Home
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আহ্বান
Opinion/Analysis

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আহ্বান

সীমাবদ্ধ গ্রহে অন্তহীন প্রবৃদ্ধির এই অর্থনীতি আসলে এক আত্মঘাতী পথ। জিডিপি যখন প্রকৃতির ধ্বংস আর মানুষের বিপর্যয়কে অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে গণনা করে, তখ…

Discussion 0 comments

Replying to
No comments yet.

Be the first to join the discussion.

Opinion/Analysis

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আহ্বান

সীমাবদ্ধ গ্রহে অন্তহীন প্রবৃদ্ধির এই অর্থনীতি আসলে এক আত্মঘাতী পথ। জিডিপি যখন প্রকৃতির ধ্বংস আর মানুষের বিপর্যয়কে অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে গণনা করে, তখন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই আনুষ্ঠানিকতা স্রেফ এক অলংকার। কর্পোরেট মুনাফার ফাঁদ এবং রাষ্ট্রের একমুখী উন্নয়ন নীতিকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে, নিয়ামগিরি থেকে সুন্দরবনের উচ্ছেদ ও লুণ্ঠনের কাঠামোগত সত্য সামনে আনার এক আপসহীন লড়াই।

প্রবৃদ্ধির বিভ্রম ভেঙে প্রকৃতির সঙ্গে প্রকৃত সহাবস্থানের পথে

file_00000000022872088a00c7954e1fbf0b

এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য— "Inspired by Nature, for Climate, for our Future"। অর্থাৎ জলবায়ু ও ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে হলে আমাদের আবারও প্রকৃতির কাছেই ফিরে যেতে হবে। কিন্তু এই আহ্বানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রশ্ন। প্রকৃতির "অনুপ্রেরণা" নেওয়ার কথা বলতে বলতে যদি সেই একই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রেখে দেওয়া হয়, যে ব্যবস্থা প্রকৃতিকে আহরণের বস্তু হিসেবে দেখে, তাহলে কি এই আহ্বান কেবল অলংকারেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে না?

পরিবেশ সংকটকে আমরা অনেক সময় প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা বা নীতিগত শৈথিল্যের ফল হিসেবে দেখি। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, এটি একটি অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত ও কাঠামোগত ফলাফল; সেই ব্যবস্থার, যা অন্তহীন উৎপাদন ও ভোগবৃদ্ধিকে অস্তিত্বের শর্ত বলে মানে। কোথাও দাবদাহে পুড়ছে মানুষ, কোথাও বন্যায় ভাসছে জনপদ, কোথাও অরণ্য আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে: এই বিপর্যয়গুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটি ব্যবস্থার বহুমুখী প্রকাশ।

গ্রহের সীমা: প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি যে সত্য এড়িয়ে চলে

বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে পৃথিবী একটি জটিল ও আন্তঃনির্ভরশীল ব্যবস্থা, যার কিছু নিরাপদ জৈব-ভৌত সীমা রয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করলে জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, এই সীমাগুলির মধ্যে অন্তত সাতটি ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, ভূমি ব্যবস্থার বিপর্যয়, মিঠা জলের সংকট, নাইট্রোজেন-ফসফরাস চক্রের ভাঙন, রাসায়নিক দূষণ এবং সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি। কিন্তু এই সীমা লঙ্ঘনের কারণটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়। একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা প্রবৃদ্ধি না হলে সংকটে পড়ে, সে ব্যবস্থায় প্রকৃতির সীমাকে সম্মান করার কোনো কাঠামোগত প্রণোদনা নেই। বাজার যতক্ষণ বন, নদী, খনিজ ও উপকূলকে মুনাফার উপকরণ হিসেবে দেখবে, ততক্ষণ "সবুজ প্রযুক্তি" বা "কার্বন বাজার" দিয়ে সংকট মেটানো সম্ভব নয়, কারণ এগুলি সমস্যার উৎসকে নয়, কেবল উপসর্গকে সম্বোধন করে।

এই প্রবৃদ্ধি-নির্ভর চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সূচক: GDP বা Gross Domestic Product। আধুনিক রাষ্ট্রগুলির সাফল্য প্রায়শই এই একটিমাত্র সংখ্যার মাধ্যমে বিচার করা হয়। কিন্তু GDP আমাদের কী বলে, আর কী গোপন করে?

