ভারত কেবল প্রকৃতির রোষানলে বিপর্যস্ত নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে তার উপরে চাপিয়ে দেওয়া একের পর এক সিদ্ধান্তের মিলিত পরিণতি ভোগ করছে দেশ - এমন সব সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব নীতি-নির্ধারকরা কখনো ভেবে দেখেননি।

ভারতীয় উপমহাদেশে আকাশের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে ৩,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ঝোড়ো মেঘের যে আস্তরণ তৈরি হয়েছে, তা কেবল আবহাওয়াবিজ্ঞান সংক্রান্ত কোনো কৌতূহল নয়। এটি একটি সামগ্রিক জলবায়ু ব্যবস্থার পরিবর্তনের একটি হিসাব-নিকাশ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি। এই সিদ্ধান্তগুলোকে 'উন্নয়ন' বা 'বিকাশ' হিসেবে নথিবদ্ধ করা হয়েছিল, অথচ এর জন্য প্রকৃত মূল্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের ওপর, যাদের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ভূমিকাই ছিল না।
এই মে মাসে, দক্ষিণ-পশ্চিমের কেরালা থেকে উত্তর-পূর্বের অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত, মেঘের একটি বলয় বিস্তৃত ছিল। এটি কেবল সাধারণ মাত্রার চেয়ে বড় কোনো মৌসুমী ঝড় ছিল না। এটি ছিল গঠনগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা: একাধিক বজ্রগর্ভ মেঘমালা মিলে সুবিশাল ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে একটি একক, সুসংগঠিত মেঘ বলয় তৈরি করেছিল। রেকর্ড ভাঙা ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা আর্দ্রতার জোগান পেয়ে এই মেঘের চূড়াগুলো ট্রপোস্ফিয়ারের গভীর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে, এই মেঘমালা একই সঙ্গে কয়েকটি রাজ্যে হড়কা বান, অবিরাম বজ্রপাত, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করা এবং ব্যাপক ফসলহানি ঘটাতে সক্ষম। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দটি হলো 'নজিরবিহীন'। কিন্তু একটি প্রশ্ন তোলা জরুরি: নজিরবিহীন ঘটনাগুলো কেন এত নিয়ম করে বারবার ঘটছে?
"যা একসময় পরিসংখ্যানগতভাবে বিরল ছিল, তা ক্রমশ ভারতের জলবায়ু-ক্যালেন্ডারের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে উঠছে এবং এমন এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন করছে যার উত্তর আবহাওয়াবিজ্ঞানের কাছে নেই।"
পদার্থবিজ্ঞান বলে এর পেছনের বিজ্ঞান নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। একটি উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে, বেশি শক্তি সঞ্চয় করে এবং চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার সীমানাকে নিচে নামিয়ে আনে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজির ড. রক্সি ম্যাথিউ কোল -এর নেতৃত্বাধীন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মধ্য ভারতে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা তিনগুণ বেড়েছে, যার মূল কারণ আরব সাগরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা মৌসুমী পশ্চিমা বায়ুর ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা।
