ইতিহাস বলে ১৯৪৩ সালে সুভাষচন্দ্র বসু একটি জার্মান সাবমেরিনে চড়ে সমুদ্র পাড়ি দেন এবং মাঝ সমুদ্রে একটি জাপানি সাবমেরিনে গিয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার এক আন্তর্জাতিক পরিকল্পনায় তিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। তাঁর এই সমুদ্রযাত্রা যেমন ছিল এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা, তেমনই এটি আমাদের কাছে একটি বড় সতর্কবার্তাও — উদ্দেশ্য ভালো হলেই সকল সিদ্ধান্ত অথবা পরিকল্পনা সঠিক হয়ে যায় না।

স্বাধীনতা দিবসের পরের দিন সকালেও জাতীয় পতাকা উড়তে থাকে, জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ, সঙ্গীতের অনুরণন শোনা যায় আকাশে বাতাসে - গান্ধী, ভগত সিং, নেহেরু, প্যাটেল ও সুভাষচন্দ্র বসুর মতো পরিচিত নামগুলো দেশবাসীর আবেগে মিশে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিকে এই অনুষ্ঠানগুলো জাগিয়ে তোলে, আমরা সবাই মিলে একটি বহুমুখী সংগ্রামের অতীত ভাগ করে নিই। কিন্তু উৎসবের আমেজ যখন কাটতে শুরু করে, তখন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা অনেকগুলি প্রশ্নের মুখে আমাদের দাঁড় করায়। নাৎসি জার্মানি থেকে জাপানের দখলে থাকা এশিয়ার উদ্দেশ্যে বসুর সেই সাবমেরিন যাত্রা তেমনই একটি ঘটনা। এটি যেমন ছিল অসম্ভব সাহসিকতার এক পরিচয়, তেমনই এটি ছিল দুটি একনায়কতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের ক্ষমতার অলিন্দে বসে খেলা এক রাজনৈতিক জুয়া।
১৯৪৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, সুভাষচন্দ্র বসু এবং তাঁর সহযোগী আবিদ হাসান জার্মানির 'ইউ-১৮০' (U-180) সাবমেরিনে চড়ে কিল (Kiel) বন্দর থেকে রওনা হন। তখন যাতায়াতের প্রধান পথগুলো বন্ধ ছিল এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাঁর খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছিল। সাবমেরিনটি আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে, উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ভারত মহাসাগরের দিকে এগিয়ে চলে। মাদাগাস্কারের কাছে উত্তাল সমুদ্রে, এক সাবমেরিন থেকে অন্য সাবমেরিনে যাওয়ার জন্য বসু ও হাসান একটি ছোট রবার বোট ব্যবহার করেন এবং জাপানি সাবমেরিন 'আই-২৯' (I-29)-এ গিয়ে ওঠেন। সেখানে কোনো বন্দর ছিল না, ছিল না কোনো কূটনৈতিক নিরাপত্তা। সামান্যতম ভুল হলেই মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। অবশেষে ৬ মে, 'আই-২৯' তাঁদের সুমাত্রা উপকূলের সাবাং দ্বীপে নিরাপদে পৌঁছে দেয়।
এই যাত্রার শারীরিক ঝুঁকিটা সহজে বোঝা যায়। কিন্তু এর পেছনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশটা বোঝা তার চেয়েও অনেক কঠিন।
সুভাষচন্দ্র বসু কেবল ব্রিটিশ নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা করছিলেন না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছানো, আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব দেওয়া, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র লড়াই গড়ে তোলা এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া। ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে, তিনি সিঙ্গাপুরে ‘আজাদ হিন্দ সরকার’ বা স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন।২ তাঁর এই রণকৌশল দাঁড়িয়ে ছিল একটি স্পষ্ট যুক্তির ওপর: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটাতে ব্রিটেনের শত্রুদের সাময়িক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।
