নির্বাচন কমিশনে ফাটল: ভোটার তালিকা ঘিরে ১৪ আপত্তি, বাড়ছে প্রশ্ন, সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা
মতামত/বিশ্লেষণ

নির্বাচন কমিশনে ফাটল: ভোটার তালিকা ঘিরে ১৪ আপত্তি, বাড়ছে প্রশ্ন, সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা

এই নিবন্ধটি ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া এক গুরুতর সংকটের উপর আলোকপাত করে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দুই সহকর্মীর আপত্তি উপেক্ষা করে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে লক্ষ লক্ষ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের সামিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বেআইনিভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এই ঘটনাকে 'পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত' হিসেবে আখ্যা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনারের অভিশংসনের দাবি তুলেছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আলোচনা 0 মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

সবার আগে আলোচনায় যোগ দিন।

▣মতামত/বিশ্লেষণ

নির্বাচন কমিশনে ফাটল: ভোটার তালিকা ঘিরে ১৪ আপত্তি, বাড়ছে প্রশ্ন, সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা

সেপ্টেম্বরের এক মেঘলা সকাল। চায়ের দোকানে খবরের কাগজটা মেলতেই চক্ষু চড়কগাছ সাধারণ মানুষের। হেডলাইনে জ্বলজ্বল করছে একটি নাম— জ্ঞানেশ কুমার, ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তবে ভূতপূর্ব নির্বাচন কমিশনার শ্রী টি.এন. শেষন এর মত কোনো সুষ্ঠুনির্বাচনের প্রশংসায় নয়, বরং তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘স্যাবোটাজ’ বা অন্তর্ঘাতের অভিযোগ। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সাংবাদিক রীতিকা চোপড়ার একটি বিস্ফোরক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সারা দেশের রাজনৈতিক মহলে ভূমিকম্প এনে দিয়েছে। আর সেই ভূকম্পনের সবচেয়ে বড় উপকেন্দ্র হয়ে উঠেছে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ। ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন ফাটল ও প্রশাসনিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে জানানো হয়েছে যে কমিটির অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী গত ১০ মাসে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বহুবার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। ভোটার তালিকা সংশোধন, ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন এবং ডেটাবেস কেন্দ্রীয়করণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে।

ঘটনার সূত্রপাত দিল্লির নির্বাচন কমিশন ভবনের চার দেওয়ালের মধ্যে। কমিশন সাধারণত তিন সদস্যের টিম নিয়ে চলে— মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী। নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত হতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের বা সর্বসম্মত মতে। কিন্তু রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, গত ১০ মাসে বাকি দুই কমিশনার অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন নাম যোগ করা এবং ভোটার ডেটাবেসের কেন্দ্রীয় অ্যাক্সেস কুক্ষিগত করার মতো বিষয়ে সান্ধু এবং যোশীর আপত্তিকে পাত্তাই দেননি জ্ঞানেশ বাবু। চার-চারটি আপত্তি তো জমা পড়েছিল একই দিনে! এই ঘটনাকে বিরোধীরা বলছেন ‘পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত’ বা স্যাবোটাজ। গল্পের মতো শোনালেও, এটি ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) ভবনের অন্দরে ঘটে যাওয়া এক চরম বাস্তব টানাপোড়েনের খতিয়ান। যেখানে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।

ChatGPT Image Sep 30, 2026, 10_14_32 AM

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই রিপোর্টের প্রভাব পড়েছে ঠিক যেন বারুদে আগুনের মতো। তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলোর অভিযোগ, এই স্যাবোটাজের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছিল মূলত পশ্চিমবঙ্গকে মাথায় রেখেই। বাংলায় এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার নামে প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলার যে সমস্ত নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার সিংহভাগই গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র মানুষ, পরিযায়ী শ্রমিক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। নদীভাঙনে ঘর হারানো মানুষ কিংবা কাজের সূত্রে ভিন রাজ্যে থাকা শ্রমিকদের ‘অনুপস্থিত’ দেখিয়ে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে পদবি পরিবর্তন বা ঠিকানা বদল করতে গিয়ে তাঁদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে, এছাড়াও সমস্ত নথিপত্র দাখিল করার পরও বহু মানুষের নাম কোনো কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা আমজনতার মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছিল। নোটিশ এবং শুনানির নামে সাধারণ মানুষকে এতটাই ভয় দেখানো হয়েছে যে, আতঙ্কে এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমে বাংলায় ৭৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। সাধারণ গ্রামীণ মানুষ ভেবেছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানেই হয়তো তাঁদের নাগরিকত্ব চলে যাওয়া। এই মনস্তাত্ত্বিক ‘স্যাবোটাজ’ বাংলার সমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।