ক্লসিয়াস-ক্ল্যাপেরন (Clausius-Clapeyron) সম্পর্কটি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট: প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের জন্য বায়ুমণ্ডল প্রায় সাত শতাংশ বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে—এই সম্পর্কটি আইপিসিসি-এর (IPCC – Intergovernmantal Panel on Climate Change) ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ১৯৭০-এর দশক থেকে ধারাবাহিকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান আমাদের এটি বলতে পারে না কেন বায়ুমণ্ডলকে আদৌ এত বিপুল পরিমাণ শক্তি শুষে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই আছে, তবে তা আবহাওয়াবিজ্ঞানের সীমানার বাইরে।
যে শিল্পায়ন মডেলে গত দেড় শতাব্দী ধরে বিপুল কার্বন নির্গমন হয়েছে, তা কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বেশ কিছু ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্তের সমষ্টি: কোন ক্ষতিকে হিসাবে ধরা হবে, কোন সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হবে এবং কোন পরিণতিগুলোকে হিসাবের বাইরে রাখা হবে, সে সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত। বনভূমি উজাড় হয়েছে, জলাভূমি ভরাট হয়েছে, প্লাবনভূমির ওপর ইমারত গড়ে উঠেছে এবং উপকূলরেখাকে কংক্রিটে মোড়ানো হয়েছে—প্রতিটি লেনদেনকে 'উৎপাদনশীল ফলাফল' হিসেবে দেখানো হয়েছে, আর প্রতিটি ক্ষতি নীরবে হজম করেছে সেইসব সম্প্রদায় এবং বাস্তুতন্ত্র, হিসাব-নিকাশের টেবিলে যাদের কোনো জায়গাই ছিল না।
বায়ুমণ্ডল কিন্তু তার নিজের হিসাব ঠিকই রেখেছে। এখন সে সেই হিসাবের খাতা সামনে তুলে ধরছে।
যে প্রতিবেশকে বাধা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল:
যে বৃষ্টিপাত একসময় জলাভূমিগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত, তা কেন আজ বিপর্যয় হয়ে আছড়ে পড়ছে—সেটি বুঝতে হলে কেবল আকাশের দিকে তাকালে চলবে না, বরং মেঘ ঘনীভূত হওয়ার আগে ভূমি থেকে কী কী মুছে ফেলা হয়েছে, সেদিকেও তাকাতে হবে।
পশ্চিমঘাট পর্বতমালা—বিশ্বের আটটি প্রধান জীববৈচিত্র্য হটস্পটের একটি এবং উপদ্বীপীয় ভারতের জলতাত্ত্বিক মেরুদণ্ড—যাকে পাথরের খাদান, বাণিজ্যিক কৃষি এবং বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্পের জন্য পদ্ধতিগতভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিটিকে আলাদাভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এমন এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যা কেবল অর্থনৈতিক মুনাফাই মূল্যায়ন করে, কিন্তু পরিবেশ রক্ষা কে 'বাহ্যিক বিষয়' হিসেবে এড়িয়ে যায়। যেসব ম্যানগ্রোভ বন একসময় ভারতের উপকূলরেখায় জলোচ্ছ্বাস রুখে দিত, সেগুলোকে 'পতিত জমি' আখ্যা দিয়ে মৎস্যচাষ ও রিয়েল এস্টেট প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। যেসব প্লাবনভূমি প্রাকৃতিকভাবে জল ধরে রাখার কাজ করত, মাস্টারপ্ল্যানের অধীনে সেগুলোর ওপর ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে উন্নয়নকে বন্যা মোকাবিলার সক্ষমতার বদলে 'স্কোয়ার ফুট' দিয়ে মাপা হয়েছে।
এর কোনোটিই বিনা অনুমোদনে ঘটেনি। প্রতিটি ছাড়পত্র ইস্যু করা হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। প্রতিটি রূপান্তরই জাতীয় হিসাবের খাতায় 'সংযোজন' হিসেবে নথিবদ্ধ হয়েছে—অথচ এর ফলে যে প্রতিবেশ ধ্বংস হলো, সেই ক্ষতির হিসাব কোথাও লেখা হয়নি, এমন কেউ সেই ক্ষতির দায় নেয়নি যার এই প্রকল্পগুলো প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা ছিল।

"প্রশ্ন এটা নয় যে কেন এই বন্যাগুলো ঘটছে। প্রশ্ন হলো, কে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে বন্যা প্রতিরোধকারী প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলো অপ্রয়োজনীয় এবং ধ্বংসযোগ্য?"