এই যুক্তিটি সুভাষচন্দ্র বসুর রণকৌশলের দিক থেকে সঠিক মনে হয়েছিল। কিন্তু এটিই আবার ইতিহাসের পাতায় মস্ত বড় এক বৈপরীত্য বা দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে।
হিটলারের জার্মানি এবং সামরিক শাসিত জাপান কিন্তু কোনো নিরপেক্ষ মাধ্যম ছিল না, যারা কেবল ভারতের স্বাধীনতাকে এনে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা নিজেরাই ছিল চরম বর্ণবাদী, একনায়কতান্ত্রিক এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের ছক কষছিল। সুভাষচন্দ্র বসু এই দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই সংকট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার এক বিরল সুযোগ। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর এই চিন্তাভাবনা হয়তো তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু তাঁর এই সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই তর্কাতীত নয়।
ঠিক এই কারণেই ইতিহাসের স্মৃতি যখন অন্ধ ভক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
সুভাষচন্দ্র বসুর সাহসকে সম্মান জানানোর জন্য তাঁর নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা জোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা বন্ধ করার কোনো অবকাশ নেই। আবার অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদের নিন্দা করা বা জাপানের সামরিক আগ্রাসনের বিরোধিতা করার মানে এই নয় যে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাঁর আপসহীন লড়াইকে আমরা অস্বীকার করব। একটি দায়িত্বশীল দেশের উচিত এই দুটি সত্যকেই একসাথে মেনে নেওয়া। তা না হলে ইতিহাস হয় স্রেফ অন্ধ উপাসনায় পরিণত হবে, না হয় একতরফা বিচারে আটকে যাবে; যেখানে নায়ককে একদম নিখুঁত বানিয়ে দেওয়া হয়, অথবা কোনো ভুলত্রুটি থাকলে সেই মানুষটির সমস্ত অবদানকেই মূল্যহীন করে দেওয়া হয়।
সুভাষচন্দ্র বসুর এই ঐতিহাসিক যাত্রা কোনো দেশপ্রেমের রূপকথা নয়, আবার নৈতিকতার দোহাই দিয়ে একে উড়িয়ে দেওয়াও যায় না। এর আসল প্রয়োজন হলো একটি নিরপেক্ষ ও গভীর মূল্যায়ন।
সুভাষচন্দ্র বসুকে যে কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হয়েছিল, তা কিন্তু নয়। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে তাঁর পুনর্নির্বাচন ঘটেছিল মহাত্মা গান্ধীর স্পষ্ট বিরোধিতা সত্ত্বেও—যেখানে গান্ধীর পছন্দ ছিলেন পট্টভি সিতারামাইয়া। বল্লভভাই প্যাটেলসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের বড় একটা অংশ বসুর নেতৃত্বের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এমনকি গোবিন্দ বল্লভ পন্থের আনা 'ত্রিপুরী প্রস্তাব' কার্যত বাধ্য করেছিল যে, বসুর ওয়ার্কিং কমিটিকে অবশ্যই গান্ধীর পূর্ণ আস্থাভাজন হতে হবে। শেষ পর্যন্ত সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করলে রাজেন্দ্র প্রসাদ সেই স্থলাভিষিক্ত হন। জওহরলাল নেহেরুর অবস্থান অবশ্য আরও বেশি দোটানায় ভরা ছিল। কংগ্রেসের রক্ষণশীল নেতাদের চেয়ে নেহেরুর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা বসুর সমাজতান্ত্রিক ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির অনেক কাছাকাছি ছিল এবং তাঁর সাথে বসুর একটি ব্যক্তিগত আত্মিক টানও ছিল। তা সত্ত্বেও অক্ষশক্তির (জার্মানি-জাপান) সাথে হাত মেলানোর ব্যাপারে নেহেরু বসুকে সমর্থন করেননি। ফলে, সুভাষচন্দ্রের এই একাকীত্ব বা বিচ্ছিন্নতা কেবল ব্রিটিশদের তৈরি করা ছিল না। স্বাধীনতা কীভাবে ছিনিয়ে আনা উচিত—এই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন উত্তরের টানাপোড়েনে খোদ দেশের জাতীয় আন্দোলনের ভেতর থেকেই তাঁর এই বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল।
