Home
ব্রহ্মপুত্র নদী নয়, সমগ্র অববাহিকার বিপর্যয় - জল, পলি ও সভ্যতার প্রশ্ন
Opinion/Analysis

ব্রহ্মপুত্র নদী নয়, সমগ্র অববাহিকার বিপর্যয় - জল, পলি ও সভ্যতার প্রশ্ন

১৯ জুলাই বিকাল পাঁচটা। আসামের শিবসাগর জেলা। প্রশান্ত বোরঠাকুর নিজের ঘরে বসে আছেন। পুরো এলাকায় প্রশান্তবাবুর ঘর সবথেকে উঁচু জায়গায় অবস্থিত। তো বিকাল…

Discussion 0 comments

No comments yet.

Be the first to join the discussion.

Opinion/Analysis

ব্রহ্মপুত্র নদী নয়, সমগ্র অববাহিকার বিপর্যয় - জল, পলি ও সভ্যতার প্রশ্ন

১৯ জুলাই বিকাল পাঁচটা। আসামের শিবসাগর জেলা। প্রশান্ত বোরঠাকুর নিজের ঘরে বসে আছেন। পুরো এলাকায় প্রশান্তবাবুর ঘর সবথেকে উঁচু জায়গায় অবস্থিত। তো বিকাল পাঁচটা থেকে হঠাৎ বন্যার জল ঢুকতে আরম্ভ করলো আর দু'ঘণ্টার মধ্যে একতলা বাড়িতে জল বুকসমান। মা-বাবাকে নিয়ে একটা উঁচু চৌকির ওপর চেয়ার পেতে তাতে বসে কাটলো সারারাত।[ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৩ জুলাই]।

assam brahmaputra - flood 7

পাশের গ্রাম বোলাংকাটোনিতে বাস করেন রেখামনি গগৈ। বন্যা থেকে বাঁচতে সারারাত সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে একটা আম গাছের উপর কাটালেন। [BBC News, ২৬ জুলাই]।

এ কেবল দুটো পরিবারের কথা নয় আসামের ও অরুণাচলের কয়েক হাজার পরিবারের একই কথা।

ব্রহ্মপুত্র এবং বারাক উপাত্যকার মাঝে ভঙ্গুর পর্বতশ্রেণী হিমালয়ের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত আসাম স্বাভাবিক প্রাকৃতিক অবস্থান অনুযায়ী বন্যা প্রবণ অঞ্চল। ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি এবং অববাহিকায় বৃষ্টিপাত সাধারন গড় হিসেবে বেশি। উঁচু ঢাল বেয়ে নদী তার চলার পথে প্রচুর পলি/খাদ বয়ে নিয়ে আসে। পৃথিবীর সবথেকে বড় নদী দক্ষিণ আফ্রিকার আমাজন। Britanica র ৭ ই জুলাইয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বর্গ কিলোমিটারের হিসেবে, আমাজন নদীর থেকে ভারতের ব্রহ্মপুত্র নদীতে সাড়ে পাঁচ গুন বেশি পলি পরে। আর সেই পলি/খাদের বেশিরভাগই উপত্যকা আসামে জমা হয় ও নদীর নাব্যতা কমতে থাকে। এমনিতেই প্রতি বর্ষায় আসামের মধ্য ও নিম্ন অঞ্চলে বন্যা হয়ে থাকে। কিন্তু উচ্চ আসামে, বিশেষ করে শিবসাগর, চরাইদেও ও জোরহাটে বন্যা হয় না বললেই চলে। শিবসাগর জেলার প্রশান্ত বোরঠাকুরের বাবার বয়স ৯৫। তিনি তার জীবদ্যশায় এমন বন্যা দেখেন নি।

সত্যিই যদি ২০২৬ সালের এই বন্যা গত কয়েক দশকের মধ্যে আপার আসামের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা হয়ে থাকে, তবে এর জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না। অনেকের মতে ১৯৫০ এর পর এমন বন্যা হয় নি। সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ উচ্চ আসামের তিনটি জেলা, শিবসাগর, চরাইদেও ও জোরহাট। ক্ষতিগ্রস্থ ১২ টি জেলার ৮৫৬ টি গ্রামের সাত লাখের বেশি মানুষ। [Indian Express ২৮ জুলাই, ২০২৬]।

assam brahmaputra - flood 4

আপার আসামের এই বন্যা স্বাভাবিক নয় কারণ, সাধারণভাবে আসামে বন্যা হয়ে থাকে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরের জেলাগুলিতে হয়ে থাকে। যেমন ধেমাজী, বাড়পেটা, মোরিগাওঁ, লখিমপুর ইত্যাদি। কিন্তু উচ্চ আসামের চরাইদেও, শিবসাগর ও জোরহাট এরকম বন্যা বিগত আট দশকে দেখেনি। তাই আপার আসামের বন্যা অস্বাভাবিক। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় অবস্থিত আসামে সাধারণত বন্যা হয়ে থাকে মধ্য ও নিম্ন আসামে। কিন্তু এবছরের বন্যায় উচ্চ আসাম বিশেষ ক্ষতিগ্রস্থ। সমর্থিত সংবাদ মাধ্যম অনুযায়ী কয়েকটি শিশু সহ ৮৫ জন মৃত এবং লক্ষাধিক স্থানান্তরিত। [The Hindu, ৩রা আগস্ট, ২০২৬] সাধারণত এমন ধরনের দুর্যোগের ফলে কেবলই মানুষের ক্ষতি, মানুষের মৃত্যু এবং মানুষের হিসাব নিকাশই মূলত করা হয়ে থাকে। (৭ ই আগস্ট সংবাদ মাধ্যম অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা প্রায় ১০০ এবং ১৪ টি জেলার প্রায় ৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ)।

কিন্তু যারা পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে ভাবে ও কথা বলে তাদের চোখে এই ক্ষতির যে সার্বিক রূপ ধরা পড়ে এবং যে ধংসের খবর সাধারণ ভাবে সংবাদ মাধ্যম তুলে ধরে না, সেই সকল প্রাণের হিসাবও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যে বিস্তৃত বনাঞ্চল প্লাবিত হোলো, যে অসংখ্য পশুপাখির প্রাণ গেল, যে সকল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণ বিলুপ্ত হোলো, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার যে জীববৈচিত্র বদলে গেল চিরতরে তার হিসেব কে মেলাবে? প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দে বাধা দিয়ে যে উন্নয়নের পথে আমরা এগোচ্ছি তাতে যেমন কেবল মানুষের প্রানহানি হয় না, বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এমন বন্যার কারণও কেবল মাত্র একটি নদী ব্রহ্মপুত্রের কারণে হতে পারে না।

এ পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যম দ্বারা পাওয়া তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, এটি ছিল প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট (climate and Anthropogenic) একাধিক কারণের সম্মিলিত ফল।

সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণগুলো হলো—

১. অস্বাভাবিক ও অতিবর্ষণ:

এই বন্যার আগে কী ঘটেছিল?

প্রথমদিকে আসাম সরকার জানিয়েছিল যে, ১৮ ও ১৯ জুলাই নাগাল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাতই এই বন্যার প্রধান কারণ।

তবে আবহাওয়াবিদদের একাংশের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। ভারতের আবহাওয়া বিভাগের (IMD) সংজ্ঞা অনুযায়ী "মেঘভাঙা বৃষ্টি" বলতে এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতকে বোঝায়। কিন্তু ওই অঞ্চলে ৮–৯ ঘণ্টায় প্রায় ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। অর্থাৎ বৃষ্টি অত্যন্ত প্রবল হলেও সেটিকে প্রযুক্তিগত অর্থে "মেঘভাঙা বৃষ্টি" বলা যায় না।

তবে এই প্রবল বর্ষণের ফলে মন জেলায় একাধিক ভূমিধস হয় এবং কয়েকজনের প্রাণহানিও ঘটে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, নাগাল্যান্ডের ওখা, মোকোকচুং ও মন জেলা এবং আসামের চড়াইদেও জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় বহু গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। চড়াইদেও জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪৩৬ শতাংশ এবং মোকোকচুং জেলায় প্রায় ৪৯৩ শতাংশ বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।

assam brahmaputra - flood 5

শুধু অতিবৃষ্টিই কি এই বিপর্যয়ের কারণ?

গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ধ্রুবজ্যোতি সাহারিয়া, যিনি এই বন্যা নিয়ে গবেষণা করছেন, তাঁর মতে শুধুমাত্র অতিবৃষ্টি দিয়ে এই বিপর্যয়কে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

তিনি বলেন, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট (climate and anthropogenic combined) কারণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নদী উপত্যকার দুই পাশে বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক খনন ও মাটি কাটার চিহ্ন রয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ পলি নদীতে এসে জমছে এবং নদীর জল বহনের ক্ষমতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

আইআইটি রূড়কির নদী প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নয়ন শর্মার মতে, বন উজাড়ও এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ঘন বনভূমি থাকলে বৃষ্টির জল সহজে মাটির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বন ধ্বংস হয়ে গেলে সেই সুযোগ আর থাকে না। ফলে জল দ্রুত নিচে নেমে আসে এবং প্রচুর পলি বহন করে নদীতে জমা করে। এতে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যায় এবং নদীর জল ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ অল্প সময়েই নদী উপচে বন্যা সৃষ্টি হয়।

অধ্যাপক শর্মার মতে, একটি নদী অববাহিকাকে নিরাপদ রাখতে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বনভূমি থাকা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, আধুনিক বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও উন্নত হলেও, যদি বন উজাড় ও নদী অববাহিকার অবক্ষয় চলতেই থাকে, তাহলে শুধু পূর্বাভাস দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হবে না।

অন্যদিকে অধ্যাপক সাহারিয়া উল্লেখ করেন, ওখা-দোয়াং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে অতিরিক্ত জল ছেড়ে দেওয়া হলেও বন্যার জল কমাতে তা বিশেষ কার্যকর হয়নি। [Indian Express]

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তিব্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে অরুণাচল প্রদেশ হয়ে আসামে প্রবেশ করা নদী ব্রহ্মপুত্রর প্রায় ৫০ টি উপনদী রয়েছে। উত্তর পূর্ব ভারতের এই বিস্তীর্ণ পার্বত্য অঞ্চলে একাধিক বাঁধ ও জ্লবিদ্যুৎ প্রকল্প, একাধিক খনিজ প্রকল্প এবং রাস্তা নির্মাণের কারণে যে ধরনের ডিনামাইট ব্লাস্টিং করা হয় ও সাথে বন ও বৃক্ষ নিধন হয় তাতে ঐ অঞ্চলের ভূমিধ্বস প্রায় সকল উপনদীগুলির নদীখাদ উঁচু হয়ে নদীর জল ধারনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বর্ষাকালে সেই উপনদীগুলি বৃষ্টির জল, খাদ ও পলি সহ ব্রহ্মপুত্র নদীতে নিয়ে ফেলে। ফলে ব্রহ্মপুত্র নদীর তলদেশও উঁচু হয়ে জলধারণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

২. জলবায়ু পরিবর্তন:

পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডল এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে স্বল্প সময়ে অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ঘটনা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিজে বন্যা সৃষ্টি না করলেও, বন্যার তীব্রতা ও ধ্বংসক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।[Indian Express]

৩. পাহাড়ি অঞ্চলে বন উজাড়:

বনভূমি বৃষ্টির জলকে আটকে রাখে এবং ধীরে ধীরে মাটির ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। কিন্তু বন কেটে ফেলার ফলে জল দ্রুত নিচে নেমে আসে, যার ফলে আকস্মিক বন্যা ও মাটিক্ষয় বেড়ে যায়।[India Today]