এক দশক আগে একটি রিসোর্ট তৈরির জন্য যে উপকূলীয় শহরের ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করা হয়েছিল, আজ যখন সেখানে বন্যা ধ্বংসলীলা চালায়, তখন সেই বিপর্যয়কে একটি 'প্রাকৃতিক ঘটনা' হিসেবে খবর করা হয়। যে ছাড়পত্র এই বিপর্যয়কে ডেকে এনেছে, তা আবহাওয়ার বুলেটিনের অংশ হয় না। রিসোর্টটি দাঁড়িয়ে থাকে। ম্যানগ্রোভ আর ফিরে আসে না।
ভিন্ন উদ্দেশ্যের জন্য তৈরি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
ভারতের নীতিনির্ধারণী কাঠামো এখনও এমন এক জলবায়ু পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, যার অস্তিত্ব আজ আর নেই। তাপপ্রবাহ পরিচালনা করে একটি মন্ত্রণালয়, বন্যা দেখে অন্যটি, আর খরা পরিস্থিতি সামলায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দপ্তর। এই খণ্ডিত ব্যবস্থা কেবল অদক্ষই নয়, এটি পদ্ধতিগতভাবে সুবিধাজনকও বটে। যখন পরিবেশ ধ্বংস এবং জলবায়ুগত প্রভাবের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য কোনো একক কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকে না, তখন এক অঞ্চলে অনুমোদিত বন উজাড়ের সঙ্গে অন্য অঞ্চলে হওয়া বন্যার যোগসূত্র স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
ড. প্রদীপ্ত ঘোষ, ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন সচিব এবং টেরি (TERI - The Energy and Resources Institute)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো—যেমনটা একাধিক পলিসি ফোরামে যুক্তি দিয়েছেন যে, ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলো নকশা করা হয়েছিল 'গড়' জলবায়ু পরিস্থিতির জন্য। এই পর্যবেক্ষণটিকে সাধারণত আধুনিকায়নের ডাক হিসেবে দেখা হয়। তবে একে এমন এক ব্যবস্থার বর্ণনা হিসেবেও পড়া যায়, যাকে কখনো সেইসব পরিস্থিতির পুরো মূল্য হিসাব করতে বলা হয়নি, যা সৃষ্টিতে সে নিজেই পরোক্ষভাবে সহায়তা করছিল।
এই ক্ষেত্রে 'উন্নয়ন'-এর ভাষাটি অসাধারণ রকম কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এটি যাবতীয় স্ববিরোধিতাকে শুষে নেয়। বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া হাইওয়ে হলো 'পরিকাঠামো'। নদী ব্যবস্থায় দেওয়া বাঁধ হলো 'প্রগতি'। জোয়ারের প্লাবনভূমিতে নির্মিত বন্দর হলো 'কানেক্টিভিটি' বা যোগাযোগ। আর ভাটির দিকের যেসব মানুষ তাদের বন্যার বাফার, মৎস্যসম্পদ এবং ভূগর্ভস্থ জল হারাল—তারা পেল কেবল এই 'উন্নয়ন'-এর গালভরা শব্দাবলি, আর তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো ক্ষতির সমস্ত হিসাব।
“উন্নয়নের ভাষাটি অসাধারণ রকম কার্যকর। এটি স্ববিরোধিতার সমাধান না করেই তাকে শুষে নেয়—আর সমস্ত অবশিষ্টাংশ ও ক্ষতির দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়, যারা এই হিসাবের প্রতিবাদ করতে সবচেয়ে অক্ষম”।
নিচু এবং অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাযুক্ত বসতিগুলোতে বসবাসকারী লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক, উপকূলীয় জেলে এবং শহরের খেটে খাওয়া মানুষের কাছে একটি চরম আবহাওয়ার ঘটনাই বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়া তাদের অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি মুছে দিতে পারে। তাদের পরিবেশগত বাফারগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার এই ছাড়পত্র-ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা তারা তৈরি করেনি। জবরদখল অনুমোদনকারী কমিটিগুলোতে তারা বসেও ছিল না। কিন্তু যখন চূড়ান্ত হিসাব মেলানোর সময় আসে, তখন বন্যার জলেই তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
বৈশ্বিক খতিয়ান