একটি অরণ্য কেটে খনি তৈরি হলে GDP বাড়ে। একটি নদী দূষিত হয়ে গেলে তাকে পরিষ্কার করার প্রকল্পেও GDP বাড়ে। ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনের কাজেও GDP বাড়ে। অর্থাৎ প্রকৃতির ধ্বংস এবং সেই ধ্বংসের পর মেরামতির খরচ, উভয়কেই অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে গণনা করা হয়। অন্যদিকে সুস্থ বনভূমি, পরিষ্কার নদী, পরিচর্যার শ্রম, কমিউনিটির পারস্পরিক সহযোগিতা কিংবা জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্ব - এগুলির অধিকাংশেরই কোনো মূল্য GDP-র হিসাবে ধরা পড়ে না।

ফলে GDP এমন একটি আয়না, যা বাজারে বিক্রি হওয়া জিনিসকে দৃশ্যমান করে কিন্তু জীবনের প্রকৃত ভিত্তিগুলিকে অদৃশ্য করে দেয়। এই কারণেই এমন হতে পারে যে একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে “বৃদ্ধি” পাচ্ছে, অথচ তার মাটি অনুর্বর হচ্ছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, অরণ্য উজাড় হচ্ছে এবং মানুষের জীবন আরও অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রশ্নটি তাই কেবল কত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তা নয়; প্রশ্ন হলো কী বাড়ছে, কার জন্য বাড়ছে, এবং সেই বৃদ্ধির পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য কে দিচ্ছে।

প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষা একসঙ্গে চলতে পারে— এই ধারণাটি আজ পর্যন্ত বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি। উৎপাদনশীলতা বাড়লে শক্তি ও সম্পদের ব্যবহার কমে না, বরং পরম মাত্রায় তা আরও বাড়ে। অতএব গ্রহের সীমার মধ্যে থাকতে হলে প্রয়োজন সামগ্রিক উৎপাদন ও ভোগের মাত্রা হ্রাস— অন্তত ধনী দেশ ও ধনী শ্রেণির ক্ষেত্রে।

বঞ্চনার মাধ্যমে সঞ্চয়: প্রকৃতির পণ্যায়নের ইতিহাস

প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক একসময় ছিল পারস্পরিক নির্ভরতার। সেই সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়। ইউরোপে সাধারণ মানুষের ভূমি ও জলের উপর যে সামষ্টিক অধিকার ছিল, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং ব্যক্তিমালিকানায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে এই প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে— ভারতের অরণ্য, আফ্রিকার খনিজ সম্পদ, লাতিন আমেরিকার ভূমি— সবকিছু পণ্যে পরিণত হয়েছে।

ভারতের নিয়ামগিরি, হাসদেও, আরাবল্লী বা সুন্দরবনে আদিবাসীদের উচ্ছেদ এই একই ঐতিহাসিক ধারার সমসাময়িক প্রকাশ। উন্নয়নের নামে মানুষকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, প্রাকৃতিক সম্পদকে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে তুলে দেওয়া হচ্ছে এবং পরিবেশ আইনকে দুর্বল করা হচ্ছে। অর্থাৎ যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতিকে রক্ষা করে এসেছেন, তাদের সরিয়ে দিয়ে সেই প্রকৃতিকেই ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই উন্নয়ন মডেল অন্তর্ভুক্তির নয়, বরং বর্জনের।

যতক্ষণ এই কাঠামো বহাল থাকবে— যেখানে সম্পদের উপর সামষ্টিক অধিকার ক্রমাগত ক্ষয় পাচ্ছে এবং কর্পোরেট মুনাফা ক্রমাগত বাড়ছে— ততক্ষণ পরিবেশ রক্ষার আহ্বান মূলত প্রতীকী হয়েই থাকবে।