৪. খনন, খনি কার্যক্রম ও পাহাড় কাটা:

কিছু বিজ্ঞানীর মতে, বিস্তৃত খনন ও পাহাড় কাটা নদীতে অতিরিক্ত পলি বহন করে আনতে পারে, যার ফলে নদীর জল বহনের ক্ষমতা কমে যায়। তবে এই বিষয়টি এখনও গবেষণাধীন; সমগ্র বন্যার জন্য এটিকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে ঘোষণা করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য এখনও তৈরি হয়নি।[Indian Express]

এখানে উল্লেখ্য যে, সরকারি মহল প্রথমদিকে দাবি করেছিল, এই ভয়াবহ বন্যার একমাত্র কারণ ছিল অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। কিন্তু পরে প্রকাশিত তথ্য ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সেই ব্যাখ্যাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। পরিবেশবিদ, গণসংগঠন এবং সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—আসাম-নাগাল্যান্ড সীমান্তের পাহাড়ে বছরের পর বছর ধরে অবৈধ কয়লা ও পাথর উত্তোলন, র‍্যাট-হোল মাইনিং এবং নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংসের ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখার পর বিভিন্ন সংগঠন ছবি, নথি ও তথ্য প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

স্থানীয় মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পাহাড় কেটে কয়লা ও পাথর তোলা হয়েছে। এর ফলে পাহাড়জুড়ে অসংখ্য গভীর খাদ তৈরি হয়েছে এবং পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগে যে পাহাড় বৃষ্টির জল শোষণ ও ধরে রাখতে পারত, এখন তা আর পারে না। বরং প্রবল বর্ষণে কাদা, পাথর, কয়লার বর্জ্য এবং বিপুল পরিমাণ পলি একসঙ্গে নেমে এসে দিহিং, দিসাং ও ঝাঞ্জি নদীতে জমা হচ্ছে। এতে নদীর নাব্যতা দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নদী উপচে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। (ভূমিধস ও মাটিক্ষয়ের কারণে বিপুল পরিমাণ পলি নদীতে জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যায়। ফলে নদীর জল ধারণক্ষমতা কমে যায় এবং সহজেই নদী উপচে পড়ে।[Indian Express])

5assam brahmaputra - flood 6

৬. পুরোনো ও দুর্বল বাঁধ ব্যবস্থা:

অনেক এলাকায় বাঁধের আয়ু শেষ হয়ে গেছে বা বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে, যার ফলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে।[Outlook India ২৫ জুলাই ২০২৬]

৭. জলাভূমি ও প্রাকৃতিক বন্যাভূমির বিলুপ্তি:

জলাভূমি প্রাকৃতিকভাবে অতিরিক্ত বন্যার জল ধরে রাখে। কিন্তু সেগুলি ভরাট বা দখল হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত জল ছড়িয়ে পড়ার নিরাপদ জায়গা কমে গেছে।[Assam Disaster Management Authority]

২০২৬ সালের আসামের বন্যা সম্ভবত কোনো একক কারণের ফল নয়; বরং এটি বহু কারণের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফল। এখানে শুধু ব্রহ্মপুত্র নদীকে দায়ী করলে বাস্তব চিত্র ধরা পড়বে না। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, মাটিক্ষয়, সম্ভাব্য খনন কার্যক্রমের প্রভাব, নদীতে পলি জমা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়েই এই বছরের বন্যাকে এতটা ভয়াবহ করে তুলেছে।

অতএব, এই দুর্যোগকে কেবল একটি নদীর সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সমগ্র নদী অববাহিকার (River Basin) সমস্যা হিসেবে বোঝা উচিত। ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য বন সংরক্ষণ, প্রয়োজনে খনন কার্যক্রমের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, জলাভূমি রক্ষা, সমন্বিত নদী অববাহিকা পরিকল্পনা এবং ক্রমবর্ধমান চরম বৃষ্টিপাতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার নীতি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম, বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ কর্মীদের বিবরণ অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত আসামে সাম্প্রতিক বন্যা বিভীষিকার উল্লেখ করে এটাই বলতে চাইব যে, আসামে দীর্ঘ সময়কাল ধরে বিভিন্ন সরকারের আসামকে বন্যা মুক্ত করার নানান প্রতিশ্রুতির পরও আসাম আজও প্লাবিত। এটি শুধু আসাম নয়, প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই, তা সে গুজরাট হোক বা কেরালা, কাশ্মীর হোক বা বাংলা, আধুনিক উন্নয়নের সর্বগ্রাশি প্রকল্পের ও ততজনিত ব্যতিক্রমী প্রভাবে আম ভারতবাসীর দুর্ভোগ অব্যাহত। উন্নয়নের লভ্যাংশের ভাগ পাক আর না পাক দুর্ভোগের ১০০ শতাংশই জোটে সাধারণ ভারতবাসীর কপালে। তাই বিভিন্ন দেশে আজ সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের পরামর্শ নেয়ার কথা উঠছে সারা বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মহলে। অনেক দেশ বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নিয়েছে।

সবারই উপলব্ধি যে বন্যা শুধুমাত্র কোনো একটি নদীর বিষয় নয়। বরং সার্বিক নদী অববাহিকার বিষয়। সেই ভাবনা থেকেই এই প্রবন্ধ।

প্রথম অধ্যায়:

এটি বন্যা, নাকি এটি সভ্যতার প্রতি সতর্কবার্তা?

"সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি বড় বন্যা শুধু জল নিয়ে আসে না; বরং সকলের সামনে মানুষের  উন্নয়ন-দর্শনের সীমাবদ্ধতারও একটি আয়না তুলে ধরে।"

২০২৬ সালের উত্তর-পূর্ব ভারতের বন্যা হয়তো ইতিহাসে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে নথিভুক্ত হবে। কিন্তু ভবিষ্যতের পরিবেশবিজ্ঞানী, ভূতত্ত্ববিদ এবং নীতিনির্ধারকেরা হয়তো এই ঘটনাকে অন্যভাবে পড়বেন। তাঁরা হয়তো বলবেন—এটি ছিল এমন এক সময়, যখন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা আমাদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল যে নদীকে আর কেবল একটি জলধারা হিসেবে দেখা যাবে না।

আমরা সাধারণত নদীকে মানচিত্রে আঁকা একটি নীল রেখা হিসেবে দেখি। সংবাদমাধ্যমও বন্যার সময় বলে, "ব্রহ্মপুত্র বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে", "নদীর জল বেড়েছে", "নদী ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।" এই ভাষার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ এতে মনে হয়, বন্যার কারণ যেন কেবল নদী। কিন্তু আধুনিক নদীবিজ্ঞান (Hydrology), ভূ-আকৃতিবিদ্যা (Geomorphology) এবং বাস্তুবিদ্যা (Ecology) আমাদের একেবারে ভিন্ন একটি সত্যের সামনে দাঁড় করায়।

নদী কখনও একা বন্যা সৃষ্টি করে না। একটি বন্যা সৃষ্টি হয় সমগ্র নদী অববাহিকার সম্মিলিত আচরণ থেকে। নদীকে নয়, তার জন্মভূমিকে বুঝতে হবে।

assam brahmaputra - flood 12

ব্রহ্মপুত্রের জন্ম হিমবাহে। তার প্রথম জল আসে বরফ গলা স্রোত থেকে। তারপর সেই জলে মিশে যায়— অরুণাচলের প্রাচীন অরণ্য, নাগাল্যান্ডের পাহাড়, ভুটানের উপত্যকা, মেঘালয়ের ঢাল, আসামের শত শত উপনদী, অসংখ্য জলাভূমি, এবং হাজার বছরের পলি। অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্রে যে জল আমরা দেখি, সেটি কেবল জল নয়। এটি সমগ্র ভূদৃশ্যের ইতিহাস বহন করে।

একটি পাহাড়ে ভূমিধস হলে তার কাদা শেষ পর্যন্ত নদীতে পৌঁছায়। একটি বন কাটা হলে কয়েক বছর পরে তার প্রভাব নদীর স্রোতে ধরা পড়তে পারে। একটি জলাভূমি ভরাট করলে দশ কিলোমিটার দূরের গ্রামে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। প্রকৃতি এই সব ঘটনাকে আলাদা করে দেখে না। দেখে কেবল মানুষ।

খণ্ডিত উন্নয়নের দর্শন - আধুনিক রাষ্ট্র সাধারণত উন্নয়নকে প্রকল্পে ভাগ করে দেখে।

একটি বাঁধ। একটি রাস্তা। একটি খনি। একটি সেতু। একটি রেললাইন। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য আলাদা অনুমোদন। আলাদা অর্থনীতি। আলাদা পরিবেশ মূল্যায়ন। কিন্তু প্রকৃতি প্রকল্প বোঝে না। প্রকৃতি বোঝে সম্পর্ক। এই সম্পর্কের নামই নদী অববাহিকা।

তাই ব্রহ্মপুত্র একটি নদী নয় ব্রহ্মপুত্র আসলে একটি জীবন্ত নেটওয়ার্ক। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ নদী অববাহিকা।

এই অববাহিকায় রয়েছে—

হিমবাহ, তুষার, পৃথিবীর নবীনতম পর্বতমালা, উষ্ণমণ্ডলীয় বৃষ্টি-অরণ্য, হাজারেরও বেশি উপনদী, বিস্তীর্ণ জলাভূমি, বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, এবং কয়েক কোটি মানুষের জীবন। এই বিশাল ব্যবস্থার যেকোনো অংশে পরিবর্তন ঘটলে তার প্রতিক্রিয়া অন্যত্র পৌঁছাতে বাধ্য। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু একটি কারণ। আজ আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলি। অবশ্যই সেটি গুরুত্বপূর্ণ। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করে। ফলে চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। কিন্তু যদি একই সময়ে,

পাহাড়ে বন কমে, ভূমিধস বাড়ে, নদীতে পলি জমে, জলাভূমি হারিয়ে যায়, প্রাকৃতিক বন্যাভূমি দখল হয়, তাহলে বন্যা আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন একা নয়। মানুষের ভূমি ব্যবহারের ধরনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের নতুন প্রশ্ন এবং আজ প্রশ্নটি আর কেবল

"কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ?", "কত কিলোমিটার রাস্তা?", "কত টন কয়লা?" - এই প্রশ্ন নয়।

আজ প্রশ্ন হওয়া উচিত - এই প্রকল্প কি সমগ্র নদী অববাহিকার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষা করছে? যদি উত্তর "না" হয়, তবে সেই উন্নয়ন ভবিষ্যতের দুর্যোগের বীজও বপন করতে পারে।

একটি নতুন বৈজ্ঞানিক দর্শন:

বিশ্বের পরিবেশবিজ্ঞান গত তিন দশকে একটি মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। আগে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হতো। আজ নদীর সঙ্গে সহাবস্থানের কথা বলা হচ্ছে। আগে বনকে কাঠের ভাণ্ডার মনে করা হতো। আজ বনকে "প্রাকৃতিক অবকাঠামো" বলা হচ্ছে। আগে জলাভূমিকে অনাবাদি জমি বলা হতো। আজ তাকে "প্রাকৃতিক বন্যা-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা" বলা হচ্ছে।

এই পরিবর্তন কেবল ভাষার নয়। এটি বিজ্ঞানের পরিবর্তন।

এই পরিস্থিতিতে ব্রহ্মপুত্র আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখেছে—

আমরা কি উন্নয়নের পুরোনো ব্যাকরণে আটকে থাকব, যেখানে প্রকৃতি উন্নয়নের বাধা? নাকি এমন একটি নতুন ব্যাকরণ গড়ে তুলব, যেখানে নদী, বন, পাহাড় এবং মানুষ, সবাই উন্নয়নের অংশীদার?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে উত্তর-পূর্ব ভারতের ভবিষ্যৎ।

দ্বিতীয় অধ্যায়

নদী নয়, নদী অববাহিকা: ব্রহ্মপুত্রের অদৃশ্য শরীর

"আমরা নদীকে দেখি, কিন্তু নদীকে তৈরি করা ভূদৃশ্যকে দেখি না। ফলে আমরা লক্ষণ দেখি, রোগটি দেখি না।"

একজন চিকিৎসক যদি রোগীর জ্বর মাপেন কিন্তু তার হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস বা রক্ত পরীক্ষা না করেন, তবে রোগ নির্ণয় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ব্রহ্মপুত্রকে শুধুমাত্র নদী হিসেবে দেখা অনেকটা সেই ভুলেরই সমতুল্য।

কারণ নদী নিজে একটি পৃথক সত্তা নয়; নদী হলো একটি বিশাল ভূ-প্রাকৃতিক ব্যবস্থার দৃশ্যমান অংশ মাত্র। তার প্রকৃত শরীর বিস্তৃত থাকে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে—পাহাড়, বন, উপনদী, মাটি, জলাভূমি এবং মানুষের বসতির মধ্যে।

নদী অববাহিকা কী?