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৭.৬ শতাংশের জন্য ভারত দায়ী—যা গত এক দশকে বার্ষিক প্রায় ২.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, বিশ্বব্যাপী পুঞ্জীভূত CO₂ নির্গমনে ভারতের অবদান মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি। যে বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিতিশীলতা আজ দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়াকে নতুন আকার দিচ্ছে, তার মূল কারণ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় হওয়া শিল্পায়ন—যে শিল্পায়ন দীর্ঘ সময় ধরে সভ্যতাগত পরিসরে ঠিক একই যুক্তিতে পরিবেশগত ক্ষতিকে 'বাহ্যিক বিষয়' হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
এই অসমতার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ধনী দেশগুলোর জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বারবার কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, বাস্তবায়িত হয়নি। এটি কোনো কূটনৈতিক অসুবিধা মাত্র নয়। এটি একই যুক্তির আন্তর্জাতিক প্রয়োগ: ক্ষমতাবানদের দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতির মাশুল চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ওপর, যারা এই ক্ষতি তৈরি করেনি; আর হিসাব-নিকাশ এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে এই যোগসূত্র প্রমাণ করা কঠিন হয় এবং দায় এড়ানো আরও সহজ হয়।
ভারতকে একা জলবায়ু অভিযোজনের খরচ মেটাতে বলা যায় না, যখন সেই নির্গমনের দায়ভারও তাকেই নিতে হচ্ছে যা সে নিজে উৎপাদন করেনি। কিন্তু ভারতও তার নিজের পরিবেশগত ব্যবস্থাগুলোকে সেইসব মানুষের প্রবৃদ্ধির জামানত হিসেবে বিলিয়ে দিতে পারে না, যারা বর্তমানের এই নির্বিচার ছাড়পত্র নীতি থেকে লাভবান হচ্ছে। এই দুটি ঋণই বাস্তব। এবং দুটিই এখনো অপরিশোধিত।
প্রকৃতপক্ষে যা কাজে আসবে
এখন আরেকটি পরামর্শমূলক রিপোর্টের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো, কোন জিনিসগুলোকে হিসাবে ধরা হবে, সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সমন্বিত জলবায়ু অভিযোজন কর্তৃপক্ষ গঠন করা একটি ভালো সূচনা হতে পারে—তবে তা তখনই কার্যকর হবে, যদি সেটি পরিবেশগত ক্ষতিকে কেবল একটি আবেগ হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক ক্ষতি হিসেবে পরিমাপ করার ক্ষমতা পায়। পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, টিকে থাকা জলাভূমি এবং ম্যানগ্রোভ ব্যবস্থাগুলোকে জাতীয় রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করার অর্থ হলো, তাদের কার্যাবলির সঠিক মূল্যায়ন বা মূল্য নির্ধারণ করা; কেবল এমন নীতি নথিতে তাদের গুরুত্ব ঘোষণা করা নয়, যে নথির পাশাপাশি তাদের উচ্ছেদের ছাড়পত্রও অবলীলায় দেওয়া হয়।
ভারতকে তার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় থাকা ফাঁকগুলোও পূরণ করতে হবে, যা এখনো বিশাল গ্রামীণ ভূগোলকে পর্যাপ্ত আবহাওয়াগত কভারেজের বাইরে রেখে দেয়। অথচ প্রতিবেশী বাংলাদেশেই এআই-ভিত্তিক বন্যা পূর্বাভাস মডেল ৯৮ শতাংশের বেশি নির্ভুলতা অর্জন করেছে, এবং নেদারল্যান্ডসে 'ডেলটারেস-কেএনএমআই' সিস্টেম এআই-ভিত্তিক বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসকে সরাসরি তাদের জরুরি সাড়া প্রদান প্রোটোকলে যুক্ত করেছে।

প্রযুক্তি হাতের নাগালেই রয়েছে। প্রশ্ন হলো, চরম আবহাওয়ার ঝুঁকির মুখে থাকা মানুষদের এই বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় কি না। এর কোনোটিই ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বাইরে নয়। যা অনুপস্থিত, তা সক্ষমতা বা দক্ষতা নয়। বরং একটি সৎ হিসাব-নিকাশের অভাব—যাতে পরিষ্কার হয় যে, 'প্রবৃদ্ধি' হিসেবে নথিবদ্ধ সিদ্ধান্তগুলোর আসল দাম কারা চোকাচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজকে যদি পুরো খতিয়ানটি দেখানো হয়, তবে তারা এই ব্যবস্থা চালিয়ে নিতে চাইবে কি না, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
পূর্ণাঙ্গ হিসাবের খাতা