জলবায়ু সংকট: কে দায়ী, কে মূল্য চোকাচ্ছে

বায়ুমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। ভারতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বর্ষা, আকস্মিক বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় এখন নিত্যসঙ্গী। কলকাতাসহ বিভিন্ন শহরে "হিট আইল্যান্ড" প্রভাবে তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার যৌথ প্রভাবে "ওয়েট-বাল্ব" পরিস্থিতি তৈরি হলে মানুষের শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার কৃষক, ক্ষেতমজুর, আদিবাসী, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়া হয়: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য ঐতিহাসিকভাবে দায়ী কে? কয়েকটি শিল্পোন্নত দেশ ও তাদের বৃহৎ কর্পোরেশনগুলি যুগের পর যুগ ধরে বিপুল পরিমাণ কার্বন নির্গমন করেছে। অথচ এর মূল্য চোকাচ্ছে মূলত গ্লোবাল সাউথের মানুষেরা— যারা এই দূষণের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।

এটি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি গভীর নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। যতক্ষণ আন্তর্জাতিক পরিবেশ নীতিমালা এই বৈষম্যকে— এই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাকে— স্বীকার না করবে এবং ধনী থেকে গরিব দেশের দিকে প্রকৃত সম্পদ হস্তান্তর না ঘটবে, ততক্ষণ "জলবায়ু ন্যায়বিচার" একটি ফাঁকা বুলিই থেকে যাবে।

file_000000005e7872089b07cc8afdbfe909

জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়: বাজারের যৌক্তিক পরিণতি

বর্তমান প্রজাতি বিলুপ্তির হার প্রাকৃতিক হারের তুলনায় বহুগুণ বেশি। অরণ্য ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, খনি সম্প্রসারণ, নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী তাদের আবাসভূমি হারাচ্ছে। পশ্চিমঘাট, সুন্দরবন, আরাবল্লী, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, ছত্তিশগড়ের অরণ্যাঞ্চল বা উত্তর-পূর্ব ভারতের বনভূমি— সবখানেই উন্নয়নের নামে প্রকৃতির উপর আক্রমণ চলছে। কিন্তু এই বিলুপ্তি কোনো দুর্ঘটনা নয়। যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বনভূমির মূল্য কেবল কাঠ, খনিজ বা রিয়েল এস্টেটে পরিমাপিত হয়, সে ব্যবস্থায় জীববৈচিত্র্যের অন্তর্নিহিত মূল্য— বাস্তুতন্ত্র রক্ষার ক্ষমতা, জলচক্র নিয়ন্ত্রণ, মাটির উর্বরতা— কোনো হিসেবেই আসে না। ফলে ধ্বংসই হয় বাজারের যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

একইসঙ্গে বিপন্ন হচ্ছে সেইসব আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যাদের জীবন ও সংস্কৃতি প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই জনগোষ্ঠীগুলিই প্রকৃতপক্ষে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এসেছে। তাদের উচ্ছেদ করে সংরক্ষণের কথা বলা একটি স্ববিরোধ।

ভূমি, জল ও পুষ্টিচক্রের সংকট: অদৃশ্য কিন্তু মারাত্মক

বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক বনভূমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। খনি, শিল্পাঞ্চল, পর্যটন প্রকল্প, বন্দর ও পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। বৃহৎ প্রকল্পগুলিকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলেও তার পরিবেশগত মূল্য আড়াল করা হয়। এই আড়াল করার প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক এবং ইচ্ছাকৃত। মিঠা জলের সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত উত্তোলন, নদী দূষণ, জলাভূমি ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বহু অঞ্চলে জলনিরাপত্তা বিপন্ন। কিন্তু যেখানে জল বাজারের পণ্য হয়ে যায়, সেখানে যার কেনার ক্ষমতা নেই তার জলের অধিকারও থাকে না। নাইট্রোজেন ও ফসফরাস চক্রের ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। রাসায়নিক সারনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার ফলে জলাশয় দূষিত হচ্ছে, অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং জলজ প্রাণীকুলের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। এই ব্যবস্থাটি কর্পোরেট কৃষি-শিল্পের মুনাফার জন্য টিকে আছে, খাদ্যনিরাপত্তার জন্য নয়।