সুভাষচন্দ্র বসু একটি সত্য বুঝতে পেরেছিলেন, যে শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদ এর ধ্বজা তুলে দেশকে স্বাধীন করা যাবে না —যতক্ষণ না শাসন ক্ষমতার হস্তান্তর আন্তর্জাতিকভাবে হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কেবল মুখের কোথায় এতদূর বিস্তৃত হয় নি। এর শক্তির আসল ভিত্তি ছিল সেনাবাহিনী, পুঁজি বা অর্থ, ভারতের সম্পদ লুটে নেওয়া, সমুদ্রের বাণিজ্যিক পথ, বড় বড় কর্পোরেশন এবং আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা—যা ভারতকে অনেক দূরের কোনো মূল শাসনকেন্দ্রের সাথে জুড়ে রাখত। সুভাষচন্দ্র বসু সাম্রাজ্যবাদের এই আন্তর্জাতিক শক্তিকে রুখে দেওয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতি-কৌশল বা পাল্টা পরিকল্পনা বেছে নিয়েছিলেন।
তাঁর এই চিন্তাভাবনার মধ্যে যেমন একটা দারুণ দুঃসাহস ছিল, তেমনই ছিল মস্ত বড় ঝুঁকিও।
স্বাধীনতার সংগ্রামগুলো কখনোই খুব সহজ পরিস্থিতি তে হয় না। তাদের লড়াই করতে হয় বড় বড় শক্তিশালী সাম্রাজ্য, শত্রু দেশ, সম্পদের অভাব আর টিকে থাকার এক কঠিন বাস্তবতার বিরুদ্ধে। যেখানে উদ্দ্যেশ্য থাকে একটিমাত্র এবং মনে হতে পারে—যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্যটা মহৎ, তাই সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যেকোনো পথ বা হাতিয়ার বেছে নেওয়াই ঠিক। কিন্তু ইতিহাস বারেবারে অন্য কথাই প্রমাণ করেছে।
একটি ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্য কিন্তু তার জন্য বেছে নেওয়া যে কোনো জোট বা সমঝোতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক বা ন্যায়সঙ্গত করে তোলে না।
এই দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু কেবল সুভাষচন্দ্র বসুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পরিধি আরও অনেক বড়। সরকারগুলো জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দেয়; বড় বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ আর চাকরির কথা বলে; বিশেষজ্ঞরা দক্ষতার অজুহাত দেখায়; আর রাজনৈতিক দলগুলো ইতিহাসের প্রয়োজনের কথা বলে। এরা প্রত্যেকেই সাধারণ মানুষকে শুধু একটা ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়, আর তার আড়ালে আসল উদ্দেশ্য থাকে লাভবান মানুষদের দেখানো এবং এর ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের দিক থেকে নজর ঘুরিয়ে রাখা। সময়ের সাথে সাথে মুখের কথা বা ভাষা বদলে যায়। কিন্তু রাজনীতির এই পুরোনো খেলাটা একই থাকে: নিজের উদ্দেশ্যটাকে মহান দেখিয়ে ক্ষমতার আসল রূপটাকে আড়াল করা বা আড়ালে রাখা।
সুভাষচন্দ্র বসুর এই গল্পটি স্বাধীনতার নিজস্ব চেনা ধারণাকেও কিছুটা নাড়িয়ে দেয়।
বসুর প্রধান প্রশ্ন ছিল: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এই শাসনকে কীভাবে উপড়ে ফেলা যায়?
কিন্তু বি আর আম্বেদকরের প্রশ্নটি ছিল আরও গভীর ও বড় চ্যালেঞ্জের: স্বাধীন দেশের ভেতরে যদি জাতপাতের বৈষম্য আর অত্যাচার টিকেই থাকে, তবে সেই রাজনৈতিক স্বাধীনতার আসল মূল্যটাই বা কী?
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট কিন্তু স্বাধীনতা একবারে সম্পূর্ণ বা তৈরি অবস্থায় আমাদের কাছে আসেনি। রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব হয়তো ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল, কিন্তু স্বাধীনতা কখনোই কেবল বিদেশি শাসকদের হাত থেকে ভারতীয় শাসকদের হাতে ক্ষমতার বদল হতে পারে না। আসল এবং গভীর প্রশ্নগুলো কিন্তু রয়েই গেল: স্বাধীনতা কথার প্রকৃত অর্থ ঠিক কী থেকে মুক্তি, এই স্বাধীনতা আসলে কাদের জন্য—আর কার মূল্যে বা কাকে ত্যাগ করে এই স্বাধীনতা?
