Home
মনসা ভাসান - প্রাচীন বাংলার এক লোকসংস্কৃতি
Opinion/Analysis

মনসা ভাসান - প্রাচীন বাংলার এক লোকসংস্কৃতি

সুন্দরবনের একটি লোকাচার অথবা লোকসংস্কৃতির প্রতিমূর্তি মনসা ভাসান। সুন্দরবন অঞ্চলে ভাদ্র মাসের শনি মঙ্গলবার চলে সর্পদেবী মনসা কে কেন্দ্র করে এই পুজো এব…

Discussion 1 comment

অমল পাঠক
অমল পাঠক16/09/2026 18:14
একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার এই লেখাটি পড়ে ভিষণ ভালো লাগলো। মনসা ভাসানকে শুধু ধর্মীয় উৎসব হিসেবে না দেখে নদী, সাপ, মানুষের জীবনযাপন, মৃত্যুভয় ও লোকস্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আকর্ষণীয়। ভাষাও সহজ, তাই বিষয়টি সহজেই পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। শেষের অংশে লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতির সহাবস্থানের কথাটিও মনে দাগ কাটে।
▣Opinion/Analysis

মনসা ভাসান - প্রাচীন বাংলার এক লোকসংস্কৃতি

সুন্দরবনের একটি লোকাচার অথবা লোকসংস্কৃতির প্রতিমূর্তি মনসা ভাসান। সুন্দরবন অঞ্চলে ভাদ্র মাসের শনি মঙ্গলবার চলে সর্পদেবী মনসা কে কেন্দ্র করে এই পুজো এবং ভাসান। প্রধান উৎসবটি হয় ভাদ্র মাসের শেষ শনি অথবা মঙ্গলবার। উৎসব যা সমস্ত শ্রেণির মানুষকে এক সূত্রে বেঁধে রাখে। নদীর পাড়ে সমস্ত গ্রামের জমায়েত, উলুধ্বনি শঙ্খের আওয়াজ সহযোগে কলার ভেলা সাজিয়ে ভাসান সেই কথাই মনে করায়। এই উপলক্ষে নদীর পাড়ে বসে মেলা, চলে বিকিকিনি। প্রাচীন লোকগাথা বেহুলা - লখিন্দর এর কাহিনী কে কেন্দ্র করে এই উৎসবের সূচনা। চলে পালাগান লোকজ স্মৃতির পুনর্নির্মাণ।

sundarban 6

লোককথার সূচনা হয় সেই অঞ্চলের পরিবেশ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে।

ধানের জমি, পুকুরপাড়, খড়ের গাদা, বাঁশঝাড়—সাপ ছিল এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন পরিবেশেরই অংশ। ফলে সাপের কামড় শুধু একটি শারীরিক বিপদ ছিল না; তা ছিল অজানা মৃত্যুর প্রতীক।

এই সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই মনসা বা বিষহরি দেবীর লোকবিশ্বাস শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

মনসার আরাধনার প্রাথমিক ভিত্তি ছিল মূলত গ্রামীণ সমাজ—বিশেষ করে কৃষক, জেলে ও অন্যান্য লোক সম্প্রদায়ের মধ্যে। রাঢ় বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলেও মনসা পূজার শক্তিশালী লোক ঐতিহ্য দেখা যায়।

অর্থাৎ মনসার কাহিনির মূলে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নেই; রয়েছে মানুষের সাপ ও মৃত্যু ভয়ের সঙ্গে সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস।

sundarban 1

মনসাকে কেন্দ্র করে যে কাহিনি গুলি ধীরে ধীরে বাংলায় জনপ্রিয় হয়, তার সবচেয়ে শক্তিশালী সাহিত্যিক রূপ হল মনসামঙ্গল।

প্রাপ্ত প্রাচীন মনসামঙ্গল রচনাগুলির মধ্যে বিজয় গুপ্তের কাব্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে রচিত এই মনসামঙ্গল।

যুগ যুগ ধরে চলা এই উৎসবগুলি সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি। প্রবাহমান মানব সভ্যতার নিদর্শন। ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতির প্রতীক।

sundarban 2

এই কাহিনির কেন্দ্রে আসে চাঁদ সদাগর।

চাঁদ ছিলেন শিবের উপাসক। মনসা চেয়েছিলেন তাঁর পূজা পেতে। কিন্তু চাঁদ তাঁকে দেবী হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকার করেন।

তারপর শুরু হয় দেবী ও মানুষের সংঘাত।

চাঁদ সদাগরের একের পর এক পুত্র সাপের দংশনে মারা যায়। শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে কনিষ্ঠ পুত্র লখিন্দর।