নতুন রাসায়নিক যুগের বিপদ: বাহ্যিক মূল্যের রাজনীতি

প্লাস্টিক, PFAS, কীটনাশক এবং হাজার হাজার কৃত্রিম রাসায়নিক আজ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি পরিবেশগত স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু সমুদ্র বা মাটিতে নয়, মানুষের রক্ত, ফুসফুস এবং প্ল্যাসেন্টাতেও পাওয়া যাচ্ছে।

এই দূষণ কোনো অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়। এই পদার্থগুলি উৎপাদন করে কর্পোরেশনগুলি মুনাফা করেছে, কিন্তু তার স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সমাজের বিশেষত সমাজের দুর্বলতম অংশের উপর। এটি বাজারের ব্যর্থতা নয়, বরং বাজারের সাফল্য: মুনাফা ব্যক্তিগত, ক্ষতি সামষ্টিক। সমাধান কেবল জনসচেতনতা প্রচার নয়। প্রয়োজন কঠোর উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ, দূষণকারীকে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা।

সমুদ্রের অম্লতা: অদৃশ্য কিন্তু গভীর সংকট

সমুদ্র পৃথিবীর বৃহত্তম জীবমণ্ডল। কিন্তু বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে গিয়ে সমুদ্রের জল ক্রমশ অম্লীয় হয়ে উঠছে। এর ফলে প্রবালপ্রাচীর, সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল এবং উপকূলনির্ভর মানুষের জীবিকা বিপন্ন হচ্ছে। কিন্তু এই অম্লতার জন্য কারা দায়ী? মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলির ঐতিহাসিক কার্বন নির্গমন। আর এর পরিণতি ভোগ করছে মৎস্যজীবী সমাজ, প্রবালপ্রাচীরনির্ভর উপকূলীয় জনগোষ্ঠী এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র দ্বীপ-রাষ্ট্রগুলি— যারা এই দূষণের জন্য প্রায় সম্পূর্ণ নির্দোষ। এটি একটি নৈতিক বিপর্যয়, যা আন্তর্জাতিক পরিবেশ কূটনীতিতে কেন্দ্রীয় স্থান পাওয়া উচিত। সমুদ্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করা মানে খাদ্যনিরাপত্তা ও মানবজীবনের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। কিন্তু সেই রক্ষা সম্ভব হবে না যতক্ষণ না ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে সম্পদ ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টন হচ্ছে।

সংকটের শিকড়: প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি ও প্রকৃতির পণ্যায়ন

এই পরিস্থিতি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল, যা প্রকৃতিকে জীবনের ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং অবিরাম আহরণের উপকরণ হিসেবে দেখে। এই ব্যবস্থায় প্রবৃদ্ধি না হলে সংকট দেখা দেয়। ফলে গ্রহের সীমাকে সম্মান করার কোনো কাঠামোগত প্রণোদনা এই ব্যবস্থার মধ্যে নেই। মুনাফা বৃদ্ধির এই তৃষ্ণায় বন, নদী, পাহাড়, খনিজ, উপকূল - সবকিছুকেই পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পরিকাঠামোকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলেও এর বাস্তব ফলাফল প্রায়শই মানুষের উচ্ছেদ এবং প্রকৃতির ধ্বংস।

তবে এই সংকটের জন্য কেবল কর্পোরেট শক্তিকে দায়ী করলে ছবির একটি বড় অংশ আড়াল থেকে যায়। কারণ সমসাময়িক রাষ্ট্রও প্রায়শই প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। নতুন এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দর, খনি, শিল্প করিডর, বিমানবন্দর, স্মার্ট সিটি কিংবা বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই প্রশ্ন করা হয়— এই প্রকল্পগুলির পরিবেশগত মূল্য কত? কত বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে? কত নদী বদলে যাচ্ছে? কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে?