একজন দলিতের কাছে জাতপাতের বৈষম্য থেকে মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা হলো একটি অধরা বা অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি। একজন শ্রমিকের কাছে জাতীয় পতাকা কখনো ন্যায্য মজুরি, কাজের নিরাপত্তা বা নিজের শ্রমের ওপর অধিকারের বিকল্প হতে পারে না। একজন নারীর কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব পুরুষতান্ত্রিক শাসনকে গুঁড়িয়ে দেয় না। একজন আদিবাসী বা বনবাসী সম্প্রদায়ের কাছে উন্নয়ন কখনোই স্বাধীনতা নয়, যদি তাদের জমি, জঙ্গল আর মতামতকে তাদের চেয়েও বেশি শক্তিশালী কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে ওলটপালট করে দেওয়া হয়। আর একজন নাগরিকের কাছে গণতন্ত্র ততক্ষণ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ, যতক্ষণ সরকারের সমালোচনা করাকে দেশের প্রতি শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়।
জাতীয় পতাকা স্বাধীনতার প্রতীক হতে পারে। কিন্তু এই পতাকা নিজে থেকে সবার কাছে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ পৌঁছে দিতে পারে না।
ঠিক এই জায়গাতেই সুভাষচন্দ্র বসুর সেই সমুদ্রযাত্রা তাঁর নিজস্ব ইতিহাস হয়েও আমাদের আজকের সময়ের গল্প হয়ে ওঠে। তিনি যে ভারত মহাসাগর দিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন, সেখানেই আজ গ্রেট নিকোবরের ‘সার্বিক উন্নয়ন’ (holistic development) প্রকল্পটিকে দেশের নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে। সরকারের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পটি ১৬৬.১০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে উঠবে, যার মধ্যে ১৩০.৭৫ বর্গকিলোমিটারই হলো বনাঞ্চল; এখানে প্রায় ৭.১১ লক্ষ গাছ কেটে ফেলা হতে পারে এবং বর্তমান আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকার একটি অংশকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।৩ অবশ্য এই প্রকল্পে সবুজ অঞ্চল তৈরি করা, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন, কড়া নজরদারি এবং শম্পেন বা নিকোবরি উপজাতি সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ না করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। এই খতিয়ানগুলো হয়তো আমাদের আজকের সময়ের, কিন্তু নৈতিক প্রশ্নটা ঠিক সেটাই যা বসুর সেই ঐতিহাসিক যাত্রা আমাদের সামনে রেখে গেছে: উদ্দেশ্যকে কাগজে-কলমে মহান দেখানো হলেই কি তা অর্জনের জন্য বেছে নেওয়া মাধ্যম এবং ত্যাগ স্বীকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত বলে দেওয়া যায়?
একেবারেই না। দেশের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান অবশ্যই বাস্তব ও জরুরি বিষয়, ঠিক যেমন ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়াটা ছিল একটা ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্য। কিন্তু একটি চিরহরিৎ বনাঞ্চল (rainforest) কেবল কিছু গাছের গুঁড়ির হিসাব নয় যে অন্য কোথাও কিছু চারাগাছ লাগিয়ে দিলেই তার ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে। আর উচ্ছেদ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়াটাই যথেষ্ট কথা নয়, কারণ এর ফলে একটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব এলাকা, চেনা খাদ্যব্যবস্থা এবং ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রকাশের ক্ষমতাকে তাদের সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হয়। রাষ্ট্র ও পুঁজিপতিদের এই আঁতাতের জন্য কোনো গোপন ষড়যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না; এটি কাজ করে সরকারি নীতি, ছাড়পত্র, অর্থায়ন, ঠিকাদারি এবং সেই ক্ষমতার জোরে—যা ঠিক করে দেয় কার জমি দেশের