নদী অববাহিকা (River Basin বা Drainage Basin) হলো সেই সমগ্র অঞ্চল, যেখানে পড়া বৃষ্টির জল, বরফ গলা জল এবং ঝরনার জল শেষ পর্যন্ত একটি প্রধান নদীতে এসে মেশে।

assam brahmaputra - flood 10

অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মধ্যে রয়েছে—

তিব্বতের হিমবাহ, অরুণাচল প্রদেশের পার্বত্য বন, ভুটানের নদী উপত্যকা, নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ের পাহাড়, আসামের উপনদী, বন্যাভূমি ও জলাভূমি, এবং বাংলাদেশের নিম্ন অববাহিকা। এই সমগ্র অঞ্চল একে অপরের সঙ্গে জল, পলি, পুষ্টি, শক্তি এবং জীবনের মাধ্যমে যুক্ত।

ব্রহ্মপুত্র: পৃথিবীর সবচেয়ে তরুণ ও শক্তিশালী নদীগুলির একটি। ব্রহ্মপুত্র পৃথিবীর অন্যতম নবীন পর্বতমালা, হিমালয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। হিমালয় এখনও ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয়; ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলে পাহাড় এখনও ধীরে ধীরে উঁচু হচ্ছে।

এই কারণেই হিমালয়ের ঢালগুলি অত্যন্ত ভঙ্গুর। প্রবল বর্ষণ, ভূমিকম্প বা পাহাড় কেটে নির্মাণকাজ সহজেই ভূমিধস ঘটাতে পারে। সেই ভূমিধসের মাটি ও শিলাখণ্ড শেষ পর্যন্ত নদীতে পৌঁছে পলি (sediment) হিসেবে জমা হয়। অর্থাৎ, ব্রহ্মপুত্রের চরিত্র কেবল তার জলের উপর নির্ভর করে না; বরং তার সঙ্গে বয়ে আনা বিপুল পলির উপরও নির্ভর করে।

নদীর অদৃশ্য সহযোদ্ধারা

আমরা প্রায়ই ভাবি, নদীকে শুধু নদীই বাঁচায়। বাস্তবে নদীকে বাঁচিয়ে রাখে তার চারপাশের বাস্তুতন্ত্র।

১. বন

উজানের বনকে নদীর "সবুজ স্পঞ্জ" বলা যায়। বনভূমি বৃষ্টির জল শোষণ করে, ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয় এবং মাটির ক্ষয় কমায়। ফলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং নদীতে অতিরিক্ত পলি যাওয়া কমে।

২. জলাভূমি

জলাভূমি প্রকৃতির জলাধার। বর্ষাকালে অতিরিক্ত জল ধরে রাখে এবং ধীরে ধীরে তা নদীতে ফিরিয়ে দেয়। ফলে বন্যার তীব্রতা কমে এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীতে জল বজায় থাকে।

৩. উপনদী

উপনদীগুলি কেবল জল আনে না; তারা পুষ্টি, পলি এবং জীববৈচিত্র্যও বহন করে। কিন্তু যদি একাধিক উপনদীতে একই সময়ে চরম বৃষ্টিপাত হয়, তবে মূল নদীর উপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।

৪. বন্যাভূমি

নদীর বন্যাভূমি হলো তার "নিরাপত্তা ভালভ"। বর্ষায় নদী স্বাভাবিকভাবেই এই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। যদি এই বন্যাভূমি দখল করে স্থায়ী নির্মাণ করা হয়, তবে নদীর জল অন্যত্র আরও বেশি ক্ষতি করতে পারে।

৫. পলি: নদীর বন্ধু, আবার চ্যালেঞ্জও

ব্রহ্মপুত্র পৃথিবীর অন্যতম বেশি পলি বহনকারী নদী। এই পলি আসামের উর্বর কৃষিজমি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন অস্বাভাবিক হারে পলি নদীতে আসে, যেমন অতিরিক্ত ভূমিধস, বন উজাড় বা অন্যান্য কারণে, তখন নদীর কিছু অংশ অগভীর হয়ে যেতে পারে, নদীপথ পরিবর্তিত হতে পারে এবং বন্যার প্রকৃতি বদলে যেতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার: কোনো নির্দিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্প বা একক কারণকে পলি বৃদ্ধির জন্য দায়ী করতে হলে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। কারণ পলি পরিবহন একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে ভূতত্ত্ব, বৃষ্টিপাত, ভূমি ব্যবহার এবং নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা, সবই ভূমিকা রাখে।

কেন খণ্ডিত পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়?

ধরা যাক, একটি পাহাড়ে রাস্তা নির্মাণ হলো, অন্য জায়গায় একটি খনি চালু হলো, আরেক স্থানে একটি বাঁধ তৈরি হলো। প্রতিটি প্রকল্প হয়তো আলাদাভাবে পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হতে পারে।

কিন্তু যখন এগুলির সম্মিলিত প্রভাব একই নদী অববাহিকার উপর পড়ে, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।

এই কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে এখন Cumulative Impact Assessment এবং Integrated River Basin Management-এর উপর এত জোর দেওয়া হচ্ছে।

প্রকৃতির ভাষা শেখা:

মিসিং, আদি, আপাতানি, কার্বি, বোড়োসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী নদীকে কখনও কেবল একটি জলধারা হিসেবে দেখেনি।

তাদের কাছে নদী মানে—বন, মাছ, চর, পাখি, বন্যা, কৃষি, ঋতুচক্র এবং মানুষের জীবন।

আধুনিক বিজ্ঞানও আজ একই কথা বলছে—নদীকে বুঝতে হলে তার সমগ্র অববাহিকাকে বুঝতে হবে।

ব্রহ্মপুত্রকে রক্ষা করতে চাইলে কেবল নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ করলেই হবে না। সাথে রক্ষা করতে হবে, উজানের বন, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা, উপনদীর স্বাস্থ্য, জলাভূমি, প্রাকৃতিক বন্যাভূমি এবং নদীর সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে।

কারণ নদী তার তীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নদী তার সমগ্র অববাহিকার মধ্যেই বেঁচে থাকে।

তৃতীয় অধ্যায়

প্রকৃতি একটি অবকাঠামো: বন, জলাভূমি ও বন্যাভূমির অদৃশ্য অর্থনীতি:

"সবচেয়ে মূল্যবান অবকাঠামোর অনেকগুলিই কংক্রিট দিয়ে তৈরি নয়। সেগুলি তৈরি করেছে প্রকৃতি, হাজার হাজার বছরে।"

আমরা যখন "অবকাঠামো" (Infrastructure) শব্দটি শুনি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে জাতীয় সড়ক, সেতু, রেলপথ, বাঁধ, বন্দর, বিমানবন্দর কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছবি। উন্নয়নের প্রচলিত ভাষায় এগুলিই সভ্যতার অগ্রগতির প্রতীক। কিন্তু গত কয়েক দশকে পরিবেশবিজ্ঞান একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে, একটি বন কি অবকাঠামো নয়? একটি জলাভূমি কি অবকাঠামো নয়? একটি বন্যাভূমি কি কোনো বাঁধের মতোই মানুষের জীবন রক্ষা করে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই জন্ম হয়েছে Natural Infrastructure বা প্রাকৃতিক অবকাঠামো ধারণার।

প্রকৃতি: সভ্যতার অদৃশ্য প্রকৌশলী:

প্রকৃতি হাজার হাজার বছর ধরে এমন সব কাজ করে চলেছে, যেগুলির জন্য মানুষকে আজ হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়।

একটি সুস্থ বন—বৃষ্টির জল ধরে রাখে, মাটির ক্ষয় কমায়, ভূমিধসের ঝুঁকি হ্রাস করে, ভূগর্ভস্থ জল পুনরায় ভরাট করে, নদীতে পলি যাওয়া কমায়, স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে এবং কার্বন সঞ্চয় করে।

একটি জলাভূমি—অতিরিক্ত বন্যার জল ধরে রাখে, ধীরে ধীরে নদীতে ফিরিয়ে দেয়, জল পরিশোধন করে,

মাছ, উভচর প্রাণী ও পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল তৈরি করে।

একটি প্রাকৃতিক বন্যাভূমি—নদীর অতিরিক্ত জল নিরাপদে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে, আকস্মিক বন্যার উচ্চতা কমায়, কৃষিজমিতে পুষ্টিকর পলি ছড়িয়ে দেয়।

অর্থাৎ প্রকৃতি বিনামূল্যে এমন সেবা দিয়ে চলেছে, যাকে পরিবেশ অর্থনীতিতে বলা হয় Ecosystem Services।

প্রকৃতির অদৃশ্য অর্থনীতি: Ecosystem Services

১৯৯৭ সালে পরিবেশ অর্থনীতিবিদ Robert Costanza-এর নেতৃত্বে প্রকাশিত একটি বহুল আলোচিত গবেষণা দেখায় যে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র মানুষকে যে সেবা দেয়, তার অর্থনৈতিক মূল্য বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে তুলনীয় মাত্রার। পরবর্তী গবেষণাগুলি পদ্ধতি ও পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক করলেও একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—প্রকৃতির এই সেবাগুলির মূল্য অসাধারণ, অথচ এগুলি প্রায়ই বাজারে দৃশ্যমান নয়।

জাতিসংঘের Millennium Ecosystem Assessment বাস্তুতন্ত্রের সেবাকে চার ভাগে ভাগ করেছে—

১. Provisioning Services – খাদ্য, মাছ, কাঠ, ঔষধি উদ্ভিদ।

২. Regulating Services – বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, পরাগায়ন, জল পরিশোধন।

৩. Cultural Services – সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা, শিক্ষা, পর্যটন।

৪. Supporting Services – মাটির উর্বরতা, পুষ্টিচক্র, জীববৈচিত্র্য রক্ষা।

এই চারটি স্তম্ভ ছাড়া মানবসভ্যতার অর্থনীতি টিকে থাকতে পারে না।

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার প্রাকৃতিক অবকাঠামো:

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় কয়েকটি প্রাকৃতিক অবকাঠামো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

১. অরুণাচলের বন

এই বনগুলি শুধু কাঠের ভাণ্ডার নয়। এগুলি বৃষ্টির জল নিয়ন্ত্রণ করে। ঢালকে স্থিতিশীল রাখে। ভূমিধস কমাতে সাহায্য করে। নদীতে অতিরিক্ত পলি যাওয়া কমায়।

