আমরা বহুদিন ধরে যে কথা আসছি, আজ তা আর কোনও দূরবর্তী ভবিষ্যতের কল্পকথা নয়। সমুদ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে স্থলের দিকে। কলকাতা কিংবা মুম্বাই শুধু নয়—ভারতের দীর্ঘ উপকূলরেখা জুড়ে এক গভীর বাস্তুতান্ত্রিক সংকট তৈরি হচ্ছে। আর এই সংকটকে শুধুমাত্র “জলবায়ু পরিবর্তন” বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের তথাকথিত উন্নয়নের মডেল, নদী-খাল-জলাভূমি ধ্বংস, নির্বিচার নগরায়ণ, পাহাড়-জঙ্গল কাটা, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের দখল এবং মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনীতি। যা এক কথায় ‘বহুসংকট’-এ নিমজ্জিত এই আপৎকালীন পরিস্থিতি।

বাস্তুতান্ত্রিক সংহতি আন্দোলনের ইস্তাহারে আমরা এই বিপদের কথা স্পষ্ট করে বলেছি। কারণ পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের সংকটকে আমরা বিচ্ছিন্ন কোনও সমস্যা হিসেবে দেখি না। নদী, সমুদ্র, বন, পাহাড়-পর্বত, মাটি, জলাভূমি, কৃষিজমি, এককোষী থেকে পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ সহ মানুষের জীবন, ইত্যাদি—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। [সমুদ্রে জলস্তর বাড়ছে। ভারতের তটরেখা গুজরাট থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত (প্রায় ৭৫০০ কিলোমিটার)। “জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্ত:সরকারি প্যানেল” (IPCC) বলছে সমুদ্র অচিরেই উপকূলীয় সমভূমি গ্রাস করবে। “ক্লাইমেট সেন্ট্রাল” কম্পিউটার মডেলিং করে বছর ধরে ধরে বিপর্যয়ের মানচিত্র প্রকাশ করে দিয়েছে। সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যাবে এতদঞ্চলের চাষবাস। মানুষ হারাবে তাদের জীবনে ও জীবিকা। সুরাট, মুম্বাই, ম্যাঙ্গালোর, কচি, তিরুবন্তপুরম, চেন্নাই, বিশাখাপত্তনম ও কলকাতা সহ আরো বহু ছোট বড় শহর অবসম্ভাবিভাবে জলের তলায় তলিয়ে যাবে। ডুবে যাবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। ডুবে যাবে লাক্ষাদ্বীপ। উদ্বাস্তু হবে অন্তত ২০ কোটি মানুষ। - বাস্তুতান্ত্রিক সংকট ১, পৃষ্ঠা -১১, ইস্তাহার, বাস্তুতান্ত্রিক সংহতি আন্দোলন।]
আজ কলকাতার দিকে তাকালেই সেই সম্পর্কটি বোঝা যায়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার বিশাল বদ্বীপ অঞ্চল স্বভাবতই নিম্নভূমি। একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, অন্যদিকে কোথাও কোথাও ভূমি বসে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব স্থানীয়ভাবে আরও তীব্র হতে পারে। ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান INCOIS-ও উপকূলীয় ঝুঁকি মূল্যায়নে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, উপকূলের ঢাল, ভূমির উচ্চতা, তটরেখার পরিবর্তন, জোয়ার ও ঢেউয়ের মতো একাধিক বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছে।
মুম্বাইয়ের ক্ষেত্রেও একই বিপদের অন্য রূপ দেখা যায়। শহরটির এক বড় অংশ সমুদ্রের খুব কাছাকাছি এবং নিম্নভূমিতে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে যখন অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘটনা একসঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বিপদের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। IPCC-র রিপোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছে, উপকূলীয় শহরগুলিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রবল বৃষ্টিপাত ও নদীর জলপ্রবাহের সম্মিলিত ঘটনা বন্যার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে।
তবে প্রশ্নটি শুধু কলকাতা বা মুম্বাইয়ের নয়। গুজরাটের উপকূল, মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ সমুদ্রতীর, গোয়া, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গ—প্রতিটি উপকূলীয় অঞ্চল নিজস্ব ভৌগোলিক বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের মুখোমুখি। কোথাও প্রধান বিপদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, কোথাও উপকূল ক্ষয়, কোথাও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, আবার কোথাও নদীর বদলে যাওয়া গতিপথ, নদীবাহিত পলির অপ্রতুলতা এবং জলাভূমি ধ্বংস পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
IPCC-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নিম্নভূমির উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে ঝুঁকি ইতিমধ্যেই বাড়ছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিম্নভূমির শহর ও বসতিতে উপকূলীয় জলবায়ু- ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় প্লাবন ও ক্ষয় আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কয়েক দশকে কয়েক মিটার বেড়ে গিয়ে রাতারাতি শহরকে গিলে ফেলবে বিষয়টি ঠিক এমন নয়। বিপদটি আরও ধীর, কিন্তু আরও নিষ্ঠুর। প্রথমে বাড়বে ভাঙন। তারপর উচ্চ জোয়ারের সময় জল ঢোকার ঘটনা বাড়বে। ঝড়ের সময় জলোচ্ছ্বাস আরও ভিতরে ঢুকবে (গত কয়েকদিনে কলকাতার দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে যায় আমাদের)। ভূগর্ভস্থ জল ও মাটিতে লবণাক্ততা বাড়বে। কৃষিজমি অনুর্বর হবে। পানীয় জলের সংকট তৈরি হবে। রাস্তা, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চল ও বসতিতে বারবার ক্ষতি হবে। শেষ পর্যন্ত বহু মানুষকে তাদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হতে হবে। নতুন করে উদ্বাস্তু হতে হবে।
অর্থাৎ “ডুবে যাওয়া” মানে শুধু বাড়ির ছাদ পর্যন্ত জল উঠে যাওয়া নয়। একটি অঞ্চল তার বসবাসযোগ্যতা হারাতেও পারে। আর এখানেই জলবায়ু সংকটের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নটি যুক্ত হয়।
সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়লে প্রথমে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন উপকূলের মৎস্যজীবী, কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ভূমিহীন মানুষ। যাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য কম, তাদের পক্ষে অন্যত্র চলে যাওয়া বা নতুন করে বাড়ি তৈরি করা সবচেয়ে কঠিন। অথচ জলবায়ু সংকট তৈরিতে তাদের অবদান সবচেয়ে কম। অন্যদিকে বড় শহরগুলি এখনও সমুদ্রের ধারে আরও নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। জলাভূমি ভরাট হচ্ছে, ম্যানগ্রোভ কাটা হচ্ছে, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হচ্ছে, উপকূলীয় অঞ্চলকে কংক্রিটে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রকৃতিকে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের জন্য কৃত্রিম নিরাপত্তা তৈরি করতে চাইছি। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মকে অস্বীকার করে কোনও স্থায়ী নিরাপত্তা তৈরি করা যায় না। সুন্দরবনের দিকে তাকালেই এই সত্য আরও পরিষ্কার হয়। ম্যানগ্রোভ শুধু গাছ নয়; এটি সমুদ্র ও স্থলের মাঝখানে একটি জীবন্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু সেই বাস্তুতন্ত্রকে লোভ ও মুনাফার জন্য ধ্বংস করা হলে, তাকে দুর্বল করে দেওয়া হলে - ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা এবং ভূমিক্ষয়ের অভিঘাত আরও বাড়ে।
তাই আমাদের দাবি শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়। শুধু কংক্রিটের দেওয়াল তুলে সমুদ্রকে আটকে রাখা নয়। তাই আমাদের সমস্যা কেন্দ্রিক সমাধানের পথ পরিত্যাগ করে ‘দুঃখ সত্য’ -কে মেনে নিয়ে ‘দুঃখ নিরসন’র পথে হাঁটতে হবে। অস্বীকার করতেই হবে ভ্রান্ত উন্নয়নের দর্শনকে।
নদীকে নদীর মতো বাঁচতে দিতে হবে। জলাভূমি রক্ষা করতে হবে। ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় বন পুনরুদ্ধার করতে হবে। উপকূলের অতি-নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন শিল্প ও আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার আগে বাস্তুতান্ত্রিক বহনক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। উপকূলের মানুষের অধিকারকে উন্নয়নের নামে বিসর্জন দেওয়া চলবে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের উন্নয়নের সংজ্ঞাটাই বদলাতে হবে। যে উন্নয়ন নদী মারে, জলাভূমি ভরাট করে, বন ধ্বংস করে, সমুদ্রের তীর দখল করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিজের ঘর থেকে উচ্ছেদ করে- সেটি উন্নয়ন নয়। সেটি ভবিষ্যৎ ধ্বংসের অন্য নাম।