পরিকাঠামোয় বদলে যাবে, আর কার ক্ষতিকে একটি ‘মেনে নেওয়ার মতো সাধারণ ত্যাগ’ বলে ধরে নেওয়া হবে। ‘দেশের স্বার্থে নিজেদের মানসিক শান্তি বলি দেওয়া’ র ও তাই কোনো মূল্যায়ন হবে না। পরিবেশগত স্বাধীনতাও (ecological freedom) আমাদের স্বাধীনতার সংজ্ঞার ভেতরেই পড়ে। যে নাগরিক পরিচ্ছন্ন বাতাসে শ্বাস নিতে পারে না, নিরাপদ জল পান করতে পারে না, বা সামাজিক ব্যবস্থা বাঁচিয়ে রাখার মতো জমিটুকুকে রক্ষা করতে পারে না— সংকুচিত হতে থাকা বাস্তব দুনিয়ায় তার সেই নাগরিক অধিকার কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
এই প্রশ্নগুলো কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে তোলা কোনো প্রশ্ন নয়। বরং এই প্রশ্নগুলো খোদ ভারত নামক একটি দেশের স্বার্থেই তোলা অত্যন্ত জরুরি। যে দেশ গঠিত সেই দেশের আপামর জনসাধারণের দ্বারা। তাই তাদের স্বাধীনতার অধিকার ও দেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সুভাষচন্দ্র বসুকে কোনো বাঁধাধরা বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গণ্ডির মধ্যে আটকে রেখে মূল্যায়ন করা যায় না। ইতিহাসের পাতায় স্লোগান দেওয়া একজন বীর নায়কের চেনা ছবির মধ্যে যেমন তাঁকে বন্দী করা যায় না, তেমনই যে স্বৈরাচারী শাসকদের সাহায্য তিনি নিয়েছিলেন, শুধু তাদের নিক্তিতেও তাঁর বিচার করা চলে না। তাঁকে দেখতে হবে এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে, যিনি চরম ও অস্বাভাবিক চাপের মধ্যে থেকেও এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা ছিল অত্যন্ত সাহসী, সুদূরপ্রসারী এবং নৈতিক দিক থেকে বিপজ্জনক। একটি পরিণত বা দায়িত্বশীল সমাজ ইতিহাসকে শুধু অন্ধ ভক্তি অথবা প্রত্যাখ্যানের চোখে দেখে না। তা কোনো পক্ষের পরোয়া না করে স্বাধীনভাবে সত্যিটা ভাবতে শেখায়।
সাবমেরিনের এই ঘটনাটি কেবল একটি নাটকীয় দৃশ্য তৈরি করেনি। এর গভীরতা আরও অনেক বড়। এর ভেতরে জায়গা ছিল খুব কম, চারপাশ দেখার সুযোগ ছিল সীমিত আর সামান্য ভুলের ও কোনো সুযোগ ছিল না। আজকের যুগের আধুনিক ক্ষমতা বা শাসনব্যবস্থাও কিন্তু ঠিক একইভাবে কাজ করে—একেবারে সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে। বিভিন্ন মন্ত্রক বা মন্ত্রণালয়, বড় বড় কোম্পানির বোর্ডরুম, সামরিক বাহিনী, সরকারি নিয়ামক সংস্থা আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া একেকটি সিদ্ধান্ত সাধারণ নাগরিকদের অজান্তেই লাখ লাখ মানুষের জীবন ওলটপালট করে দিতে পারে। মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিদ্ধান্তগুলো সুকৌশলে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
তাই গণতন্ত্রের জন্য কেবল নির্বাচন হওয়াই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সচেতনতা বা দূরদৃষ্টি, যা দিয়ে ক্ষমতার এই ভেতরের আসল রূপটাকে চিনে নেওয়া যায়।
একটি নীতি বা পরিকল্পনা আসলে কে তৈরি করল? এর পেছনে টাকা ঢালল কে? সুযোগ-সুবিধা, কাজের চুক্তি, বরাদ্দ, সাধারণ মানুষের গোপন তথ্য, জঙ্গল কাটার ছাড়পত্র কিংবা সরকারি গ্যারান্টি—এসব শেষ পর্যন্ত কে পেল? এর থেকে লাভ বা মুনাফা কার পকেটে যাচ্ছে? আর এর ফলে হওয়া দূষণ, ঋণের বোঝা, কড়া নজরদারি, উচ্ছেদ কিংবা মাটির তলার জল শুকিয়ে যাওয়ার কষ্ট—এসব সহ্য করছে কে? সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কোন কোন প্রতিষ্ঠানের মতামত নেওয়া হয়েছিল, আর কাদের ওপর জোর খাটিয়ে রাজি করানো হয়েছিল? কার প্রতিবাদকে ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা বিশৃঙ্খলা’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে? আর কার চোখের জল বা ক্ষতিকে স্রেফ একটি ‘মেনে নেওয়ার মতো সাধারণ ত্যাগ’ বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে?