তার বিয়ে হয় বেহুলার সঙ্গে।

চাঁদ জানতেন—মনসা প্রতিশোধ নেবেন।

তাই লখিন্দরের জন্য তৈরি হয় লোহার বাসরঘর।

কিন্তু মানুষের তৈরি লোহার প্রাচীরও শেষ পর্যন্ত দেবীর পাঠানো সাপকে আটকাতে পারে না।

বিয়ের রাতেই সাপের দংশনে মৃত্যু হয় লখিন্দরের।

সর্পদংশনে লখিন্দরের মৃত্যুর পর বেহুলা তাঁর দেহ কলাগাছের ভেলায় নিয়ে গাঙ্গুরের জলে দেবপুরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

সম্ভবত এখানেই তৈরি হয়েছে লোকসংস্কৃতির এক আশ্চর্য রূপান্তর।

বাস্তবে নদী ছিল মানুষের জীবনরেখা।

নদীপথেই চলত বাণিজ্য, কৃষিজীবনের যোগাযোগ, মানুষের যাতায়াত।

সাপের কামড়ে মৃত্যু হলে নদীর সঙ্গে যুক্ত কোনো লোকাচার থাকলে সেটিও অস্বাভাবিক ছিল না।

sundarban 5

সেই সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হল মনসার দেবীকাহিনি।

শত শত বছর ধরে বাংলা বদলেছে।

নদীর গতিপথ বদলেছে।

গ্রাম বদলেছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বদলেছে।

কিন্তু বেহুলার ভেলা থেকে গেছে।

তাই মনসার ভাসানের ইতিহাসকে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের ইতিহাস বললে ভুল হবে।

এটি আসলে বাংলার নদী সভ্যতা, সাপের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান, মৃত্যুভয় এবং লোকসাহিত্যের সম্মিলিত স্মৃতির ইতিহাস।

ChatGPT Image Sep 16, 2026, 10_24_52 AM

আর কলার সেই ছোট্ট ভেলা?

আজও যখন জলে ভাসে, তখন মনে হয়—

বেহুলা যেন এখনও নদীর বুক চিরে চলেছেন।

মৃত্যুর কাছে নয়—

জীবনের কাছে।

নদীর তীরে জড়ো হওয়া প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষগুলো গ্রাম বাংলার সচল প্রতিমূর্তি। নিয়মিত জল, জঙ্গল, বাঘ, সাপের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানুষগুলি আজও অচেনা মানুষদের কে অনায়াসে বলতে পারে আমাদের বাড়ি এসো, পসরা বিক্রি করে বলতে পারে আবার এসো, ভালো থেকো আর বিক্রির শর্ত ভুলে মাছ ধরার খোলুই এর বর্ণনা দিতে হাসিমুখে মেতে ওঠেন যে মানুষটি সেই গ্রামবাংলা ভালো থাকুক। লোককথা, পালাগান, আনন্দ, উৎসব নদীর স্রোতের মতোই ভেসে চলুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। বিজ্ঞানের আলো তাদের জীবনযাত্রা করে তুলুক আরও একটু সচ্ছল, পারাপার হোক সহজ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি পৌঁছে যাক ঘরে ঘরে, প্রকৃত শিক্ষার আলোতে তারা প্রকৃতি আর মানুষের সহাবস্থানের স্বাভাবিক তত্ত্বকে স্বীকার করুক।

sundarban 3

তবেই বাঁচবে নদীমাতৃক এই বাংলা, রক্ষা পাবে বিশ্বের বৃহৎ এই ব-দ্বীপ অঞ্চল।

Discussion 1 comment

অমল পাঠক
অমল পাঠক16/09/2026 18:14
একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার এই লেখাটি পড়ে ভিষণ ভালো লাগলো। মনসা ভাসানকে শুধু ধর্মীয় উৎসব হিসেবে না দেখে নদী, সাপ, মানুষের জীবনযাপন, মৃত্যুভয় ও লোকস্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আকর্ষণীয়। ভাষাও সহজ, তাই বিষয়টি সহজেই পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। শেষের অংশে লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতির সহাবস্থানের কথাটিও মনে দাগ কাটে।
Our mission

We define ourselves as a “Mass Media of Resistance”

We seek to understand and analyze the Bahusaṅkaṭa (i.e., Polycrisis: a multidimensional crisis that doesn't have a straight forward solution) in which we all are immersed, along with the Bahuduḥkha (multiform suffering) of all sentient beings, through the lens of Madhyamāpratipada (the Middle Way in Buddhism which is our guiding force). And in collaboration with the broader Ecological Solidarity Movement and the Ecological Solidarity Alliance, we strive to bring the depth of these realities to the forefront of human consciousness.

Contact us

Email: thedegrowthofficial.com