উন্নয়নের সরকারি ভাষ্য সাধারণত GDP বৃদ্ধি, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণকে অগ্রগতির সূচক হিসেবে ধরে। ফলে পরিবেশ আইনকে “বাধা”, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আপত্তিকে “প্রতিবন্ধকতা” এবং প্রকৃতির সীমাকে “উন্নয়নের খরচ” হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। রাষ্ট্র তখন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নয়; বরং প্রবৃদ্ধি-নির্ভর অর্থনীতির সক্রিয় সংগঠক হয়ে ওঠে।

এই সমালোচনা কোনো একক সরকার বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই— ভিন্ন মতাদর্শের সরকারগুলির মধ্যেও— প্রবৃদ্ধিকেই উন্নয়নের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার একটি গভীর ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকৃত প্রশ্নটি সরকার বদলের নয়; উন্নয়নের ধারণাটিকেই পুনর্বিবেচনা করার। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন রয়েছে। সমস্ত মানুষ এই ব্যবস্থার সমান অংশীদার নয়। যে প্রান্তিক মানুষটি এক বেলা খাবারের জন্য কাজ করেন, তিনি এবং যে কর্পোরেশন বার্ষিক কোটি কোটি টাকা মুনাফা করে— এই দুজনের "ভোগ" এক নয়। তাই সংকোচনের দাবিটি সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য নয়; এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য অতিরিক্ত ভোগকারী ধনী শ্রেণি ও তাদের শিল্পের উপর।

কেমন উন্নয়ন চাই? "যথেষ্ট"-এর অর্থনীতির দিকে

প্রকৃত উন্নয়ন সেই উন্নয়ন যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে বর্তমানের চাহিদা পূরণ করে। কিন্তু এই সংজ্ঞা যথেষ্ট নয়, যদি সে উন্নয়ন অন্তহীন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জ না করে। আমাদের প্রয়োজন এমন এক অর্থনীতির যা "যথেষ্ট"-এর ধারণাকে কেন্দ্রে রাখে। অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত চাহিদা— সুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, আশ্রয়, সম্পর্ক, অর্থপূর্ণ কাজ— মেটানো হয়; কিন্তু কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট চাহিদা এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগকে উৎসাহিত করা হয় না। এর অর্থ দারিদ্র্য নয়। বরং এর অর্থ হলো অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন ও অপচয়কারী শিল্পের সংকোচন; সামরিক ব্যয় ও বিলাসবহুল ভোগের হ্রাস; এবং সেই সম্পদের পুনর্বণ্টন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গণপরিবহন ও সামাজিক সুরক্ষায়।

আমাদের প্রয়োজন এমন উন্নয়ন যা কৃষক, শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, আদিবাসী, মৎস্যজীবী এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারকে কেন্দ্রে রাখে; যা প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে তার পুনরুজ্জীবনের পথ তৈরি করে; যা সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করে এবং জীবনের মর্যাদাকে মুনাফার উপরে স্থান দেয়।

কমন্স পুনরুদ্ধার: সামষ্টিক মালিকানার রাজনীতি

পরিবেশ সংকটের একটি গভীর কারণ হলো সেই সামষ্টিক অধিকারের ক্ষয়, যা একসময় মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখত। ভূমি, জল, বন, বীজ— এগুলো একসময় ছিল সমাজের সম্পদ, এখন হয়েছে বাজারের পণ্য।

কমন্স পুনরুদ্ধারের মানে হলো এই সম্পদগুলিকে বাজারের বাইরে রাখা। গ্রামীণ জলাভূমির উপর কমিউনিটির অধিকার, আদিবাসীদের বনের উপর স্বায়ত্তশাসিত নিয়ন্ত্রণ, নদীর উপর কর্পোরেট দখলের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রতিরোধ— এগুলো কেবল পরিবেশ আন্দোলন নয়, এগুলো একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক যুক্তির দাবি। একইভাবে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গণপরিবহনকে পণ্যের বাইরে রাখতে হবে। কারণ যে সমাজে মানুষের মৌলিক চাহিদা বাজারের উপর নির্ভরশীল, সে সমাজে প্রকৃতির সঙ্গে ন্যায্য সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

প্রকৃতির মধ্যেই সমাধানের পথ: কিন্তু কার নেতৃত্বে?