উপমহাদেশের ওপর দিয়ে বেঁকে যাওয়া সেই বিশাল মেঘের করিডোরের স্যাটেলাইট ছবিটি হয়তো এই দশকের অন্যতম সংজ্ঞায়িত চিত্রে পরিণত হতে পারে। এটিকে একটি 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ' হিসেবে বর্ণনা করা হবে। বর্ণনাটি ভুল নয়। তবে এটি অসম্পূর্ণ। এটি এমন একটি ভূখণ্ডেরও চিত্র, যাকে সুপরিকল্পিতভাবে সেইসব প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা এই বিপর্যয়কে প্রশমিত করতে পারত। এটি এমন এক হিসাবরক্ষণের চিত্র, যা প্রকৃতি ধ্বংস করাকে 'উন্নয়ন' বলে চালিয়ে দিয়েছে এবং পরিণতিগুলোকে নিছক 'আবহাওয়া' বলে দায় এড়িয়েছে। এটি সেইসব সম্প্রদায়ের চিত্র, যাদের বলা হয়েছিল যে তারা এই সিদ্ধান্তগুলোর বেনিফিসিয়ারি বা সুবিধাভোগী, অথচ বাস্তবে তারা সেই সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতির মধ্যেই বসবাস করছে।
"কোনটি অনুমোদিত আর কোনটির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল, বায়ুমণ্ডল তার মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। সে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাবের খাতাটি ঠিকই তৈরি রাখে। এবং এখন সে সেটিই সামনে তুলে ধরছে"।
নিজের জলবায়ু ভবিষ্যতের শর্তগুলো নির্ধারণ করার সক্ষমতা ভারতের এখনো রয়েছে। তবে এর জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং অভিযোজন তহবিলের চেয়েও বেশি কিছুর প্রয়োজন হবে—যদিও সেগুলো অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন হবে প্রকৃত রাজনৈতিক সাহসের সাথে এই প্রশ্নটি তোলা: প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন হিসেবে নথিবদ্ধ হওয়া পরিবেশগত সিদ্ধান্তগুলো আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করেছে? হিসাবের খাতা চিরতরে বন্ধ হওয়ার আগে কি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি হিসাবরক্ষণ সম্ভব?
আকাশ অবশ্যই ইতিমধ্যেই তার উত্তর দিয়ে দিয়েছে কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিস্থিতি তৈরি করতে সাহায্য করেছে, তারা আকাশের এই ভাষা পড়তে প্রস্তুত কি না!
অনুবাদক: শর্মিতা ভট্টাচার্য
তথ্যসূত্র ও টীকা:
[1] রক্সি, এম.কে. ইত্যাদি (২০১৭)। "A threefold rise in widespread extreme rain events over central India." নেচার কমিউনিকেশনস, ৮, ৭০৮। doi:10.1038/s41467-017-00744-9 — ১৯৫০-২০১৫ সালের মধ্যে মধ্য ভারতে চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা তিনগুণ বেড়েছে, যার কারণ আরব সাগরের মৌসুমী পশ্চিমা বায়ুর অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি।
[2] আইপিসিসি সিক্সথ অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট (AR6), ওয়ার্কিং গ্রুপ ১ (২০২১), পৃষ্ঠা ১০৬৫ এবং ৩৩০।
[3] ড. প্রদীপ্ত ঘোষ: প্রাক্তন সচিব, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ভারত সরকার (সেপ্টেম্বর ২০০৩ – মে ২০০৭); ডিস্টিংগুইশড ফেলো, টেরি; ভারতের জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন অ্যাকশন প্ল্যানের প্রধান রচয়িতা; সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কাউন্সিল।
[4] বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে ভারতের অংশ: বৈশ্বিক মোটের ৭.৬১% (গ্লোবাল কার্বন প্রজেক্ট, ২০২৩ ডেটা)। ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্র্যাকার। ঐতিহাসিক পুঞ্জীভূত CO₂ অংশ: প্রায় ৩%।
[5] বাংলাদেশ: GRU ডিপ-লার্নিং বন্যা পূর্বাভাস, নির্ভুলতা ৯৮%-এর বেশি (রিসার্চগেট, ২০২৫)। নেদারল্যান্ডস: ডেলটারেস-কেএনএমআই এআই-ভিত্তিক বৃষ্টিপাত পূর্বাভাস যা সরাসরি জরুরি সাড়া প্রদানের সাথে যুক্ত (ডেলটারেস, ২০২৫)।
প্রতিবেদক মাঝে মাঝে যেসব প্রশ্ন গুলো রেখেছেন যেমন, শুধু আকাশের দিকে তাকালে হবে না, জমি থেকে কি কি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।
বা, কোনটি অনুমোদিত বা কোনটির ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত ছিল বায়ুমণ্ডল তার মধ্যে তফাৎ করে না।
পাঠককে ভাবাবে। হয়তো প্রশ্ন করতে শেখাবে।