অনুসন্ধানী রিপোর্টে দেখা গেছে যে পশ্চিমবঙ্গের যে ৫টি প্রধান জেলায় (মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া ও মালদা) সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে, সেখানে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪৬.৮৩ লক্ষ। এটি রাজ্যজুড়ে মোট বাদ পড়া ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি। বিপরীতে, উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার বা বাঁকুড়ার মতো জেলাগুলোতে—যেখানে বিজেপির রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত—সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব বা নাম বাদ পড়ার হার ছিল তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। এই ভৌগোলিক তারতম্যই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা ‘স্যাবোটাজ’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অন্তর্ঘাতের অভিযোগকে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে আরও জোরালো করে তুলেছে।

এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে একটি প্রধান জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া এই পিটিশনটি মূলত ভোটারদের অধিকার এবং সাংবিধানিক নিয়ম লঙ্ঘনের উপর ভিত্তি করে তৈরি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী এই রিট পিটিশনটি দাখিল করেছেন। এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ব্রজেশ সিং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক আদালত অবমাননার (Criminal Contempt) প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে বিধিবদ্ধ অনুমতি চেয়েছিলেন।

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যে একাধিক জনস্বার্থ মামলা (PIL) ও রিট পিটিশন দায়ের হয়েছে, তার আইনি ভিত্তি অত্যন্ত জোরালো ও সুনির্দিষ্ট। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীসহ অন্যান্যদের দায়ের করা এই মামলার মূল আইনি পয়েন্টগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো: [1, 2, 3]

১. সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি লঙ্ঘন (Violation of Majority Decision-making)

● আইনি পয়েন্ট: পিটিশনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত তিন সদস্যের প্যানেলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়া বাধ্যতামূলক। ২০২৩ সালের আইন (Section 18) এবং ১৯৯৫ সালের ঐতিহাসিক টি. এন. সেশন বনাম ভারত সরকার (T.N. Seshan v. Union of India) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, নির্বাচন কমিশনের কাজ এককভাবে নয়, যৌথ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতিতে চলতে হবে। [1, 2]

● অভিযোগ: বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারের অন্তত ১৪টি লিখিত আপত্তি ও অসম্মতি (Dissent) অগ্রাহ্য করে জ্ঞানেশ কুমার একতরফাভাবে 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) সংক্রান্ত নির্দেশ ও সফটওয়্যার মডিফিকেশন লাগু করেছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক। [1, 2]

২. অপরাধমূলক দায়বদ্ধতা এবং ‘ব্যক্তিগত অনাক্রম্যতা’ (Criminal Immunity) না থাকা

● আইনি পয়েন্ট: পিটিশনে জোরালো যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, সংবিধানের ৩৬১ নম্বর অনুচ্ছেদ (Article 361) অনুযায়ী একমাত্র ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালরাই পদের দায়িত্বে থাকাকালীন ফৌজদারি বা অপরাধমূলক মামলা থেকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনাক্রম্যতা (Immunity) পান। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের চাকরির মেয়াদ সুরক্ষিত থাকলেও (Article 324), তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো ফৌজদারি অপরাধের দায় থেকে মুক্ত নন। [1]

● দাবি: সরকারি দায়িত্বে থেকে ভোটার তালিকায় জালিয়াতি, তথ্য গোপন বা কারচুপি করা কোনোভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক কর্তব্যের অংশ হতে পারে না। তাই জ্ঞানেশ কুমারকে একজন ‘সাধারণ অভিযুক্ত’ (Ordinary Accused) হিসেবে গণ্য করে পুলিশি তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং নিয়মিত ট্রায়াল বা ফৌজদারি আদালতের মুখোমুখি করা হোক। [1, 2]

৩. রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্ট (RP Act) লঙ্ঘন

● আইনি পয়েন্ট: ভোটার তালিকা সংশোধন ও ভোটারদের অধিকার সুরক্ষার জন্য ১৯৫০ ও ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act) রয়েছে।

● অভিযোগ: এই আইনের ৩২ নম্বর ধারা (Section 32) অনুযায়ী নির্বাচনী আধিকারিকদের সরকারি কর্তব্যে চরম গাফিলতি এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র অধীনে সরকারি নথিপত্র জালিয়াতি ও বিকৃত করার অভিযোগে জ্ঞানেশ কুমার, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মনীশ গর্গ এবং আইটি ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্নার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইনি পদক্ষেপ বা ‘ক্রিমিনাল প্রসিকিউশন’ দাবি করা হয়েছে। [1, 2, 3]

৪. সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা (Contempt of Court)