পরিবেশ সংকটের সমাধান কেবল প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রকৃতিনির্ভর সমাধান। অরণ্য সংরক্ষণ, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, দেশজ প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ রক্ষা, ম্যানগ্রোভ পুনর্গঠন, কমিউনিটি-নিয়ন্ত্রিত বন ব্যবস্থাপনা, জৈব কৃষি, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং নগর সবুজায়ন— এগুলো জলবায়ু সংকট মোকাবিলার বাস্তব ও কার্যকর উপায়।

নিবিড় অরণ্য কয়লা খনির চেয়ে বেশি দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেয়। জীবন্ত ম্যানগ্রোভ অনেক ক্ষেত্রে কংক্রিট বাঁধের চেয়ে অধিক কার্যকরভাবে উপকূল রক্ষা করে। জলাভূমি শুধু জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় নয়, বন্যা নিয়ন্ত্রণেরও প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— এই প্রকৃতিনির্ভর সমাধানগুলির নেতৃত্ব কার হাতে? কর্পোরেট কার্বন ক্রেডিট বাজারের হাতে, যা বনকে "সবুজ বিনিয়োগে" পরিণত করে? নাকি সেইসব আদিবাসী ও স্থানীয় সমাজের হাতে, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বনকে বাঁচিয়ে রেখেছে? উত্তরটি স্পষ্ট— কিন্তু নীতিমালা প্রায়শই উল্টো পথে হাঁটে।

প্রকৃতিকে প্রভু নয়, নিজেকে প্রকৃতির অংশ ভাবার রাজনীতি

আধুনিক পুঁজিবাদী সভ্যতার ভিত্তি একটি বিভাজন— মানুষ বনাম প্রকৃতি। এই বিভাজন স্বাভাবিক বা চিরন্তন নয়, এটি ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যমূলক। কারণ প্রকৃতিকে "বাইরের" বস্তু হিসেবে দেখলেই তাকে নির্দ্বিধায় আহরণ করা যায়। বিপরীতে, অনেক আদিবাসী সমাজ এবং অ-পশ্চিমী দার্শনিক ঐতিহ্যে মানুষ প্রকৃতির অংশ— পৃথক ও শ্রেষ্ঠ সত্তা নয়। নিয়ামগিরির কোন্ড আদিবাসীদের কাছে পাহাড় কেবল খনিজের আধার নয়, তিনি তাদের দেবতা, তাদের জীবনের উৎস। এই বিশ্বদৃষ্টি কেবল "সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য" নয়, এটি একটি বিকল্প সম্পর্কের নীতি— যেখানে প্রকৃতির নিজস্ব মূল্য আছে, বাজারমূল্যের বাইরেও। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া মানে উন্নয়ন নীতিতে আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেবল "উপকারভোগী" নয়, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে স্বীকার করা।

file_00000000b72c7208bccb11c27e8e6fd5

প্রকৃতির হাত ধরে এগোনোর সময়: রূপান্তরের রাজনীতি

গ্রহের সীমা আমাদের এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ সংকট মূলত এই প্রমাণ নয় যে মানুষ প্রকৃতির সীমা অতিক্রম করেছে; বরং এটি প্রমাণ যে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রকৃতির সীমা অতিক্রম করেছে। পৃথিবী হঠাৎ করে দরিদ্র হয়ে যায়নি। আমরা এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি, যা সীমিত গ্রহে অসীম প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখে।