বাস্তুতান্ত্রিক সংহতি আন্দোলন তাই আজ শুধু সতর্ক করছে না, প্রশ্ন তুলছে। আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে যে এই ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির আঙিনায় দাঁড়িয়ে ধ্বংসকে বিলম্বিত করার লক্ষ্যে আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন ভারত রেখে যেতে চাই আমরা? একটি কংক্রিটের ভারত, যেখানে সমুদ্রের সামনে উঁচু প্রাচীর তুলে কিছু মানুষকে নিরাপদ রাখা হবে, আর লক্ষ লক্ষ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে? নাকি এমন একটি ভারত, যেখানে নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে পাবে, উপকূলীয় বন বেঁচে থাকবে, জলাভূমি রক্ষা পাবে, কৃষিজমি ও মৎস্যজীবীদের জীবিকা সুরক্ষিত হবে এবং প্রকৃতিকে জয় করার বদলে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নেওয়া হবে?
সমুদ্র আমাদের শত্রু নয়। সমুদ্র তার নিজের জায়গায় আছে। বিপদ তৈরি করেছি আমরাই—উষ্ণায়ন বাড়িয়ে, উপকূল দখল করে, নদী-জলাভূমি ধ্বংস করে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে।
তাই আজকের সতর্কবার্তা কোনও শহরকে নিয়ে নয়। এটি সমগ্র ভারতের উপকূলকে নিয়ে। কলকাতা ডুববে কি না - এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হল, আমরা কি আরো দ্রুত কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, কোচি, পুরী, সুন্দরবন কিংবা ভারতের অসংখ্য উপকূলীয় গ্রামকে ক্রমশ বসবাসের অযোগ্য করে তুলব?




Be the first to join the discussion.