ্গে কাজিরাঙার বনভূমি এবং দিল্লির যন্তর মন্তর-এ।
যন্তর মন্তর: গণতন্ত্রের একটি ছোট্ট ঠিকানা।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যন্তর মন্তর বহু দশক ধরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, জনমত প্রকাশ এবং সরকারের কাছে দাবি জানানোর একটি প্রতীকী স্থান। একসময় বোট-ক্লাব সহ দিল্লির অন্যান্য কেন্দ্রীয় সার্বজনীন পরিসর-এ বড় জমায়েত ও প্রতিবাদ হতো। নানা প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের পরে যন্তর মন্তর ধীরে ধীরে ভারতের সবচেয়ে পরিচিত “ভিন্নমত প্রকাশের চত্বর”-এ পরিণত হয়। কিন্ত আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে মোট যতটা জায়গা ছিল, বর্তমানে সেটি আজ তার একটি ভগ্নাংশে পরিণত হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা দরকার। গণতন্ত্রে প্রতিবাদ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো বেআইনি অনুপ্রবেশ নয়। শান্তিপূর্ণ ভিন্নতম প্রকাশ করা বা অসন্তোষ বা প্রতিবাদ জানানো নিজেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অঙ্গ।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে যন্তর মন্তর ও দিল্লির অন্যত্র প্রতিবাদ নিয়ে শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট-এর চিফ জাস্টিস সূর্য কান্ত স্পষ্ট করে বলেন যে শান্তিপূর্ণ ও আইনসঙ্গত প্রতিবাদ সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে সুরক্ষিত এবং শুধুমাত্র আন্দোলন / বিক্ষোভ হচ্ছে বলেই পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার ন্যায্য হতে পারে না। [Live Law, 27th July]
অবশ্যই প্রতিবাদের অধিকার সীমাহীন নয়। অন্য নাগরিকের চলাচল, বাসিন্দাদের অধিকার, অত্যাবশ্যক সেবা, নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার কথাও বিবেচনায় রাখতে হয়। সুপ্রিম কোর্ট-ও সেই ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। যন্তর মন্তর-কে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল হিসেবে রেখে সেখানে নিয়ম, অনুমতি এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। দিল্লী পুলিশ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছে, যন্তর মন্তর এখনও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য অনুমোদিত স্থান এবং অনুমতির ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১,০০০ জনকে সেখানে প্রতিবাদের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
সমস্যাটি তাই “নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি থাকবে না”—এই সরল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হল, নিয়ন্ত্রণ কি প্রতিবাদের অধিকারকে কার্যকর রাখছে, নাকি একসময় সেই অধিকারকে এমন একটি ক্ষুদ্র পরিসরে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে তার রাজনৈতিক অর্থটাই ক্ষীণ হয়ে যায়?
আজ আমরা দেখছি, উন্নয়ন, পরিকাঠামো, শিল্প, রাস্তা, খনি, পর্যটন বা অন্য নানা প্রকল্পের যুক্তিতে বনাঞ্চল ও অভয়ারণ্যের চারপাশের নিরাপদ অঞ্চল ক্রমশ ছোট করার দাবি উঠছে।
প্রথমে বলা হয়—সামান্য কমানো হচ্ছে।
তারপর আরও কিছুটা।
তারপর বলা হয়, এতে তো প্রকৃতির ক্ষতি হবে না।
কিন্তু প্রকৃতির পরিসর কখনও এক লাফে নিশ্চিহ্ন হয় না। তা একটু একটু করে সঙ্কুচিত হয়।
ঠিক তেমনই গণতান্ত্রিক পরিসরও হয়তো একদিনে অদৃশ্য হয় না।