নিয়ামগিরি, হাসদেও, আরাবল্লী, সুন্দরবন কিংবা নিকোবর— প্রতিটি সংগ্রাম আমাদের একই শিক্ষা দেয়। প্রশ্নটি কেবল পরিবেশ রক্ষার নয়; প্রশ্নটি হলো কারা সিদ্ধান্ত নেবে, কার স্বার্থে উন্নয়ন হবে, এবং প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে। যদি উন্নয়নের অর্থ হয় আরও বেশি আহরণ, আরও বেশি ভোগ এবং আরও বেশি মুনাফা, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত নিজের ভিত্তিকেই ধ্বংস করবে।

আজকের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক কাজ হলো উন্নয়নের ভাষাকে পুনর্লিখন করা। এমন এক সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে অর্থনীতির লক্ষ্য হবে জীবনকে সমৃদ্ধ করা, বাজারকে নয়; যেখানে নদীকে কেবল জলসম্পদ হিসেবে নয়, জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে দেখা হবে; যেখানে বন কেবল কাঠের ভাণ্ডার নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরাধিকার; এবং যেখানে মানুষের মর্যাদা মুনাফার চেয়ে বেশি মূল্যবান।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের সামনে তাই একটি নৈতিক প্রশ্নের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও রাখে। আমরা কি এমন একটি পৃথিবী চাই, যেখানে প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়তে থাকে অথচ জীবনের ভিত্তিগুলি ভেঙে পড়ে? নাকি এমন একটি পৃথিবী, যেখানে অর্থনীতি গ্রহের সীমার মধ্যে থেকে মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে?

ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে পছন্দটি আমাদেরই। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো অর্থনীতি মৃত নদীতে বাঁচতে পারে না, কোনো বাজার বিলুপ্ত পরাগবাহীর বিকল্প হতে পারে না, এবং কোনো GDP ধ্বংসপ্রাপ্ত জীবমণ্ডলের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আমরা কত দ্রুত প্রকৃতিকে জয় করার রাজনীতি থেকে সরে এসে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারি তার উপর। অনুপ্রেরণার সময় পেরিয়ে গেছে। এখন সময় রূপান্তরের।

তথ্যসূত্র:

১. প্ল্যানেটারি বাউন্ডারি ফ্রেমওয়ার্ক: স্টকহোম রেজিলিয়েন্স সেন্টার — পৃথিবীর জৈব-ভৌত সীমা এবং মানুষের নিরাপদ বিচরণের ক্ষেত্র সংক্রান্ত গবেষণা। (https://www.stockholmresilience.org/research/planetary-boundaries.html)

২. "যথেষ্ট"-এর অর্থনীতি: ইউরোপীয় পার্লামেন্ট রিসার্চ ব্রিফিং — প্রবৃদ্ধির বাইরে: একটি টেকসই ও সমতাভিত্তিক ভবিষ্যতের পথ। (https://www.europarl.europa.eu/thinktank/en/document/EPRS_BRI(2023)747433)

৩. গ্লোবাল সাউথ ও জলবায়ু ন্যায়বিচার: সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (CSE India) — পরিবেশগত সমতা, সম্পদ বন্টন ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার সংক্রান্ত স্বাধীন প্রতিবেদন। (https://www.cseindia.org)

Discussion 0 comments

Replying to
No comments yet.

Be the first to join the discussion.

Our mission

We define ourselves as a “Mass Media of Resistance”

We seek to understand and analyze the Bahusaṅkaṭa (i.e., Polycrisis: a multidimensional crisis that doesn't have a straight forward solution) in which we all are immersed, along with the Bahuduḥkha (multiform suffering) of all sentient beings, through the lens of Madhyamāpratipada (the Middle Way in Buddhism which is our guiding force). And in collaboration with the broader Ecological Solidarity Movement and the Ecological Solidarity Alliance, we strive to bring the depth of these realities to the forefront of human consciousness.

Contact us

Email: thedegrowthofficial.com