২. আসামের বিল ও জলাভূমি

আসামের অসংখ্য বিল প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করে। বর্ষাকালে এগুলি অতিরিক্ত জল ধারণ করে। শুষ্ক মৌসুমে জল ধরে রাখে। এগুলি হারিয়ে গেলে নদীর উপর চাপ বেড়ে যায়।

৩. বন্যাভূমি

আমরা প্রায়ই ভাবি, নদী কেন প্রতি বছর বন্যাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে।

উত্তর হলো—এটাই নদীর স্বাভাবিক আচরণ।

হাজার হাজার বছর ধরে নদী এভাবেই বেঁচে আছে।

যখন মানুষ সেই বন্যাভূমিতে স্থায়ী নির্মাণ করে, তখন নদী তার পুরোনো পথ খুঁজতে গিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

assam brahmaputra - flood 3

প্রকৃতি বনাম কংক্রিট: একটি মিথ্যা দ্বন্দ্ব

প্রায়ই মনে করা হয়—উন্নয়ন মানেই কংক্রিট।

সংরক্ষণ মানেই উন্নয়নের বিরোধিতা। কিন্তু আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান এই দ্বৈততাকে গ্রহণ করে না। আজ বিশ্বব্যাপী একটি নতুন ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে— Nature-based Solutions (NbS)

অর্থাৎ—যেখানে সম্ভব, প্রকৃতির নিজস্ব ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সমস্যা সমাধান।

উদাহরণস্বরূপ—

বাঁধের পাশাপাশি জলাভূমি পুনরুদ্ধার,

কংক্রিটের তীররক্ষার পাশাপাশি নদীতীরে দেশীয় উদ্ভিদ রোপণ,

পাহাড়ে কেবল রিটেইনিং ওয়াল নয়, বন সংরক্ষণ,

শহরে কেবল নর্দমা নয়, জলধারণক্ষম সবুজ অঞ্চল তৈরি।

বিশ্বের শিক্ষা:

নেদারল্যান্ডস উপলব্ধি করেছে—

সব বন্যা কেবল উঁচু বাঁধ দিয়ে আটকানো যায় না। তাই তারা নদীকে জায়গা ফিরিয়ে দিয়েছে।

চীন উপলব্ধি করেছে—

উজানের বন ধ্বংস করলে ভাটির মানুষ বিপদে পড়ে।

তাই বন পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করেছে—

সব নদীকে সোজা রেখায় বন্দি করা যায় না।

তাই বহু নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

এসব উদাহরণ একটি সাধারণ শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন নয়; প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়ন।

একজন পরিবেশকর্মীর দৃষ্টিতে:

একজন পরিবেশকর্মী হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি উন্নয়নের হিসাব করার সময় একটি বন যে বন্যা কমায়, একটি জলাভূমি যে কোটি কোটি লিটার জল ধরে রাখে, একটি পাহাড়ি অরণ্য যে ভূমিধসের ঝুঁকি কমায়—এসবের অর্থনৈতিক মূল্যও বিবেচনা করি? যদি না করি, তাহলে উন্নয়নের লাভ-ক্ষতির হিসাব কখনও সম্পূর্ণ হবে না।

আমরা রাস্তা তৈরির খরচ লিখি। কিন্তু বন হারানোর খরচ? আমরা বাঁধের নির্মাণ ব্যয় লিখি। কিন্তু একটি জলাভূমি হারিয়ে যাওয়ার সামাজিক ব্যয়? আমরা বিদ্যুতের মূল্য হিসাব করি। কিন্তু জীববৈচিত্র্য হারানোর মূল্য?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়া উন্নয়নের কোনো অর্থনীতি পূর্ণ হতে পারে না।

একটি সুস্থ বন, একটি জীবন্ত জলাভূমি, একটি স্থিতিশীল পাহাড় এবং একটি স্বাভাবিক বন্যাভূমি—এসব বিলাসিতা নয়। এগুলি রাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল অবকাঠামো। কংক্রিটের অবকাঠামো মানুষ নির্মাণ করে। প্রাকৃতিক অবকাঠামো নির্মাণ করে বিবর্তন।

প্রথমটি তৈরি হতে কয়েক বছর লাগে। দ্বিতীয়টি তৈরি হতে লাগে শতাব্দী, কখনও সহস্রাব্দ।

তাই উন্নয়নের নতুন ব্যাকরণ আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—প্রকৃতিকে রক্ষা করা উন্নয়নের বিপরীত নয়; বরং উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তায় বিনিয়োগ।

assam brahmaputra - flood 2

চতুর্থ অধ্যায়

উন্নয়নের বর্তমান মডেল: বাঁধ, খনি, সড়ক ও সমষ্টিগত প্রভাবের (Cumulative Impact) বিজ্ঞান:

"প্রকৃতি কখনও এক একটি প্রকল্পের প্রভাব আলাদা করে অনুভব করে না; সে অনুভব করে সব প্রকল্পের সম্মিলিত প্রভাব।"

গত কয়েক দশকে "উন্নয়ন" শব্দটির সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে বড় অবকাঠামো। উঁচু বাঁধ, বহু-লেনের মহাসড়ক, দীর্ঘ সেতু, সুড়ঙ্গ, খনি, শিল্পাঞ্চল, বন্দর। এগুলোকে আধুনিক রাষ্ট্রের অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উন্নত যোগাযোগ, বিদ্যুৎ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই।

কিন্তু পরিবেশবিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।

যদি একই নদী অববাহিকায় একসঙ্গে বহু প্রকল্প নির্মিত হয়, তবে তাদের সম্মিলিত প্রভাব কী হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই Cumulative Impact বা সমষ্টিগত প্রভাব।

একটি প্রকল্প বনাম একশোটি প্রকল্প

ধরা যাক, একটি পাহাড়ি নদীর উপর একটি ছোট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হলো। হয়তো তার পরিবেশগত প্রভাব সীমিত। এবার কল্পনা করুন, একই অববাহিকায় ৩০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ১২টি বড় সড়ক, বহু সুড়ঙ্গ, কয়েকটি খনি, শত শত কিলোমিটার পাহাড় কেটে রাস্তা, অসংখ্য পাথর খাদান ও নতুন শহর।

প্রতিটি প্রকল্প হয়তো আলাদাভাবে অনুমোদিত।

কিন্তু প্রকৃতি এগুলিকে আলাদা করে দেখে না।

প্রকৃতির কাছে এগুলি একটি সম্মিলিত পরিবর্তন।

একটি সহজ উদাহরণ দিই।

একজন চিকিৎসক যদি একজন মানুষকে একটি ওষুধ দেন, তাতে হয়তো কোনো সমস্যা হবে না।

কিন্তু একই মানুষ যদি দশজন চিকিৎসকের কাছ থেকে দশটি আলাদা ওষুধ খেতে শুরু করেন?

প্রত্যেক ওষুধ হয়তো নিরাপদ। কিন্তু তাদের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া বিপজ্জনক হতে পারে। নদী অববাহিকার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। কেন হিমালয় এত সংবেদনশীল? কারণ, হিমালয় পৃথিবীর সবচেয়ে নবীন পর্বতমালা। এটি এখনও গঠিত হচ্ছে। ভূমিকম্প এখানে স্বাভাবিক ঘটনা। পাহাড়ের ঢাল ভঙ্গুর। প্রবল বর্ষা হয়। তাই, এই ধরনের ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে বড় প্রকল্প পরিকল্পনার সময় অত্যন্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

যখন পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হয়, সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়,

বড় বিস্ফোরণ হয়, নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়,

তখন প্রতিটি কাজ স্থানীয় ভূতত্ত্বের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। এর মানে এই নয় যে প্রতিটি প্রকল্প অবশ্যই ক্ষতিকর। বরং এর অর্থ হলো যে, এই ধরনের অঞ্চলে পরিকল্পনা আরও বৈজ্ঞানিক হওয়া দরকার।

প্রকল্পভিত্তিক EIA-এর সীমাবদ্ধতা

ভারতসহ বহু দেশে Environmental Impact Assessment (EIA) সাধারণত প্রকল্পভিত্তিক।

অর্থাৎ—একটি বাঁধের EIA। একটি রাস্তার EIA। একটি খনির EIA। কিন্তু যদি একই নদী অববাহিকায় একশোটি প্রকল্প থাকে? প্রতিটি প্রকল্প হয়তো বলবে—

"আমার প্রভাব খুবই কম।" কিন্তু সব প্রকল্পের প্রভাব যোগ করলে কী হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।

এই কারণেই বিজ্ঞানীরা Cumulative Impact Assessment (CIA)-এর উপর জোর দেন।

বিশ্বের শিক্ষা

কানাডা:

বহু নদী অববাহিকায় এখন একাধিক প্রকল্পের সম্মিলিত প্রভাব বিশ্লেষণ করা বাধ্যতামূলক হয়েছে।

কারণ দেখা গেছে— একটি প্রকল্প নয়, বরং বহু ছোট প্রকল্প মিলেই বাস্তুতন্ত্রকে বড়ভাবে পরিবর্তন করতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন:

ইউরোপের জলনীতি এখন পুরো River Basin Management-এর উপর ভিত্তি করে। নদীকে একটি প্রশাসনিক সীমারেখা নয়, একটি পরিবেশগত একক হিসেবে দেখা হয়।

নরওয়ে:

জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ হওয়া সত্ত্বেও, অনেক নদীতে ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ (Environmental Flow) বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে নদীর নিজস্ব পরিবেশগত কার্যকারিতা নষ্ট না হয়।

উত্তর-পূর্ব ভারতের বাস্তবতা:

উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়নের প্রশ্নটি আরও জটিল।

কারণ এখানে রয়েছে—পৃথিবীর অন্যতম জীববৈচিত্র্য,

বহু আদিবাসী সমাজ, সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চল, ভারী বর্ষা, ভঙ্গুর পাহাড়, আন্তর্জাতিক নদী।

এখানে একটি প্রকল্পের সিদ্ধান্ত অনেক সময় শত শত কিলোমিটার দূরের মানুষকেও প্রভাবিত করতে পারে।

এই বাস্তবতায় উন্নয়নকে কেবল প্রকৌশল দিয়ে নয়,

বাস্তুবিদ্যা, ভূতত্ত্ব, জলবিজ্ঞান, জলবায়ুবিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞানের সমন্বয়ে দেখতে হবে।

উন্নয়নের আরেকটি অদৃশ্য ব্যয় বড় প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভ সাধারণত সহজে পরিমাপ করা যায়।

কিন্তু কীভাবে মাপা হবে—একটি হারিয়ে যাওয়া নদীর মাছ? একটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া জলাভূমি? একটি আদিবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক ক্ষতি? একটি বন হারানোর ফলে ভবিষ্যতের ভূমিধসের ঝুঁকি? এই প্রশ্নগুলির উত্তর অর্থনীতির প্রচলিত হিসাবের বাইরে।

তাই আজ বিশ্বজুড়ে Natural Capital Accounting এবং Inclusive Wealth-এর মতো ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে।

উন্নয়নের নতুন দর্শন এখন তাই উন্নয়ণ কেবল নির্মাণ নয়। উন্নয়ন মানে—নিরাপদ সমাজ, স্থিতিশীল বাস্তুতন্ত্র,

দুর্যোগ-সহনশীল অর্থনীতি, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ।

এই কারণেই আধুনিক উন্নয়নের একটি মৌলিক নীতি হলো—"First, do not transfer today's benefits into tomorrow's disasters."