প্রথমে বলা হয়—প্রতিবাদ করুন, কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায়।
তারপর বলা হয়—আগে অনুমতি নিন।
তারপর বলা হয়—সংখ্যা সীমিত রাখুন।
তারপর বলা হয়—এখান থেকে আর এগোনো যাবে না।
তারপর ব্যারিকেড ওঠে।
তারপর নিষেধাজ্ঞা আসে।
তারপর যোগাযোগের পথও নিয়ন্ত্রিত হয়।
জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে ইন্টারনেট-এর পরিসরটি আটকে দেওয়া হয়েছে। [Indian Express, 20th & 23rd July, 2026]
প্রতীক হিসেবে শেষ পর্যন্ত হয়তো প্রতিবাদের জন্য একটি ‘নির্ধারিত জায়গা’ থেকে যায়—কিন্তু সেই জায়গাটি এতটাই ছোট হয়ে যায় যে তার রাজনৈতিক অর্থটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।এখানেই পরিবেশগত সংকোচন এবং গণতান্ত্রিক সংকোচন-এর মধ্যে একটি শক্তিশালী উপমা তৈরি হয়।
একটি অরণ্যকে বাঁচানোর জন্য যেমন শুধু কয়েকটি গাছ বাঁচিয়ে রাখা যথেষ্ট নয়; তার প্রয়োজন পরিবেশগত পরিসর —চলাচলের পথ, জলাভূমি, সংরক্ষিত পরিসর, প্রজননক্ষেত্র, খাদ্যভূমি এবং বৃহত্তর ভূদৃশ্য/পরিবেশগত সংযোগ।
তেমনই গণতন্ত্রকে বাঁচানোর জন্য শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলেই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গণতান্ত্রিক পরিসর—মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার এবং ভিন্নতম প্রকাশের নিরাপদ পরিসর।
বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল যেমন শুধু একটি খাঁচা নয়, গণতন্ত্রও শুধু একটি ভোটকেন্দ্র নয়।
তাই যন্তর মন্তরের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত যন্তর মন্তরের প্রশ্ন থাকে না।
আজ যদি আমরা বলি,
“বন একটু কমলে কী এমন হবে?”
তাহলে কাল হয়তো একই যুক্তিতে বলতে পারি,
“প্রতিবাদের জায়গা একটু কমলে কী এমন হবে?”
কিন্তু ইতিহাস বলে—স্বাধীনতার পরিসর সাধারণত একদিনে হারিয়ে যায় না; তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়।
আর সেই কারণেই এই কার্টুনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ সম্ভবত “space”।
গণ্ডারের জন্য পরিসর।
হাতির জন্য পরিসর।
অরণ্যের জন্য পরিসর।
প্রতিবাদের জন্য পরিসর।
গণতন্ত্রের জন্য পরিসর।
প্রকৃতির জন্য জায়গা কমতে কমতে একদিন যদি অভয়ারণ্য শুধু মানচিত্রে থেকে যায়, তা যেমন ভয়াবহ; তেমনই মানুষের প্রতিবাদের জায়গা কমতে কমতে যদি যন্তর মন্তর শুধু একটি নাম হয়ে থাকে, সেটিও গণতন্ত্রের জন্য সুখবর নয়।
প্রশ্ন তাই শুধু—অরণ্য কতটা বাঁচল নয়।
প্রশ্ন হল—প্রকৃতির জন্য আমরা কতটা জায়গা রাখছি, আর মানুষের ভিন্নমতের জন্য কতটা?
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার কতগুলি রাস্তা, সেতু, ভবন বা শিল্পপ্রকল্প আছে তা দিয়ে হয় না। পরিচয় হয়—সে তার অরণ্যকে কতটা জায়গা দেয়।
তেমনই গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা নাগরিক সংখ্যা দিয়ে নয়, পরিচয় হয়, সে তার প্রতিবাদী নাগরিককে বা বিরুদ্ধ মতকে কতটা জায়গা দেয়, তা দিয়েও।
২০২৬ সালের আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট-ও যন্তর মন্তর-এর উপযুক্ততা এবং বিকল্প প্রতিবাদের জায়গা নিয়ে একটি আবেদন-এর বিষয়ে কেন্দ্র ও দিল্লি সরকারের বক্তব্য চেয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবাদের জায়গার প্রশ্নটি এখন নিছক রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাংবিধানিক বিতর্ক-এর অংশ হয়ে উঠেছে।
একটি অরণ্যও কি শুধু গাছের সমষ্টি?
কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান-কে যদি শুধু তার সীমানার ভিতরের জমি হিসেবে দেখি, তাহলে সংরক্ষণের একটি মৌলিক সত্যকে আমরা ঠিক ভাবে বুঝতে পারব না। একটি গন্ডার শুধু জাতীয় উদ্যানের সীমানা দেখে চলাফেরা করে না। হাতি, বাঘ, অন্যান্য প্রাণী, নদী, জলাভূমি, পাহাড়ি অববাহিকা —সব মিলিয়ে একটি বৃহত্তর বাস্তুতান্ত্রিক ভূদৃশ্য তৈরি করে। সেই ভূদৃশ্য-এর বাইরের পরিবর্তনও ভেতরের বাস্তুতন্ত্র-কে প্রভাবিত করতে পারে।
এই কারণেই পরিবেশ সংবেদনশীল অঞ্চল (ইকো সেনসিটিভ জোন Eco-Sensitive Zone)-এর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। ESZ কোনো দ্বিতীয় জাতীয় উদ্যান নয়। এটি মূল সংরক্ষিত এলাকা (protected area)-কে ঘিরে একটি পরিবেশগত সুরক্ষা অঞ্চল (ecological buffer)—যেখানে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম -এর ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, যাতে সংরক্ষিত অঞ্চলের বাস্তুতান্ত্রিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ থাকে।
অর্থাৎ ESZ-এর প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত “কত কিলোমিটার?”-এর প্রশ্ন নয়।
এটি আসলে প্রশ্ন, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ অস্তিত্বের জন্য কতটা পরিবেশগত পরিসর (ecological space) প্রয়োজন?
দশ কিলোমিটার থেকে এক কিলোমিটার—কিন্তু গল্পটি আরও জটিল। এখানে একটি তথ্যগত সতর্কতা জরুরি।
সাম্প্রতিক আলোচনায় কাজিরাঙ্গার ESZ ১০ কিলোমিটার থেকে ১ কিলোমিটারে সংকুচিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ১২ মার্চ গৌহাটি হাইকোর্ট -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বলা হয়েছে যে কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের জন্য চূড়ান্ত ESZ বিজ্ঞপ্তি তখনও জারি হয়নি। সেই কারণে সুপ্রিম কোর্ট-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ১০ কিলোমিটার সংরক্ষিত পরিসর (buffer)-এর বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল। আদালতের নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে কাজিরাঙ্গা-র ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত পরিবেশ সংবেদনশীল (ইকো সেনসিটিভ জোন) অঞ্চল বিজ্ঞপ্তি বা প্রস্তাব জমা পড়েনি।
২০২৬ সালের আগস্টেও অসমের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে স্থানভিত্তিক পরিবেশগত সংবেদনশীল এলাকার ঘোষণা (site-specific ESZ notification) না হওয়া পর্যন্ত কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও প্রজেক্ট টাইগার এরিয়ার চারপাশে বর্তমান ১০ কিলোমিটার প্রাথমিক সুরক্ষা অঞ্চল (default buffer) বজায় থাকবে। [Times of India, 12th August, 2026]
অতএব “কাজিরাঙ্গার ESZ ইতিমধ্যে ১ কিলোমিটার হয়ে গেছে”—এমন সরল বক্তব্যের বদলে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল, একটি সংরক্ষিত ভূদৃশ্য (protected landscape)-এর জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা অঞ্চল (ecological buffer) কতটা হওয়া উচিত এবং সেই পরিসর নির্ধারণে পরিবেশ সংরক্ষণ বিজ্ঞান কতটা, আর উন্নয়নজনিত চাপ কতটা ভূমিকা রাখছে? এই প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ ১০ কিলোমিটার কোনো জাদুকরী সংখ্যা নয়। ১ কিলোমিটারও নয়। আসল বিষয় হল বাস্তুতন্ত্র -এর প্রয়োজন।
পরিসর ফাঁকা নয় (Space is not empty):
এখানে যন্তর মন্তর এবং কাজিরাঙা একে অপরের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে যুক্ত হয়ে যায়। আমরা সাধারণত “space” বলতে খালি জায়গা বুঝি। কিন্তু পরিবেশগত পরিসর কখনও খালি নয়। একটি সংরক্ষিত পরিসর (buffer zone)-এর মধ্যে থাকে জল, ঘাস, খাদ্য, চলাচলের পথ, প্রজননের সম্ভাবনা, নদীর গতিপথ, মানুষের জীবিকা এবং প্রাণীর আবাসস্থলের সংযোগ।
ঠিক তেমনই গণতান্ত্রিক পরিসর-ও খালি জায়গা নয়। একটি বিক্ষোভ স্থলের মধ্যে থাকে মানুষের কণ্ঠস্বর, দাবি, ক্ষোভ, সংবিধান, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার অধিকার এবং ক্ষমতার কাছে জবাবদিহি / দায়বদ্ধতা দাবি করার সুযোগ।
তাই পরিসর কখনোই ফাঁকা নয়। পরিসর নিজেই রাজনৈতিক (space is not empty, Space itself is political)।
পরিবেশগত গণতন্ত্র কোথায় এসে দাঁড়ায়?