● আইনি পয়েন্ট: ১৯৮৪ সালের এ. সি. জোসে বনাম সিভান পিল্লাই (AC Jose v. Sivan Pillai) মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছিল যে, সংসদ বা আইনসভা যেখানে নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করে দিয়েছে, নির্বাচন কমিশন তার ‘প্লেনারি পাওয়ার’ (Article 324) ব্যবহার করে সেই বিধিবদ্ধ আইনকে টপকে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

● অভিযোগ: কমিশনের একতরফা নির্দেশে বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) দিয়ে ভোটারদের নাগরিকত্ব বা উপস্থিতির পরীক্ষা করানো এবং বিপুল পরিমাণ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের পুরনো নির্দেশাবলীর সরাসরি অবমাননা (Criminal Contempt)। [1, 2]

৫. এসআইটি (SIT) তদন্ত ও 'ফর্ম ৬' (Form 6) পুনর্বহাল

● আইনি পয়েন্ট: দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম (যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশাল অংশ রয়েছে) বাদ পড়ার ঘটনাটি এক নজিরবিহীন জনস্বার্থের ক্ষতি।

● দাবি: সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করে এই ব্যাপক ভোটার ছাঁটাইয়ের তদন্ত করা হোক। একই সাথে, একতরফা নেওয়া সমস্ত সিদ্ধান্তকে বাতিল ঘোষণা করে নতুন ভোটার নিবন্ধনের আসল 'ফর্ম ৬' (Form 6)-এর পুরনো নিয়ম ও ডেটাবেস পুনরায় বহাল করা হোক।

এই বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসতেই আসরে নেমেছে জাতীয় স্তরের ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোট। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী একে সাধারণ মানুষের ‘ভোট চুরি’ এবং সংবিধানের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহিতা’ (Treason) বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ইতিমধ্যেই দিল্লির সংসদ ভবনে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব যুদ্ধ শুরু হয়েছে:

● ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের নোটিশ: লোকসভা ও রাজ্যসভার প্রায় ১৯৩ জন বিরোধী সাংসদ জ্ঞানেশ কুমারকে তাঁর পদ থেকে অপসারণের জন্য ইমপিচমেন্ট মোশন বা অভিশংসনের নোটিশ এনেছেন।

● ভোট বাতিলের দাবি: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় দাবি তুলেছেন, জ্ঞানেশ কুমারের তত্ত্বাবধানে হওয়া নির্বাচন স্ক্র্যাপ বা বাতিল করতে হবে এবং পুরনো ভোটার তালিকা ফিরিয়ে এনে বাংলায় পুনরায় স্বচ্ছ ভোট করাতে হবে।

বিতর্কের ঝোড়ো হাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই অন্তর্ঘাত এর তত্ত্ব পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের একটি যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, তিন সদস্যের কমিশনের মধ্যে আলোচনার টেবিলে ভিন্ন মত বা নোট অব ডিসেন্ট (Dissent) আসতেই পারে, এটাই সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ। তবে ভোটার তালিকা সংশোধনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছিল।

অন্যপ্রান্তে, ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এই পুরো অভিযোগকে বিরোধীদের ‘পরাজয়ের অজুহাত’ বলে কটাক্ষ করেছে। রাজ্য বিজেপির নেতাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া একটি রুটিন প্রক্রিয়া। যদি কারচুপিই হতো, তবে বাংলায় শাসক দল এতগুলো আসনে জিতল কী করে? বিরোধীরা আসলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গায়ে কাদা ছিটিয়ে সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিতে চাইছে।

ভারতের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ এখনও পর্যন্ত এই নতুন পিটিশনগুলোর উপর কোনো আনুষ্ঠানিক অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ (Interim Order) বা পর্যবেক্ষণ দেয়নি। মামলাগুলি সবেমাত্র সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রি শাখায় নথিভুক্ত হয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হতে পারে।

তবে, এই নির্দিষ্ট স্যাবোটাজ বিতর্কের ঠিক আগের দিনগুলোতে এবং পূর্ববর্তী শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, যা এই আইনি লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে:

১. নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনকে 'বৃহত্তর বেঞ্চে' পাঠানো (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর রিপোর্টটি প্রকাশের দিনই (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬), সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চ ২০২৩ সালের বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনকে (যা থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়েছে) পুনর্বিবেচনার জন্য একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে (Constitution Bench) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। [1, 2]

● আদালতের পর্যবেক্ষণ: এই শুনানির সময় বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে মৌখিকভাবে প্রশ্ন তোলেন। আদালত পর্যবেক্ষণ দেয় যে, "নির্বাচন কমিশনকে কেবল স্বাধীন হলেই চলবে না, তাকে যেন দেখেও স্বাধীন মনে হয় (Election Commission must not only be independent but also appear to be independent)"। বর্তমান সিলেকশন কমিটির গঠন প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে আদালত প্রথম দর্শনেই (Prima Facie) সন্দেহ প্রকাশ করেছে। [1, 2]