অর্থাৎ—আজকের উন্নয়নের সুবিধা যেন আগামী দিনের পরিবেশগত বিপর্যয়ে পরিণত না হয়।

একজন পরিবেশকর্মী হিসেবে আমি কোনো সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা উন্নয়ন প্রকল্পের নীতিগত বিরোধী নই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি—

প্রতিটি প্রকল্পের আগে তিনটি প্রশ্ন করা উচিত।

প্রথমত, এটি কি সমগ্র নদী অববাহিকার উপর তার সম্মিলিত প্রভাব বিবেচনা করেছে?

দ্বিতীয়ত, এর পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর সর্বোত্তম বিকল্পগুলি কি সত্যিই খতিয়ে দেখা হয়েছে?

তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগোষ্ঠী—বিশেষত আদিবাসী ও নদীনির্ভর মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কি সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?

যদি এই তিনটি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না থাকে, তবে উন্নয়ন নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা দুর্বলতা নয়; বরং বৈজ্ঞানিক দায়িত্ব।

বিংশ শতাব্দীর উন্নয়ন ছিল প্রকল্পকেন্দ্রিক।

একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়ন হতে হবে বাস্তুতন্ত্রকেন্দ্রিক।

কারণ একটি নদী অববাহিকা কখনও একটি রাস্তা, একটি বাঁধ বা একটি খনির সমষ্টি নয়।

এটি একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি বন, প্রতিটি উপনদী এবং প্রতিটি জলাভূমি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

প্রকৃতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—আমরা প্রকল্প নির্মাণ করি, কিন্তু প্রকল্পগুলির সম্মিলিত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে সমগ্র নদী অববাহিকা।

পঞ্চম অধ্যায়

পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়নের (EIA) সংকট (কাগজের অনুমোদন থেকে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে):

"প্রকৃতিকে জিজ্ঞেস না করেই যদি উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে প্রকৃতি একদিন নিজের ভাষায় উত্তর দেবে। সেই উত্তর অনেক সময় বন্যা, ভূমিধস কিংবা খরার রূপে আসে।"

একটি সেতু নির্মাণের আগে প্রকৌশলীরা মাটির শক্তি পরীক্ষা করেন। একটি বহুতল ভবনের আগে ভিত্তি পরীক্ষা করা হয়। একটি ওষুধ বাজারে আনার আগে বহু বছর ধরে তার কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়।

তাহলে একটি বৃহৎ বাঁধ, একটি খনি, একটি মহাসড়ক কিংবা একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের আগে প্রকৃতি কতটা বদলে যাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা কি সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়? এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম Environmental Impact Assessment (EIA)-এর।

EIA-এর জন্ম। ১৯৬০-এর দশকে পৃথিবী বুঝতে শুরু করে যে উন্নয়নের পরিবেশগত মূল্য অনেক সময় অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে অনেক বড় হতে পারে।

আমেরিকায় ১৯৬৯ সালের National Environmental Policy Act (NEPA) প্রথমবারের মতো বড় সরকারি প্রকল্পের আগে পরিবেশগত মূল্যায়নকে বাধ্যতামূলক করে। পরবর্তীকালে এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে—কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, জাপান, ভারত, আফ্রিকা। আজ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই কোনো না কোনো ধরনের EIA ব্যবস্থা রয়েছে।

EIA-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?

অনেকেই মনে করেন,

EIA মানে প্রকল্পের অনুমতি পাওয়ার একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। আসলে বিষয়টি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

EIA-এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—

প্রকল্পটিকে আরও পরিবেশবান্ধব করা। এমনকি, প্রয়োজন হলে প্রশ্ন তোলা—এই প্রকল্পটি আদৌ হওয়া উচিত কি না? অর্থাৎ EIA-এর কাজ শুধু "অনুমোদন দেওয়া" নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করা। একজন ভালো EIA কী প্রশ্ন করে?

একটি প্রকৃত পরিবেশ মূল্যায়ন কেবল গাছ গুনে নয়।

এটি জিজ্ঞেস করে। এই প্রকল্পের ফলে নদীর প্রবাহ বদলাবে কি? মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি? ভূগর্ভস্থ জল কমবে কি? স্থানীয় জলবায়ু বদলাবে কি?

বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বন্ধ হবে কি? পাহাড়ের স্থিতিশীলতা কমবে কি? নদীতে পলি বাড়বে কি?

স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা বদলাবে কি? জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি নিরাপদ থাকবে কি?

কিন্তু সমস্যা কোথায়? বিশ্বজুড়ে বহু গবেষক দেখিয়েছেন যে অনেক ক্ষেত্রে EIA তার আদর্শ উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না। কিছু সাধারণ সমস্যা হলো—

১. প্রকল্পভিত্তিক চিন্তা যেখানে একটি বাঁধ, একটি রাস্তা, একটি খনির environment impact assessment করা। কিন্তু, একই অববাহিকায় যদি একশোটি প্রকল্প থাকে? তাদের সম্মিলিত প্রভাব কে দেখবে?

২. সীমিত সময়ের তথ্য

অনেক মূল্যায়ন এক বা দুই মৌসুমের তথ্যের উপর নির্ভর করে। কিন্তু প্রকৃতি বহু বছরের ছন্দে কাজ করে। একটি নদীকে বুঝতে অনেক দশকজুড়ে তথ্য প্রয়োজন।

৩. জলবায়ু পরিবর্তন

পঞ্চাশ বছর আগে যে বৃষ্টিপাত ছিল, আগামী পঞ্চাশ বছরেও কি তাই থাকবে? যদি না থাকে,

তাহলে পুরোনো তথ্যের উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কতটা নির্ভরযোগ্য?

৪. স্থানীয় জ্ঞানের অবমূল্যায়ন

একজন মিসিং কৃষক হয়তো জানেন, কোন চর দশ বছরে একবার ভাঙে। একজন আদি প্রবীণ জানেন,

কোন পাহাড় বর্ষায় সবচেয়ে বিপজ্জনক। এই অভিজ্ঞতাও তথ্য। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে তা মূল্যায়নের অংশ হয় না।

তাই আজ পৃথিবীর বহু দেশে একটি নতুন ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। Strategic Environmental Assessment (SEA)। এখানে একটি প্রকল্প নয়,

একটি সমগ্র অঞ্চলকে দেখা হয়। ধরা যাক—ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় আগামী ৩০ বছরে কতগুলো বাঁধ হবে, কত রাস্তা হবে, কোথায় খনি হবে, কোথায় বন থাকবে,

এসব একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা। এটাই SEA।

এটি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

ইউরোপ কী করেছে?

ইউরোপীয় ইউনিয়নের Water Framework Directive নদীকে রাজনৈতিক সীমারেখা দিয়ে ভাগ করেনি। তারা বলেছে, নদীকে তার অববাহিকা অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ, নদী ভোট দেয় না। নদী জেলা চেনে না। নদী রাজ্যের সীমান্ত মানে না।

ভারতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ, ভারত দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ। এটি একটি বাস্তবতা। একই সঙ্গে

ভারত পৃথিবীর অন্যতম জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ দেশ। এটিও বাস্তবতা। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে হিমালয়, পশ্চিমঘাট, সুন্দরবন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে। পরিকল্পনা আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

একজন পরিবেশকর্মীর চোখে EIA-কে উন্নয়নের শত্রু বলে দেখি না। বরং এটিকে উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে মনে করি।

যেমন—একটি বিমানের উড্ডয়নের আগে নিরাপত্তা পরীক্ষা করা হয়। একটি সেতুর আগে লোড টেস্ট করা হয়।তেমনি, একটি প্রকল্পের আগে পরিবেশগত মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এটি উন্নয়ন থামানোর জন্য নয়। উন্নয়নকে আরও নিরাপদ করার জন্য।

ভবিষ্যতের EIA কেমন হওয়া উচিত?

আমার মতে আগামী দিনের EIA-তে অন্তত আটটি বিষয় বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

১. নদী অববাহিকাভিত্তিক মূল্যায়ন।

২. Cumulative Impact Assessment।

৩. জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস অন্তর্ভুক্ত করা।

৪. দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ।

৫. স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা।

৬. আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ।

৭. প্রকল্প-পরবর্তী পরিবেশ নিরীক্ষা।

৮. সমস্ত তথ্যের সর্বজনীন স্বচ্ছতা।

EIA-এর সবচেয়ে বড় শক্তি তার আইন নয়।

তার সবচেয়ে বড় শক্তি তার দর্শন। সেই দর্শন হলো—

উন্নয়নের আগে প্রকৃতিকে জানা ও শোনা। যদি প্রকৃতির কণ্ঠস্বরকে কাগজের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে সিদ্ধান্ত হয়তো দ্রুত নেওয়া যাবে, কিন্তু তার মূল্য দিতে হতে পারে বহু প্রজন্মকে।

কারণ, প্রকৃতি কখনও ফাইল পড়ে না। সে কেবল আমাদের সিদ্ধান্তের ফল বহন করে এবং কখনও কখনও, সেই ফলের নাম হয়—ভূমিধস, নদীভাঙন অথবা বন্যা।

ষষ্ঠ অধ্যায়

বিশ্বের শিক্ষা: নদীর সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সহাবস্থান:

"বিশ শতক নদীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল; একবিংশ শতক শিখছে নদীর সঙ্গে বাঁচতে।"

দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর প্রায় সব দেশই বিশ্বাস করত, নদীকে শাসন করা সম্ভব। নদীকে বাঁধে আটকে রাখা, কংক্রিটের দেয়ালে বন্দি করা, তার গতিপথ বদলে দেওয়া, এসবকেই আধুনিক প্রকৌশলের সাফল্য হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু গত অর্ধশতাব্দীর অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে: নদীকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। নদী একটি জীবন্ত ব্যবস্থা; তাকে বোঝা যায়, তার সঙ্গে মানিয়ে চলা যায়, কিন্তু তাকে পুরোপুরি বশ করা যায় না।

এই উপলব্ধি থেকেই বিশ্বের নানা দেশে নদী ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দর্শনের জন্ম হয়েছে।

নেদারল্যান্ডস: নদীকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া

নেদারল্যান্ডসের এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। শতাব্দীর পর শতাব্দী তারা বাঁধ ও ডাইক নির্মাণ করে নদীকে আটকে রাখার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু ১৯৯৩ এবং ১৯৯৫ সালের বড় বন্যা তাদের ভাবতে বাধ্য করে। তারা বুঝতে পারে যে, প্রতিবার আরও উঁচু বাঁধ বানানোর বদলে নদীকে তার প্রাকৃতিক বিস্তারের জন্য আরও জায়গা দিতে হবে।

এই ধারণা থেকেই শুরু হয় Room for the River কর্মসূচি। এর অধীনে—

বাঁধ প্রকল্প পিছিয়ে নেওয়া হয়, পুরোনো বন্যাভূমি পুনরুদ্ধার করা হয়, নদীর শাখাপথ পুনরায় খোলা হয়, যেখানে সম্ভব সেখানে নদীকে স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এটি ছিল একটি বিপ্লবী পরিবর্তন। মানুষ প্রথমবার স্বীকার করল—সবসময় নদীকে ছোট করা নয়; কখনও কখনও নদীকে বড় হতে দেওয়াই নিরাপত্তার পথ।

মিসিসিপি: কংক্রিটের সীমাবদ্ধতা

যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রিত নদীগুলির একটি। বহু দশক ধরে সেখানে বাঁধ, লেভি ও কংক্রিটের তীররক্ষা নির্মিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৩ সালের মহাবন্যা দেখিয়ে দেয়, শুধু বাঁধের উপর নির্ভর করলে বিপদ আরও বাড়তে পারে।

এরপর নদীর প্রাকৃতিক বন্যাভূমি ফিরিয়ে দেওয়া, জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের কিছু অংশ পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রাইন নদী: আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদাহরণ

রাইন নদী ছয়টিরও বেশি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

একটি দেশের ভুল সিদ্ধান্ত অন্য দেশের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই ইউরোপের দেশগুলি নদীকে রাজনৈতিক সীমানা দিয়ে ভাগ না করে একটি যৌথ অববাহিকা হিসেবে পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেছে। এটি আমাদের শেখায়—

নদী প্রশাসনিক সীমানা মানে না; তাই নদী ব্যবস্থাপনাও সীমান্তের ঊর্ধ্বে ভাবতে হয়।

ইয়াংসি: বন ও বন্যার সম্পর্ক

১৯৯৮ সালে চীনের ইয়াংসি নদীতে ভয়াবহ বন্যার পর সরকার উপলব্ধি করে যে উজানের বন উজাড় বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এরপর শুরু হয় বিশাল বন পুনরুদ্ধার কর্মসূচি এবং সংবেদনশীল অঞ্চলে বন কাটার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, উজানের বন রক্ষা মানে ভাটির মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা।

নিউজিল্যান্ড: নদীর আইনি অধিকার

২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের Whanganui River-কে আইনের চোখে একটি "জীবন্ত সত্তা" হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল মাওরি জনগোষ্ঠীর শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস—

"আমি নদী, নদী আমিই।"

এটি কেবল একটি আইনি পরিবর্তন নয়; এটি মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখার একটি দৃষ্টান্ত।

কানাডা: আদিবাসী জ্ঞানের মর্যাদা

কানাডায় বহু নদী ব্যবস্থাপনায় এখন First Nations জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত পরিবেশজ্ঞানকে (Traditional Ecological Knowledge) বৈজ্ঞানিক তথ্যের পাশাপাশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ গবেষকরা বুঝেছেন, স্যাটেলাইট গত বিশ বছর দেখাতে পারে।

কিন্তু একটি আদিবাসী সমাজের স্মৃতি কখনও কখনও দুইশো বছরের নদী পরিবর্তনের ইতিহাস বহন করে।

আমাজন: বন কাটা মানে নদীর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকা পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাপক বন উজাড় কেবল জীববৈচিত্র্যই নয়, বৃষ্টির চক্র, নদীর প্রবাহ এবং আঞ্চলিক জলবায়ুকেও প্রভাবিত করতে পারে। এটি আমাদের শেখায়— বন কাটা মানে শুধু গাছ হারানো নয়; একটি নদীর ভবিষ্যৎও বদলে দেওয়া।

ব্রহ্মপুত্রের জন্য এই শিক্ষাগুলি কী বলে?

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাও একটি আন্তঃসীমান্ত, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল। বিশ্বের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত ছয়টি শিক্ষা স্পষ্ট—

* নদীকে কেবল বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

* প্রাকৃতিক বন্যাভূমি ও জলাভূমি সংরক্ষণ নিরাপত্তার অংশ।

* উজানের বন রক্ষা ভাটির দুর্যোগ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

* পরিকল্পনা নদী অববাহিকা ভিত্তিক হওয়া উচিত।

* স্থানীয় ও আদিবাসী জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে।

* উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করতে হবে।

একজন পরিবেশকর্মীর উপলব্ধি:

বিশ্বের এই উদাহরণগুলি দেখায় যে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নকে মুখোমুখি দাঁড় করানো একটি ভুল দ্বন্দ্ব।

প্রকৃত প্রশ্ন হলো—আমরা কী ধরনের উন্নয়ন চাই?

এমন উন্নয়ন, যা কয়েক দশক পরে আরও বড় দুর্যোগ ডেকে আনবে? নাকি এমন উন্নয়ন, যা নদী, বন, পাহাড় ও মানুষের সহাবস্থানকে শক্তিশালী করবে? বিশ্ব ধীরে ধীরে একটি গভীর সত্য উপলব্ধি করছে—নদীকে জয় করা যায় না। নদীকে সম্মান করা যায়। নদীকে বোঝা যায়। নদীর সঙ্গে সহাবস্থান করা যায়। ব্রহ্মপুত্রও আমাদের একই শিক্ষা দিচ্ছে। হয়তো উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে আরও উঁচু বাঁধ নির্মাণ নয়, বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ ও নদী একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়—সহযাত্রী।

সপ্তম অধ্যায়

নদীর বিশ্ববিদ্যালয়: মিসিং, আদি, আপাতানি ও উত্তর-পূর্ব ভারতের আদিবাসী সমাজের পরিবেশজ্ঞান।

"একটি বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে নদী সম্পর্কে শেখাতে পারে। কিন্তু একটি নদী আপনাকে জীবন সম্পর্কে শেখায়। আর সেই শিক্ষার সবচেয়ে প্রাচীন শিক্ষক হলেন নদীতীরের মানুষ।"

সভ্যতার ইতিহাসে একটি বড় ভুল ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করেছে যে, বিজ্ঞান যেন কেবল গবেষণাগারেই জন্মায়। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্বও একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সেখানে পাঠ্যপুস্তক নেই। পরীক্ষার খাতা নেই। ডিগ্রি নেই। আছে বর্ষার মেঘ।নদীর স্রোত। মাছের চলাচল। পাখির আগমন। বনের পরিবর্তন। ঋতুর ছন্দ। আর আছে এমন মানুষ, যারা শত শত বছর ধরে এই ভাষা পড়ে আসছেন।

উত্তর-পূর্ব ভারতের মিসিং, আদি, আপাতানি, কার্বি, বোড়ো, দিমাসা, ন্যিশি এবং আরও বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী এই নদীর বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ও শিক্ষক।

বিজ্ঞান কি শুধু গবেষণাগারে জন্মায়?

বিশ শতকের শেষভাগে পরিবেশবিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিতে পৌঁছায়। স্থানীয় মানুষের শতাব্দীপ্রাচীন অভিজ্ঞতা কেবল লোককথা নয়।

এগুলির অনেকগুলিই দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ পর্যবেক্ষণের ফল। এই কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে একটি নতুন ধারণা গুরুত্ব পায়—

Traditional Ecological Knowledge (TEK)।

এটি কোনো কুসংস্কার নয়। এটি বহু প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গড়ে ওঠা পরিবেশজ্ঞান। আজ IPBES (Intergovernmental Science-Policy Platform on Biodiversity and Ecosystem Services), IUCN, UNESCO এবং বহু আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এই জ্ঞানের গুরুত্ব স্বীকার করে।

মিসিং জনগোষ্ঠী: নদীর ভাষা পড়ার মানুষ

ব্রহ্মপুত্রের বন্যাকে মিসিং সমাজ কেবল দুর্যোগ হিসেবে দেখে না। তারা জানে যে, নদী ভাঙে আবার নদী গড়েও। চর জন্মায় আবার হারিয়েও যায়। এই পরিবর্তনই নদীর স্বাভাবিক জীবনচক্র।

তাদের ঐতিহ্যবাহী 'চাং ঘর' (উঁচু খুঁটির ওপর নির্মিত বাড়ি) কেবল স্থাপত্য নয়; এটি নদীর সঙ্গে সহাবস্থানের এক অসাধারণ উদাহরণ। বর্ষার জলকে অস্বীকার নয়, বরং তাকে স্থান দিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার এক জ্ঞান।

আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও আজ বলছে—সব জায়গায় বন্যাকে থামানো সম্ভব নয়; কোথাও কোথাও বন্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই অধিক টেকসই কৌশল।

assam brahmaputra - flood 8

আপাতানি: জলের প্রতিটি ফোঁটার মূল্য:

অরুণাচল প্রদেশের আপাতানি জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাহাড়ি ঢালে এমন কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যেখানে ধান চাষ ও মাছ চাষ একই ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। সেচ, জলধারণ এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার এই পদ্ধতি আজও পরিবেশবিদদের আগ্রহের বিষয়। এটি দেখায়—কম প্রযুক্তি মানেই কম জ্ঞান নয়।

আদি সমাজ: বন একটি আত্মীয়

আদি সমাজে বন কেবল কাঠের উৎস নয়। বন—

জলের উৎস, ঔষধের ভাণ্ডার, খাদ্যের উৎস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। যখন বনকে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখা হয়, তখন এই বহুমাত্রিক সম্পর্ক অদৃশ্য হয়ে যায়।

বিজ্ঞান ও লোকজ জ্ঞানের মিলন:

অনেক বছর ধরে বিজ্ঞান ও লোকজ জ্ঞানকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান এখন বলছে—এই দুই একে অপরের পরিপূরক। স্যাটেলাইট আমাদের গত ত্রিশ বছরের তথ্য দিতে পারে। কিন্তু একজন আশি বছরের মিসিং প্রবীণ হয়তো নদীর আশি বছরের পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেছেন। বিজ্ঞান সেই অভিজ্ঞতাকে যাচাই করতে পারে। অভিজ্ঞতা বিজ্ঞানকে নতুন প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে। এই মিলনের মধ্যেই ভবিষ্যতের পরিবেশনীতি। পৃথিবী কী শিখছে? কানাডায় First Nations জনগোষ্ঠীর জ্ঞান নদী ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর দর্শন নদীর আইনি স্বীকৃতিকে প্রভাবিত করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় বহু অঞ্চলে আদিবাসী আগুন ব্যবস্থাপনা (Cultural Burning) বন সংরক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলি দয়া বা সহানুভূতির উদাহরণ নয়। এগুলি বিজ্ঞানের পরিণত হওয়ার উদাহরণ। নদীকে কি শুধু প্রকৌশলী বুঝবেন? একটি নদীকে বুঝতে প্রয়োজন—ভূতত্ত্ববিদ, জলবিজ্ঞানী, বাস্তুবিদ, আবহাওয়াবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং সেই মানুষের, যিনি সারা জীবন নদীর তীরে বসবাস করেছেন। এই শেষ মানুষটির জ্ঞানকে বাদ দিলে নদীর গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

একজন পরিবেশকর্মীর উপলব্ধি

আমি বহুবার ভেবেছি—

কেন আমরা একটি বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা করার সময় আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতাকে ডাকি। কিন্তু নদীর তীরে বসবাসকারী বৃদ্ধ জেলেকে ডাকি না? কেন আমরা স্যাটেলাইট ছবিকে গুরুত্ব দিই, অথচ যে নারী প্রতিদিন নদী থেকে জল আনেন, তাঁর অভিজ্ঞতাকে তথ্য হিসেবে গণ্য করি না? এটি বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নয়। এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা। প্রকৃত বিজ্ঞান কখনও প্রশ্ন করতে ভয় পায় না। আর প্রকৃত গণতন্ত্র কখনও মানুষের অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করে না। ভবিষ্যতের উন্নয়নের সংলাপ তাই এমন হওয়া উচিত, যেখানে—গবেষক মানচিত্র নিয়ে আসবেন।

আদিবাসী মানুষ স্মৃতি নিয়ে আসবেন। প্রকৌশলী নকশা নিয়ে আসবেন। কৃষক ঋতুর অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবেন। সরকার নীতি নিয়ে আসবে। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ একটি নদী কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়। এটি একটি জীবন্ত উত্তরাধিকার। মিসিং জনগোষ্ঠীর কাছে নদী কেবল জল নয়। আপাতানিদের কাছে জল কেবল সম্পদ নয়।আদি সমাজের কাছে বন কেবল কাঠ নয়।

এই দর্শনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের এক গভীর সত্য—

মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়; মানুষ প্রকৃতির অংশ।

হয়তো একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নতুন কোনো যন্ত্র আবিষ্কার নয়।