একজন স্বাধীন নাগরিক যখন এই প্রশ্নগুলো তোলে তখন শুধুমাত্র কোনো বিরোধী দল, কোনো অপছন্দের কোম্পানি বা কোনো বিদেশি সাম্রাজ্যের দিকেই তোলেন না; বরং জনগণের নামে কাজ করার দাবি করা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দিকেই তোলেন। স্বাধীনতা মানে এই সুবিধা বা অন্ধ বিশ্বাস নয় যে, আমার নিজের দল বা নিজের পক্ষ সবসময় ঠিক কাজই করছে। আসল স্বাধীনতা হলো নিজের মানুষজনসহ সব পক্ষকেই নির্ভয়ে প্রশ্ন করার ক্ষমতা রাখা।
সুভাষচন্দ্র বসু নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, যে রাজনৈতিক শৃঙ্খল ভারতকে বন্দি করে রেখেছে তা ভেঙে ফেলা সম্ভব। আজ সেই শৃঙ্খলের রূপ বদলে গেছে। ভারতের আজ একটি নিজস্ব সংবিধান আছে, সবার ভোট দেওয়ার অধিকার আছে, আদালত, বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং কাগজে-কলমে নাগরিক অধিকার আছে। তা সত্ত্বেও জাতপাতের বৈষম্য, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে বিপুল সম্পত্তি জমা হওয়া, কাজের অনিশ্চয়তা, সরকারি নিয়মের অপব্যবহার, সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনিতিককদের তৈরি করা ভয়, প্রকৃতির ধ্বংসলীলা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার কারণে স্বাধীনতা আজ ভেতর থেকে ফাঁপা।
ঔপনিবেশিক শাসন বা ব্রিটিশ রাজত্ব হয়তো শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষমতার সেই আসল দাপট ও শোষণ কিন্তু হারিয়ে যায়নি।
তাই স্বাধীনতা দিবসের পরে আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন আসে, যা শুধু উৎসবের আমেজ দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। প্রশ্নটা শুধু এটা নয় যে স্বাধীনতার জন্য কারা লড়াই করেছিলেন, বরং আসল প্রশ্ন হলো এই স্বাধীনতা আজ কারা সত্যিই ভোগ করতে পারছেন। আর এই প্রশ্নের উত্তর আরও জোরে দেশাত্মবোধক স্লোগান দিলে, আরও বড় বড় স্মৃতিসৌধ বানালে কিংবা ইতিহাসের পাতাকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিলেই পাওয়া যাবে না। এর আসল উত্তর লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার মধ্যে। তারা কি কোনো ভয় ছাড়া নিজেদের কথা বলতে পারছেন? দল বা সংগঠন গড়তে পারছেন? প্রতিবাদ করতে পারছেন? মর্যাদার সাথে কাজ করতে পারছেন? মন খুলে শ্বাস নিতে, পরিষ্কার জল খেতে কিংবা নিজের জঙ্গলকে রক্ষা করতে পারছেন? ক্ষমতাশালী না হয়েও কি তারা উচ্ছেদ রুখে দিয়ে সহজে বিচার পাচ্ছেন? নাগরিকদের মানসিক শান্তি বা স্বস্তি কি বজায় থাকছে?
সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের শাসনভার বদলানোর জন্য ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। সেই অন্ধকার সমুদ্রের বুক চিরে তিনি যে রাজনৈতিক প্রশ্নটি তুলে এনেছিলেন, তা আজও একইভাবে বেঁচে আছে: দেশের শাসকেরা বদলে যাওয়ার পর প্রকৃত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য ঠিক কী কী বদলানো সবচেয়ে বেশি জরুরি?