এই জায়গায় এসে পরিবেশের প্রশ্ন আর কেবল বন ও বন্যপ্রাণীর প্রশ্ন থাকে না। তা হয়ে ওঠে পরিবেশগত গণতন্ত্রর প্রশ্ন বা পরিবেশ রাজনীতির প্রশ্ন।
একটি উন্নয়ন প্রকল্প কোথায় হবে, কতটা বন কাটা হবে, একটি নদীর গতিপথ বদলানো যাবে কি না, একটি বন্যপ্রাণী চলাচলের পথ-এর পাশে খনি হবে কি না—এসব সিদ্ধান্ত কেবল প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়।
এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্থানীয় মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, ভূমি, জল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। তাই পরিবেশগত গণতন্ত্র-র অর্থ হল, প্রকৃতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় নাগরিকের কণ্ঠস্বরের জায়গা থাকা।
যদি জনপরামর্শ থাকে কিন্তু তা অর্থহীন হয়,
যদি EIA থাকে কিন্তু তথ্য অসম্পূর্ণ থাকে,
যদি শুনানি হয় কিন্তু আপত্তির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব না থাকে,
তাহলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা থাকতে পারে; কিন্তু পরিবেশগত গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে যায়।
তাই, এই জায়গায় ভিন্নমত কোনো উপদ্রব নয়।
বরং ভিন্নমতের মধ্যেই থাকে পরিবেশগত তথ্য।
কোনও স্থানীয় মানুষ যখন বলে, “এই পাহাড় কাটলে বর্ষায় জল নেমে আসবে”, বা “এই রাস্তা হাতির চলাচলের পথের ওপর”, বা “এই নদীকে আটকালে নদীর ভাটির দিকের গ্রাম ডুবে যাবে”—তখন সেই আপত্তিকে শুধু উন্নয়নের বিরোধিতা হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। সেটি অনেক সময় বাস্তুতন্ত্রের স্থানীয় জ্ঞান।
উন্নয়নেরও একটি বাস্তুতান্ত্রিক পদচিহ্ন (ecological footprint) আছে, ভিন্নমতেরও একটি গণতান্ত্রিক পদচিহ্ন আছে।
আমাদের উন্নয়নের প্রচলিত ধারণা প্রায় সবসময় একটি প্রশ্ন করে:
কতটা জমি পাওয়া যাবে?
কতটা বন পাওয়া যাবে?
কতটা খনিজ পদার্থ পাওয়া যাবে?
কতটা রাস্তা বানানো যাবে?
কতটা অবকাঠামো তৈরি করা যাবে?
কিন্তু অববৃদ্ধি (degrowth)-এর আলোচনায় প্রশ্নটি অন্যরকম হতে পারে:
কতটা পরিসর আমরা না নিলেও চলবে?
গণ্ডার এবং হাতির কথোপকথন তাই কার্টুনের গণ্ডার যখন পরিবেশ সংবেদনশীল অঞ্চলগুলি (eco-sensitive zone) নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন সে শুধু নিজের আবাসস্থল-এর কথা বলছে না।
আর হাতি যখন বলে—
“Yes, and the shrinking space for dissent!”
সে যেন গণ্ডারের কথাকে মানুষের পৃথিবীতে অনুবাদ করছে।
একটি আবাসস্থল ছোট হতে হতে একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে যেখানে প্রাণীটি প্রযুক্তিগতভাবে সুরক্ষিত, কিন্তু বাস্তুতান্ত্রিকভাবে নিরাপদ নয়।
একইভাবে একটি গণতন্ত্রে প্রতিবাদ প্রযুক্তিগতভাবে অনুমোদিত হতে পারে, কিন্তু যদি প্রতিবাদের স্থান, সংখ্যা, সময়, চলাচল এবং দৃশ্যমানতা এতটাই নিয়ন্ত্রিত হয় যে ভিন্নমত-এর রাজনৈতিক শক্তি হারিয়ে যায়, তাহলে গণতান্ত্রিক অধিকার কাগজে থাকলেও তার বাস্তব পরিসরটি সংকুচিত হয়।
এটি অবশ্য বাস্তুতান্ত্রিক সুরক্ষা এবং নাগরিক স্বাধীনতার অধিকার-কে এক করে দেখার আহ্বান নয়।
বরং দুটির মধ্যে একটি কাঠামোগত সাদৃশ্য দেখার চেষ্টা।
আমাদের ভয় হওয়া উচিত “শূন্যস্থান” নিয়ে।
আজ কাজিরাঙ্গার ক্ষেত্রে ১০ কিলোমিটার সুরক্ষা অঞ্চল বা বাফার জোন কার্যকর আছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আগামীকাল কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আজ যন্তর মন্তর অনুমোদিত প্রতিবাদস্থল —এটিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আগামীকাল তার বাস্তব ব্যবহারযোগ্যতা কী থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গণতন্ত্র ও বাস্তুবিদ্যা (ecology) দুটিই শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দিয়ে বিচার করা যায় না। তাদের বিচার করতে হয় গতিপথ দিয়ে।
পরিসর কি বাড়ছে, না কমছে?
জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ কি গভীর হচ্ছে, না আনুষ্ঠানিক হচ্ছে?
বন্যপ্রাণী করিডোর কি সুরক্ষিত হচ্ছে, না উন্নয়নের অবকাঠামো দিয়ে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে?
প্রতিবাদের অধিকার কি বাস্তবে সহজ হচ্ছে, না প্রশাসনিক শর্ত ক্রমশ বাড়ছে?
এই প্রশ্নগুলোই আসল।
কারণ একটি অরণ্য একদিনে নিশ্চিহ্ন হয় না।
একটি অভয়ারণ্যও একদিনে অদৃশ্য হয় না।
এবং গণতান্ত্রিক পরিসরও একদিনে হারিয়ে যায় না।
প্রথমে একটু কমে।
তারপর আরও একটু।
তারপর আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই।
শেষ কথা: কতটা জায়গা যথেষ্ট?
যন্তর মন্তর-এর প্রশ্ন তাই শুধু যন্তর মন্তর-এর প্রশ্ন নয়।
কাজিরাঙ্গার ESZ-ও শুধু গণ্ডারের প্রশ্ন নয়।
দুটির কেন্দ্রে একই মৌলিক প্রশ্ন:
আমরা অন্যের অস্তিত্বের জন্য কতটা জায়গা রাখতে প্রস্তুত?
বন্যপ্রাণীর জন্য জায়গা।
অরণ্যের জন্য জায়গা।
নদীর জন্য জায়গা।
স্থানীয় মানুষের জন্য জায়গা।
প্রতিবাদের জন্য জায়গা।
ভিন্নমতের জন্য জায়গা।
একটি সমাজের সভ্যতার মাপকাঠি শুধু তার ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, এয়ারপোর্ট বা জিডিপি নয়। তার আরেকটি মাপকাঠি হল—সে কতটা জায়গা নিজের বাইরে থাকা জীবনের জন্য এবং নিজের বাইরে থাকা মতের জন্য রেখে দেয়।
সেই অর্থে পরিবেশগত গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক গণতন্ত্র পরস্পরের সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়।
দুটিই আমাদের শেখায় একটি মৌলিক নীতি:
সব জায়গা আমাদের জন্য নয়।
কিছু জায়গা নদীর।
কিছু জায়গা অরণ্যের।
কিছু জায়গা গণ্ডারের।
আর কিছু জায়গা সেই নাগরিকের, যে দাঁড়িয়ে বলবে,
“আমি একমত নই।”
যদি উন্নয়নের নামে প্রথম জায়গাগুলি ক্রমশ ছোট হতে থাকে, আর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের নামে দ্বিতীয় জায়গাটিও সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে আমাদের প্রশ্ন করতেই হবে—শেষ পর্যন্ত বাঁচবে কে?
শুধু উন্নয়ন, নাকি সেই সমাজও—যার জন্য উন্নয়ন?
কার্টুনের হাতি তাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে জরুরি কথাটিই মনে করিয়ে দেয়:
প্রকৃতির জন্য জায়গা বাঁচাও। Save the space for nature.
ভিন্নমতের জন্য জায়গা বাঁচাও। Save the space for dissent.
কারণ শেষ পর্যন্ত—
যে সমাজ প্রকৃতির জন্য জায়গা রাখতে শেখে না, সে সমাজে ভিন্নমতের জন্যও জায়গা কমে যেতে পারে।




সবার আগে আলোচনায় যোগ দিন।