
ধর্মের নামে আগ্রাসনের আশঙ্কা: SRFTI থেকে গোটা বাংলার প্রশ্ন
সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা অভিযোগ, পাল্টা-অভিযোগ এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। ছাত্রদের একাংশের অভিযোগ, একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বহিরাগতদের উপস্থিতি এবং পরবর্তী সংঘর্ষে তাঁরা আক্রান্ত হন। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে আবার ছাত্রদের বিরুদ্ধেই অনুষ্ঠান ব্যাহত করা এবং হামলার অভিযোগ করা হয়েছে। অতএব, ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হওয়া জরুরি।
কিন্তু এই নির্দিষ্ট ঘটনার সত্যতা নির্ধারণের অপেক্ষাতেও একটি বৃহত্তর প্রশ্ন আমাদের ভাবিয়ে তুলতে পারে। প্রশ্নটি হল- বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাতের পরিসর কি ক্রমশ বাড়ছে? এবং সেই সঙ্গে কি এমন কিছু প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে, যেগুলিকে অনেকে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির লক্ষণ হিসেবে দেখতে উদ্বিগ্ন?
এই প্রশ্ন তোলা মানেই কোনও নির্দিষ্ট সংগঠন বা ব্যক্তিকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়া নয়। বরং প্রশ্ন হল, ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা, ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি করে তোলা, ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীন পরিসরে শক্তির প্রদর্শন -এই প্রবণতাগুলি যদি কোথাও দেখা দেয়, তাহলে তার গণতান্ত্রিক পরিণতি কী হতে পারে?
SRFTI-র ঘটনাটি এই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ।
সত্যজিৎ রায়ের নামাঙ্কিত এই প্রতিষ্ঠান কেবল চলচ্চিত্র শিক্ষার একটি কেন্দ্র নয়; এটি স্বাধীন চিন্তা, শিল্পীসত্তা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রশ্ন করার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। এমন একটি জায়গায় কোনও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে তাহলে শিক্ষাঙ্গন কি তার মুক্ত ও বহুত্ববাদী চরিত্র বজায় রাখতে পারছে?
এখানে অবশ্যই একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মত প্রকাশ করা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা কিংবা কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এসব অপরাধ নয়। একইভাবে কোনও অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি জানানো বা প্রতিবাদ করাও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। কিন্তু প্রতিবাদের প্রতিরোধ যদি সহিংসতায় পরিণত হয়, যদি শক্তির মাধ্যমে প্রতিবাদীদের চুপ করিয়ে দিতে চায়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়।
SRFTI-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনায় তাই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ এবং দোষী প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করা উচিত নয়।
কিন্তু SRFTI-র বাইরে তাকালেও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রার্থনাসভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত উপাসনার ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে বাধা বা হামলার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিছু খ্রিস্টান সংগঠন এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা নিয়ে নিজেদের পরিসংখ্যানও প্রকাশ করেছে।
তবে এই অভিযোগগুলির প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি এক নয়। কোথাও ধর্মান্তরণের অভিযোগ রয়েছে, কোথাও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে বিরোধ, কোথাও স্থানীয় বিবাদ, আবার কোথাও সরাসরি হামলার অভিযোগ। কোনও ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটিও আলাদা প্রশ্ন। ফলে সমস্ত ঘটনাকে এক সূত্রে গেঁথে একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও যথাযথ নয়। কিন্তু অভিযোগগুলি বারবার সামনে আসছে সেই বিষয়টিও উপেক্ষা করার মতো নয়।
বিশেষত যখন কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ঘিরে ‘জোর করে ধর্মান্তরণ’-এর মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন তার তদন্ত হওয়া উচিত। যদি সত্যিই বেআইনি ধর্মান্তরণের চেষ্টা হয়ে থাকে, আইন তার নিজস্ব পথে ব্যবস্থা নেবে। আর যদি অভিযোগটি ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয় এবং সেই অভিযোগকে অজুহাত করে কোনও প্রার্থনাসভা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলা হয়ে থাকে, সেটিও সমানভাবে তদন্ত হওয়া দরকার।

অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের অধিকার কোন স্বঘোষিত রাষ্ট্রবাদী নীতি পুলিশের নয়, আইন ও তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের। কারণ ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হলে গুজব অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। একটি অভিযোগ মুহূর্তের মধ্যে ‘প্রমাণিত সত্য’-তে পরিণত হয়, সামাজিক মাধ্যমে তার সঙ্গে নতুন নতুন গল্প যুক্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি জনমত তৈরি হতে পারে যেখানে তদন্তের আর কোনও গুরুত্ব থাকে না। গণতন্ত্রের জন্য এই পরিস্থিতি বিপজ্জনক।
কারও ধর্মান্তরণের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। কারও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। কারও উপর হামলার অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই ধর্মীয় পরিচয় যেন আইনের বিকল্প না হয়ে ওঠে। আর এখানেই আসে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির প্রশ্ন।
ফ্যাসিবাদকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নাম বা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেখলে বর্তমান সময়ের কিছু বিপজ্জনক প্রবণতা বোঝা কঠিন হতে পারে। রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোচনায় কর্তৃত্ববাদ, চরম জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ, বহুত্ববাদের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে নির্মাণ -এসবকে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় গুলি আলোচনায় বাইরে রাখার মানে হয় না।
তাই প্রশ্নটি হলো - আমাদের সমাজে কি এমন প্রবণতা বাড়ছে, যেখানে মানুষের নাগরিক পরিচয়ের আগে তার ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে আনা হচ্ছে? যদি কোনও ছাত্রকে তার মতের কারণে ‘দেশদ্রোহী’ বলে চিহ্নিত করা হয়, যদি কোনও শিল্পীকে তার বক্তব্যের কারণে ধর্মীয় শত্রু হিসেবে দেখানো হয়, যদি কোনও নাগরিকের উপাসনার অধিকার নিয়ে খাপ পঞ্চায়েত বসে, কিংবা যদি কোনও প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বিচার করা হয়, তাহলে প্রত্যেকটি ঘটনাই গণতান্ত্রিক পরিসর নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তবে এই প্রশ্ন তুলতে গিয়ে আমাদের আরও একটি সতর্কতা প্রয়োজন। কোনও একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে অভিযুক্ত করা ঠিক হবে না। কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে একই আচরণের জন্য দায়ী করা যাবে না। যেমন কোনও সংগঠনের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই সংগঠনের প্রতিটি সদস্য অপরাধী হয়ে যান না। ব্যক্তি ও সংগঠনের মতাদর্শগত অবস্থান যদিও ভীষণ ভাবে গুরুত্বপুর্ণ এক্ষেত্রে।
বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস বহুত্বের ইতিহাস। এই ভূখণ্ডে মন্দিরের পাশাপাশি মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বার, বৌদ্ধ বিহার এবং নানা লোকধর্মের সহাবস্থান রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, নজরুলের সাম্যের আহ্বান, লালনের প্রশ্নমুখর দর্শন, নাস্তিকতা, বৌদ্ধ ভাবনা, বাউল সংস্কৃতি এবং বাংলার শিল্প-সাহিত্য, সব মিলিয়ে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় কোনও একক ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। আর এই বহুত্বকে রক্ষা করার অর্থ কোনও ধর্মের বিরোধিতা করা নয়। বরং এর অর্থ হল- প্রত্যেক মানুষ যেন নিজের ধর্ম পালন করতে পারেন, আবার ধর্ম পালন না করার অধিকারও রাখেন; প্রত্যেকে যেন নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশ করতে পারেন; এবং কোনও মতের সঙ্গে একমত না হলেও অন্যের নাগরিক অধিকারকে স্বীকার করেন।
SRFTI-র ঘটনা সেই বৃহত্তর আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ। ঘটনার প্রকৃত দায় কার, তা তদন্তেই নির্ধারিত হোক। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে শিক্ষাঙ্গনকে যদি রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র বানানো হয়, সংস্কৃতিকে যদি আনুগত্যের পরীক্ষায় বসানো হয় এবং ধর্মীয় পরিচয়কে যদি নাগরিক অধিকারের উপরে স্থান দেওয়া হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাই আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত অত্যন্ত পরিষ্কার, কিন্তু একই সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত।
কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই ধর্মকে ঘৃণার অস্ত্র কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার হতে দেওয়া উচিত নয়। ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ কোনও পাল্টা ঘৃণা নয়। তার প্রতিরোধ হল গণতন্ত্র, যুক্তি, আইনের শাসন, শান্তি, বহুত্ববাদ এবং মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান।

সত্যজিৎ রায়ের উত্তরাধিকারও আমাদের সেই প্রশ্ন করার সাহসই শেখায়—অন্ধ আনুগত্য নয়, পর্যবেক্ষণ; গুজব নয়, সত্যের অনুসন্ধান; ঘৃণা নয়, মানুষকে বোঝার চেষ্টা। আজ বাংলার সামনে তাই প্রশ্নটি ধর্ম বনাম ধর্মের নয়। প্রশ্নটি হল আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে মানুষ তার পরিচয়ের জন্য ভয় পাবে, নাকি এমন একটি সমাজ যেখানে প্রত্যেকে নিজের পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনও এক রাজনৈতিক দল, কোনও এক ধর্ম কিংবা কোনও এক সংগঠনের হাতে নেই। উত্তরটি আমাদের সম্মিলিত নাগরিক আচরণের মধ্যেই তৈরি হবে।




Be the first to join the discussion.