স্বাধীনতা কখনোই চিরকালের জন্য একবারে জিতে নেওয়া যায় না। প্রতিটি প্রজন্মকে লড়াই করে এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হয়, সবার মধ্যে সমানভাবে বিলিয়ে দিতে হয়, এর শিকড়কে আরও গভীরে নিয়ে যেতে হয় এবং পরিবেশের সুরক্ষার মধ্য দিয়ে একে নিরাপদ করতে হয়।
উৎসবের দিনগুলো শেষ হওয়ার পর নেতাজিকে স্মরণ করার হয়তো এটাই সবচেয়ে সৎ এবং সঠিক উপায়—তাঁকে কোনো নিখুঁত পাথরের মূর্তি বানিয়ে রাখা নয়, বরং তাঁর প্রতি অন্ধ আনুগত্য না দেখিয়ে তাঁর জীবন থেকে স্বাধীন রাজনৈতিক সাহসের শিক্ষা নেওয়া। তিনি একটি আস্ত সাম্রাজ্যকে ভেঙে ফেলার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। আর আমাদের দায়িত্ব হলো এমন প্রতিটি ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করা এবং পরিবর্তন করা, যা স্বাধীনতা, উন্নয়ন বা জাতীয় স্বার্থের আড়ালে আসলে শোষণ ও ক্ষমতার দাপটকে টিকিয়ে রাখতে চায়।
তথ্যসূত্র ও টীকা:
-
সুগত বসু, হিজ ম্যাজেস্টিস অপোনেন্ট: সুভাষচন্দ্র বসু অ্যান্ড ইন্ডিয়াজ স্ট্রাগল এগেইন্সট এম্পায়ার (হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১১); নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ঐতিহাসিক পোর্টাল, ‘ফার ইস্ট—রিয়েলাইজিং দ্য ভিশন।’
-
ন্যাশনাল আর্কাইভস অফ সিঙ্গাপুর, আলোকচিত্রের রেকর্ড, ‘প্রোক্ল্যামেশন অফ প্রোভিশনাল গভর্নমেন্ট অফ আজাদ হিন্দ (ফ্রি ইন্ডিয়া) বাই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু,’ ২১ অক্টোবর ১৯৪৩; লিওনার্ড এ. গর্ডন, ব্রাদার্স এগেইন্সট দ্য রাজ (কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯০)।
-
প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো, ভারত সরকার, ‘গ্রেট নিকোবর প্রজেক্ট,’ ১ মে ২০২৬। এই অনুচ্ছেদের সমস্ত পরিসংখ্যান এবং সরকারের দেওয়া সুরক্ষাকবচের তথ্যগুলো সরকারি অফিসিয়াল খতিয়ান থেকে নেওয়া হয়েছে।
-
যুদ্ধকালীন সময়ে সুভাষচন্দ্র বসুর রণকৌশল নিয়ে যে নৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, তা বিস্তারিত জানতে দেখুন—রোমেন হেইস, সুভাষচন্দ্র বসু ইন নাৎসি জার্মানি: পলিটিক্স, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা ১৯৪১-৪৩ (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১১)।
-
১৯৩৯ সালের কংগ্রেসের ভেতরের সংকট এবং বসু, গান্ধী, প্যাটেল, পন্থ, প্রসাদ ও নেহেরুর পারস্পরিক রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে জানতে দেখুন—লিওনার্ড এ. গর্ডন, ব্রাদার্স এগেইন্সট দ্য রাজ (কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯০), এবং সুগত বসু, হিজ ম্যাজেস্টিস অপোনেন্ট (হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১১)।
-
বি. আর. আম্বেদকর, অ্যানিহিলেশন অফ কাস্ট, ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর: রাইটিংস অ্যান্ড স্পিচেস, খণ্ড ১; এবং ‘আই ইল্ড টু নান ইন মাই ডিজায়ার ফর দ্য ফ্রিডম অফ দিস কান্ট্রি,’ জুলাই ১৯৪২, ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর: রাইটিংস অ্যান্ড স্পিচেস, খণ্ড ১৭, পার্ট ৩।




আলোচনা 4 মন্তব্য