বরং এই উপলব্ধি। প্রকৃতির বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও এমন অনেক শিক্ষক আছেন, যাদের নাম কোনো গবেষণাপত্রে লেখা নেই। কিন্তু তাঁদের জ্ঞান ছাড়া ভবিষ্যতের টেকসই উন্নয়নের পাঠ কখনও সম্পূর্ণ হবে না।

assam brahmaputra - flood 9

অষ্টম অধ্যায়

ব্রহ্মপুত্রের ভবিষ্যৎ:

(জলবায়ু পরিবর্তন, চরম বৃষ্টিপাত এবং নদী অববাহিকার নতুন চ্যালেঞ্জ)

"নদীর ভবিষ্যৎ কেবল তার তীরে লেখা থাকে না; লেখা থাকে পাহাড়ের বরফে, বনের পাতায়, মেঘের গতিপথে এবং মানুষের সিদ্ধান্তে।"

বিংশ শতাব্দীতে মানুষ নদীকে বুঝতে চেয়েছিল নদীর জলের পরিমাণ মেপে। একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান বুঝতে শিখেছে যে, নদীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু নদীতে নয়, বরং তার সমগ্র অববাহিকায়। আজ ব্রহ্মপুত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে চারটি বৃহৎ শক্তির উপর:—

পরিবর্তিত জলবায়ু,

হিমালয়ের ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতা,

ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন,

এবং উন্নয়নের নীতি।

এই চারটি শক্তি একসঙ্গে কাজ করে। তাই কোনো একটিকে আলাদা করে দেখলে ছবিটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

হিমালয়: পৃথিবীর তৃতীয় মেরু

বিজ্ঞানীরা হিমালয় ও তিব্বত মালভূমিকে প্রায়ই "Third Pole" বা "তৃতীয় মেরু" বলেন। কারণ, মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর সর্বাধিক বরফ ও হিমবাহ এই অঞ্চলে রয়েছে। এই হিমবাহগুলি কোটি কোটি মানুষের পানীয় জল, কৃষি এবং নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনেক হিমবাহ দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আগামীকালই ব্রহ্মপুত্র শুকিয়ে যাবে। বাস্তবতা আরও জটিল। কিছু অঞ্চলে বরফ গলার ফলে প্রথম দিকে নদীতে জল বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে, যদি হিমবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে।

যখন বৃষ্টি বদলে যায়:

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলির একটি হলো Extreme Rainfall—অল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাত। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে অনেক অঞ্চলে কম দিন বৃষ্টি হলেও, যখন বৃষ্টি হয় তখন তা অনেক বেশি তীব্র হতে পারে। এর অর্থ—একই নদী অববাহিকায় একাধিক উপনদী একই সময়ে ফুলে উঠতে পারে। পাহাড়ে ভূমিধস বাড়তে পারে। নদীতে পলি পরিবহন বেড়ে যেতে পারে। বন্যার প্রকৃতি আরও জটিল হতে পারে।

হিমালয়ের ভঙ্গুর ভূতত্ত্ব:

হিমালয় পৃথিবীর নবীনতম পর্বতমালাগুলির একটি।

এটি এখনও ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয়। ভারতীয় প্লেট এখনও ইউরেশীয় প্লেটের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে। ফলে—

ভূমিকম্প, ঢাল অস্থিতিশীলতা, ভূমিধস এই অঞ্চলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। যখন এই স্বাভাবিক ভঙ্গুরতার সঙ্গে যুক্ত হয়, অতিবৃষ্টি, বন উজাড়, অযথা ঢাল কাটার কাজ ও অপরিকল্পিত নির্মাণ,তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পকে এককভাবে দায়ী করতে হলে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে ভঙ্গুর পার্বত্য অঞ্চলে পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সম্মিলিত ঝুঁকি (cumulative risk) বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

ব্রহ্মপুত্রের পলি, অভিশাপ নয়, জীবনও অনেকেই পলিকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখেন। কিন্তু পলি ছাড়া ব্রহ্মপুত্রকে বোঝা যায় না। এই পলিই আসামের উর্বর কৃষিজমি তৈরি করেছে, চর সৃষ্টি করেছে, নদীতীরের বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলেছে। তবে যখন অস্বাভাবিক মাত্রায় পলি আসে, তখন নদীর গতিপথ বদলাতে পারে এবং কিছু অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত—পলিকে সম্পূর্ণ আটকানো নয়,বরং তার স্বাভাবিক গতিশীলতাকে বোঝা।

জলাভূমি ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক বীমা। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে জলাভূমির গুরুত্ব আরও বাড়ছে।

কারণ, একটি সুস্থ জলাভূমি বন্যার জল ধরে রাখে, ভূগর্ভস্থ জল পুনরায় ভরাট করে, কার্বন সঞ্চয় করে,

জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে।

অর্থাৎ একটি জলাভূমি একই সঙ্গে— দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জল ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজনের অংশ।

Nature-based Solutions: ভবিষ্যতের পথ

জাতিসংঘ, IUCN এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন Nature-based Solutions (NbS)-এর উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অর্থ—যেখানে সম্ভব, প্রকৃতির নিজস্ব প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে সমস্যা সমাধান।

উদাহরণস্বরূপ—নদীতীরে দেশীয় বন পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, বন্যাভূমি পুনরুদ্ধার, পাহাড়ে প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আচ্ছাদন রক্ষা, শহরে "স্পঞ্জ সিটি" ধারণা। এগুলি কেবল পরিবেশ সংরক্ষণ নয়;

এগুলি দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর কৌশলও।

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার জন্য একটি নতুন নীতির রূপরেখা

আমার মতে, আগামী দিনের পরিকল্পনায় অন্তত দশটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত—

১. সমগ্র নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা।

২. বন ও জলাভূমিকে জাতীয় অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি।

৩. Cumulative Impact Assessment বাধ্যতামূলক করা।

৪. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর Traditional Ecological Knowledge-কে নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করা।

৫. দীর্ঘমেয়াদি নদী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

৬. জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাবকে সব বড় প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা।

৭. নদীর প্রাকৃতিক বন্যাভূমি সংরক্ষণ।

৮. আন্তঃরাজ্য ও আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি।

৯. স্বচ্ছ পরিবেশগত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা।

১০. উন্নয়নের সাফল্যকে কেবল GDP নয়, বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের সূচক দিয়েও মূল্যায়ন করা।

একজন পরিবেশকর্মী হিসেবে বহু বছর ধরে আমি লক্ষ্য করেছি যে, আমরা নদীকে প্রায়ই "সমস্যা" হিসেবে দেখি। কিন্তু হয়তো প্রশ্নটি উল্টো হওয়া উচিত।

নদী কি সত্যিই সমস্যা? নাকি আমরা এমনভাবে ভূমি ব্যবহার করছি, এমনভাবে বন হারাচ্ছি, এমনভাবে বন্যাভূমি দখল করছি, এমনভাবে উন্নয়নের পরিকল্পনা করছি, যার ফলে নদীর স্বাভাবিক আচরণই আমাদের কাছে "দুর্যোগ" বলে মনে হচ্ছে? প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না। প্রকৃতি কেবল তার নিজস্ব নিয়ম মেনে চলে।

সেই নিয়মকে বুঝতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা।

ব্রহ্মপুত্রের ভবিষ্যৎ কোনো একক প্রকল্প, কোনো একক সরকার বা কোনো একক প্রজন্মের হাতে নয়।

এটি নির্ভর করছে আমরা উন্নয়নের ভাষা কতটা বদলাতে পারি তার উপর। যদি আমরা বনকে কেবল কাঠ, নদীকে কেবল জল, জলাভূমিকে কেবল অনাবাদি জমি এবং পাহাড়কে কেবল খনিজের ভাণ্ডার হিসেবে দেখি, তবে ভবিষ্যতের সংকট আরও গভীর হতে পারে। কিন্তু যদি আমরা বুঝতে পারি যে—

একটি বন বৃষ্টির স্মৃতি ধারণ করে, একটি জলাভূমি ভবিষ্যতের বন্যাকে নীরবে ধারণ করে, একটি পাহাড় একটি নদীর জন্ম দেয়, আর একটি নদী একটি সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখে। তবে হয়তো আমরা উন্নয়নের এমন এক নতুন ব্যাকরণ লিখতে পারব, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী।

নবম অধ্যায়

উন্নয়নের নতুন দর্শন: র‍্যাচেল কারসন থেকে অ্যালডো লিওপোল্ড, হারম্যান ড্যালি, এলিনর অস্ট্রম ও মাধব গ্যাডগিল, রামচন্দ্র গুহ এবং কপিল ভট্টাচাৰ্য

"সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কত দ্রুত প্রকৃতিকে জয় করতে পারি তার উপর নয়; বরং কত গভীরভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করতে শিখি তার উপর।"

১. উন্নয়নের প্রশ্নটি আবার করা দরকার

গত দুইশো বছর ধরে উন্নয়নের একটি প্রচলিত সংজ্ঞা আমাদের সামনে ছিল।

আরও বেশি উৎপাদন। আরও বেশি বিদ্যুৎ। আরও বেশি রাস্তা। আরও বেশি খনিজ। আরও বেশি জিডিপি। এই সূচকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো কি যথেষ্ট? যদি জিডিপি বাড়ে, কিন্তু নদী অসুস্থ হয়? যদি বিদ্যুৎ বাড়ে, কিন্তু বন হারিয়ে যায়? যদি শিল্প বাড়ে, কিন্তু জলাভূমি বিলুপ্ত হয়? তাহলে কি আমরা সত্যিই উন্নত হচ্ছি?

এই প্রশ্নটাই বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্বের বহু চিন্তাবিদকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

২. র‍্যাচেল কারসন: নীরব বসন্তের সতর্কবার্তা

১৯৬২ সালে Rachel Carson তাঁর বিখ্যাত বই Silent Spring প্রকাশ করেন। তিনি শুধু কীটনাশকের ক্ষতির কথা বলেননি। তিনি মানুষের অহংকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

তিনি লিখেছিলেন—মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়।

মানুষ প্রকৃতির একটি অংশ। যদি আমরা প্রকৃতির জাল ছিঁড়ে ফেলি, তবে শেষ পর্যন্ত সেই জালেই আমরাই আটকে যাব। আজ জলবায়ু পরিবর্তন,

জীববৈচিত্র্যের সংকট, নদীর অবক্ষয়—সবই কারসনের সেই সতর্কবার্তাকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

৩. অ্যালডো লিওপোল্ড: মানুষের সীমানা ছাড়িয়ে নৈতিকতা। আমেরিকান পরিবেশচিন্তক Aldo Leopold একটি যুগান্তকারী ধারণা দিয়েছিলেন—

Land Ethic। তিনি বলেছিলেন—নৈতিকতা শুধু মানুষের জন্য নয়। মাটি, নদী, বন, প্রাণী, সবাই নৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ। তাঁর বিখ্যাত ভাবনাটি ছিল—

"কোনো কাজ তখনই সঠিক, যখন তা জীবজগতের অখণ্ডতা, স্থিতিশীলতা এবং সৌন্দর্য রক্ষা করে।"

এই একটি বাক্যই আধুনিক পরিবেশনীতির অন্যতম ভিত্তি।

৪. হারম্যান ড্যালি: সীমাহীন বৃদ্ধি কি সম্ভব?

অর্থনীতিবিদ Herman Daly একটি সহজ কিন্তু গভীর প্রশ্ন করেছিলেন। সীমিত পৃথিবীতে অসীম অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কি সম্ভব? তিনি বলেছিলেন—

অর্থনীতি প্রকৃতির বাইরে নয়। অর্থনীতি প্রকৃতির ভেতরে অবস্থিত। প্রকৃতির সীমা অতিক্রম করে কোনো অর্থনীতি দীর্ঘদিন টিকতে পারে না। আজ "Green Economy", "Circular Economy", "Doughnut Economics"—সব ধারণার মধ্যেই ড্যালির চিন্তার প্রভাব রয়েছে।

৫. এলিনর অস্ট্রম: মানুষ কি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে পারে?