২. ভোটার ছাঁটাই বা 'SIR' নিয়ে আদালতের আগের কড়া অবস্থান (মে ২০২৬)

এর আগে মে মাসে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অত্যন্ত কড়া পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল:

● আদালতের পর্যবেক্ষণ: বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, ভোটার তালিকায় যেকোনো পরিবর্তন আনার পেছনে অত্যন্ত মারাত্মক দেওয়ানি ফলাফল (Civil Consequences) লুকিয়ে থাকে, কারণ এর ফলে একজন নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হতে পারে।

● আদালত সতর্ক করে বলেছিল যে, নির্বাচন কমিশনের কোনো ক্ষমতাই "অবাধ বা লাগামহীন" (Untrammelled) হতে পারে না। সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কমিশনকে আইনি পরিধি, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকদের অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি

যেহেতু আইনজীবীরা অভিযোগ তুলেছেন যে জ্ঞানেশ কুমার সুপ্রিম কোর্টের পুরনো নির্দেশাবলী (আর্টিকেল ১৪১) অমান্য করে সহ-কমিশনারদের বাইপাস করেছেন, তাই সুপ্রিম কোর্ট আগামী সপ্তাহে এই মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ করলে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ থেকে বড় কোনো অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ বা কমিশনের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

দিল্লির অশোক রোডের নির্বাচন কমিশন অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর থেকে নেওয়া একতরফা সিদ্ধান্ত কীভাবে বাংলার প্রত্যন্ত সুন্দরবন বা উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে বিপন্ন করে তুলতে পারে, এই বিতর্ক তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা এই স্যাবোটাজের অভিযোগ সত্যি নাকি কেবলই রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি, তা হয়তো সুপ্রিম কোর্টের আইনি তদন্তেই স্পষ্ট হবে। তবে এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে মস্ত বড় একটা প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়ে গেল, তা সহজে মোছা কঠিন।

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মিত 

তথ্যসূত্র:

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (The Indian Express): সমগ্র ঘটনার সূত্রপাত এই জাতীয় সংবাদমাধ্যমের বিস্ফোরক এক্সক্লুসিভ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর দেওয়া ১৪টি আপত্তি এবং 'ফর্ম ৬'-এর পরিবর্তন নিয়ে মূল তথ্যটি তারাই প্রথম সামনে আনে। বিস্তারিত জানার জন্য The Indian Express Exclusive Report দেখতে পারেন।

দ্য হিন্দু (The Hindu): ২৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর দায়ের করা মূল জনস্বার্থ মামলা (PIL) এবং ২৪ সেপ্টেম্বর অ্যাডভোকেট ব্রজেশ সিং কর্তৃক ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে ফৌজদারি আদালত অবমাননার অনুমতির আবেদন সংক্রান্ত আইনি খবরের সত্যতা মেলে এখানে। এর আইনি ধারা ও অনাক্রম্যতার পয়েন্টগুলো পড়তে পারেন The Hindu Law Report-এ।

এনডিটিভি ও দ্য প্রিন্ট (NDTV & The Print): সুপ্রিম কোর্টে জ্ঞানেশ কুমার ও অন্যান্য নির্বাচন আধিকারিকদের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের (RP Act) ৩২ নম্বর ধারা এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) অনুযায়ী ফৌজদারি মামলার আবেদনের খবরটি এই মাধ্যমগুলোতে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে NDTV National News ফলো করতে পারেন।

দ্য কুইন্ট (The Quint): ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) ফলে পশ্চিমবঙ্গের নির্দিষ্ট জেলাগুলোতে (বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা) যে ব্যাপক হারে নাম বাদ পড়েছে, তার রাজনৈতিক ও জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের জন্য The Quint Election Analysis সাহায্য করেছে।

আলোচনা 0 মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

সবার আগে আলোচনায় যোগ দিন।

আমাদের লক্ষ্য

আমরা নিজেদেরকে “প্রতিরোধের গণমাধ্যম” হিসেবে দেখি।

জীবের বহুসংকটকে, জীবের বহুদুঃখকে আমরা মধ্যমপ্রতিপদের অবস্থান থেকে বোঝার চেষ্টা করি, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি, এবং বৃহত্তর বাস্তুতান্ত্রিক সংহতি আন্দোলন ও বাস্তুতান্ত্রিক সংহতি জোটের সাথে হাত মিলিয়ে তাকে মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি।

যোগাযোগ করুন

ইমেল: thedegrowthofficial.com