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ Elinor Ostrom প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। অনেকে ভাবতেন—

সাধারণ সম্পদ (Commons) মানুষ সবসময় ধ্বংস করে। অস্ট্রম দেখিয়েছিলেন যে, সবসময় তা নয়। যদি স্থানীয় সমাজকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদার করা হয়,

তাহলে মানুষ নিজের বন, নিজের জল, নিজের নদী,

নিজের চরের সবই টেকসইভাবে পরিচালনা করতে পারে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার জন্য এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৬. মাধব গ্যাডগিল: পরিবেশ শুধু জীববিজ্ঞান নয়।

ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিবেশবিজ্ঞানী মাধব গ্যাডগিল বহুবার বলেছেন—পরিবেশ সংরক্ষণকে কেবল বন দপ্তরের কাজ হিসেবে দেখলে হবে না।

এটি গণতন্ত্রেরও প্রশ্ন। স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। তাঁর পশ্চিমঘাট বিষয়ক গবেষণা দেখিয়েছে—যেখানে স্থানীয় সমাজকে সম্মান করা হয়েছে, সেখানে সংরক্ষণও বেশি সফল হয়েছে।

৭. রামচন্দ্র গুহ: পরিবেশ ও ন্যায়বিচার

ঐতিহাসিক Ramachandra Guha দেখিয়েছেন—

পরিবেশের প্রশ্ন কেবল গাছ বা প্রাণীর প্রশ্ন নয়।

এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন। কারণ, একটি বন ধ্বংস হলে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই মানুষ, যাঁদের জীবন সেই বনের উপর নির্ভরশীল। একটি নদী দূষিত হলে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নদীতীরের মানুষ। অর্থাৎ পরিবেশ সংরক্ষণ মানে সামাজিক ন্যায়ও।

৮. কপিল ভট্টাচার্য: নদীকে শুধু প্রাকৃতিক জলধারা নয়, বরং সমগ্র অববাহিকার সমস্যা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিলেন 

তিনি নদীর নাব্যতা, পলি জমা, বাঁধ ও ব্যারাজের প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ করে ফরাক্কা ব্যারাজের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ও কলকাতা‑হলদিয়া বন্দরের সংকট নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর কাজ আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষত যখন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা ও আসামের মতো অঞ্চলে অস্বাভাবিক বন্যা দেখা দেয়।

assam brahmaputra - flood 13

৯. ব্রহ্মপুত্র আমাদের কী শেখায়?

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা যেন এই সমস্ত দর্শনের একটি জীবন্ত পাঠশালা। এখানে—র‍্যাচেল কারসনের আন্তঃসম্পর্কের ধারণা, লিওপোল্ডের নৈতিকতা, ড্যালির সীমিত পৃথিবী, অস্ট্রমের স্থানীয় অংশগ্রহণ,

গ্যাডগিলের গণতান্ত্রিক পরিবেশনীতি—সব একসঙ্গে মিলিত হয়।

বেশ কয়েক বছর পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি একটি বিষয় বুঝেছি।

প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার নীরবতা। একটি বন প্রতিবাদ করে না। একটি নদী আদালতে যায় না একটি জলাভূমি সংবাদ সম্মেলন করে না। তারা শুধু ধীরে ধীরে বদলে যায়। তারপর একদিন মানুষ বুঝতে পারে—যে বন্যাকে সে "প্রাকৃতিক দুর্যোগ" বলছে,

তার অনেক কারণই মানুষের নিজের সিদ্ধান্তে লুকিয়ে ছিল।

এই উপলব্ধিই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—

একজন পরিবেশকর্মীর কাজ উন্নয়নের বিরোধিতা করা নয়। বরং উন্নয়নের স্মৃতিশক্তি বাড়ানো। যাতে আমরা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ভুলে না যাই।

১০. উন্নয়নের নতুন ব্যাকরণ

আমার কাছে ভবিষ্যতের উন্নয়নের ব্যাকরণ দশটি শব্দে লেখা যায়—সহাবস্থান, সংযম, বৈজ্ঞানিক সততা, স্বচ্ছতা, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা, স্থানীয় অংশগ্রহণ, জীববৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা, জলবায়ু-সহনশীলতা এবং প্রজন্মগত ন্যায়বিচার। যে উন্নয়ন এই দশটি নীতিকে ধারণ করবে, সেই উন্নয়নই সত্যিকার অর্থে টেকসই হবে।

আমরা প্রায়ই বলি—

মানুষ প্রকৃতিকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু হয়তো আরও বড় সত্য হলো—প্রকৃতি এখনও মানুষকে শিক্ষা দিয়ে চলেছে। প্রতিটি বন্যা, প্রতিটি নদীভাঙন, প্রতিটি বন, প্রতিটি পরিযায়ী পাখি—আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—সভ্যতা প্রকৃতির উপরে নির্মিত নয়; প্রকৃতির ভেতরে নির্মিত। সেই কারণেই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রযুক্তির নয়। এটি দর্শনের।

আমরা কি নিজেদেরকে পৃথিবীর মালিক ভাবব?

নাকি পৃথিবীর একজন দায়িত্বশীল সহযাত্রী?

এই একটি প্রশ্নের উত্তরই ব্রহ্মপুত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

দশম ও শেষ অধ্যায়: ব্রহ্মপুত্র ঘোষণা - একটি নীতিপত্র

একবিংশ শতাব্দীর নদী অববাহিকা-কেন্দ্রিক উন্নয়নের জন্য দশ দফা নীতিপত্র:

"নদী কোনো রাজ্যের নয়। নদী কোনো সরকারেরও নয়। নদী একটি জীবন্ত অববাহিকার স্পন্দন, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন, পাহাড়, জলাভূমি, প্রাণী, মানুষ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।"

ব্রহ্মপুত্র আমাদের শিখিয়েছে যে নদীকে কেবল একটি জলধারা হিসেবে দেখা যায় না। এটি একটি সমগ্র ব্যবস্থা—একটি জীবন্ত অববাহিকা। তাই ভবিষ্যতের উন্নয়নও প্রকল্পকেন্দ্রিক নয়, অববাহিকাকেন্দ্রিক হতে হবে। এই উপলব্ধি থেকেই আমরা একটি নীতিগত কাঠামো প্রস্তাব করতে পারি—"ব্রহ্মপুত্র ঘোষণা"।

১. নদী অববাহিকাকে পরিকল্পনার মূল একক হিসেবে স্বীকৃতি: উন্নয়নের পরিকল্পনা জেলা, রাজ্য বা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক নয়; বরং সমগ্র নদী অববাহিকার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কারণ নদী রাজনৈতিক সীমানা মানে না।

২. বন, জলাভূমি ও বন্যাভূমিকে "প্রাকৃতিক অবকাঠামো" হিসেবে স্বীকৃতি: যেমন রাস্তা ও সেতুর অর্থনৈতিক মূল্য আছে, তেমনি একটি বনও বন্যা কমায়, কার্বন ধরে রাখে, জল সংরক্ষণ করে, ভূমিধসের ঝুঁকি কমায়। অতএব, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৩. প্রতিটি বৃহৎ প্রকল্পে বাধ্যতামূলক Cumulative Impact Assessment: একটি বাঁধের প্রভাব আলাদা,

কিন্তু দশটি বাঁধ, পাঁচটি খনি এবং শত কিলোমিটার সড়কের সম্মিলিত প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। এই সম্মিলিত প্রভাব বিশ্লেষণ ছাড়া বড় প্রকল্পের সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ।

৪. পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়নে (EIA) পূর্ণ স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা: EIA যেন কেবল অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা না হয়। এর জন্য প্রয়োজন—স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, তথ্যের সর্বজনীন প্রকাশ, প্রকল্প-পরবর্তী পরিবেশ নিরীক্ষা, জনসাধারণের অর্থবহ অংশগ্রহণ।

৫. আদিবাসী ও স্থানীয় পরিবেশজ্ঞানকে নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করা: মিসিং, আদি, আপাতানি, বোড়ো, কার্বি, দিমাসা এবং অন্যান্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পরিবেশ পরিকল্পনার একটি মূল্যবান সম্পদ।

Traditional Ecological Knowledge-কে বৈজ্ঞানিক তথ্যের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

৬. জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রতিটি প্রকল্প পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনা: অতীতের আবহাওয়া আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়। তাই প্রতিটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চরম বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভূমি ধ্বসের ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদি জলপ্রবাহ, এসবের সম্ভাব্য পরিবর্তন বিবেচনা করতে হবে।

৭. নদীর জন্য ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিত করা: নদী শুধু মানুষের জন্য নয়। মাছ, ডলফিন, কচ্ছপ, জলচর পাখি এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের জন্যও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রয়োজন। পরিকল্পনার সময় এই প্রবাহ সংরক্ষণ একটি মৌলিক নীতি হওয়া উচিত।

৮. বিজ্ঞান ও নাগরিক সমাজের যৌথ পর্যবেক্ষণ: নদী পর্যবেক্ষণ কেবল সরকারি সংস্থার কাজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সম্প্রদায়, স্কুল-কলেজ, নাগরিক সমাজ—সবাই অংশীদার হতে পারে। এতে তথ্য আরও সমৃদ্ধ ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।

৯. উন্নয়নের সাফল্যের নতুন সূচক: কেবল GDP দিয়ে উন্নয়ন মাপা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত—নদীর স্বাস্থ্য, জলাভূমির অবস্থা, বন আচ্ছাদন, জীববৈচিত্র্য, নিরাপদ পানীয় জল, দুর্যোগ সহনশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার। উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব হবে।

১০. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব: প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের আগে একটি প্রশ্ন করা উচিত?

আজকের সিদ্ধান্ত কি আগামী পঞ্চাশ বছর পরও মানুষের এবং প্রকৃতির জন্য কল্যাণকর থাকবে?

যদি উত্তর অনিশ্চিত হয়, তবে আরও গবেষণা, আরও আলোচনা, আরও সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

assam brahmaputra - flood 1

শেষ কথা

একসময় মানুষ ভাবত—প্রকৃতিকে জয় করাই সভ্যতার লক্ষণ। আজ বিজ্ঞান আমাদের আরও বিনয়ী হতে শিখিয়েছে। প্রকৃতি কোনো শত্রু নয়, কোনো বাধাও নয়। সে আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কত বড় বাঁধ বানালাম তার উপর নয়, বরং আমরা কত বড় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারলাম তার উপর।

তাই "একটি নদীকে বাঁচানো মানে কেবল জল সংরক্ষণ নয়; একটি নদীকে বাঁচানো মানে মানুষের স্মৃতি, জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুকে একসঙ্গে রক্ষা করা। যে সভ্যতা এই সত্য বুঝবে, সেই সভ্যতাই টিকে থাকবে।"

Discussion 0 comments

No comments yet.

Be the first to join the discussion.

Our mission

We define ourselves as a “Mass Media of Resistance”

We seek to understand and analyze the Bahusaṅkaṭa (i.e., Polycrisis: a multidimensional crisis that doesn't have a straight forward solution) in which we all are immersed, along with the Bahuduḥkha (multiform suffering) of all sentient beings, through the lens of Madhyamāpratipada (the Middle Way in Buddhism which is our guiding force). And in collaboration with the broader Ecological Solidarity Movement and the Ecological Solidarity Alliance, we strive to bring the depth of these realities to the forefront of human consciousness.

Contact us

Email: thedegrowthofficial.com