বহুসংকট

ভোটাধিকার আর অবরুদ্ধ প্রজাতন্ত্র

WhatsApp X Facebook

২০২৬ সালের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন, অর্থাৎ SIR, পশ্চিমবঙ্গের বুকে এমন এক প্রশাসনিক বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে, যার অভিঘাত কেবল ভোটারতালিকার সংশোধনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা এসে আঘাত করেছে গণতন্ত্রের অন্তঃকরণে। ভোটাধিকার, যা একদা নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃত ছিল, তাকে ধীরে ধীরে এক অনিশ্চিত, শর্তসাপেক্ষ, প্রায় ভিক্ষিত সুবিধায় পরিণত করা হচ্ছে। ৯১ লক্ষেরও বেশি নাম মুছে ফেলা হয়েছে, ১.২৫ কোটিরও বেশি রেকর্ডকে সন্দেহের চিহ্নে দগ্ধ করা হয়েছে। এই বিশৃঙ্খলা কোনো আকস্মিক প্রশাসনিক ভ্রান্তি নয়; এটি নির্মিত, পরিচালিত, উদ্দেশ্যমূলক। যেন রাষ্ট্র নিজেই নিজের বিরুদ্ধে হাতিয়ার নিয়ে নেমেছে এক আদর্শগত শুদ্ধিকরণ অভিযানে। প্রমাণের ভার উল্টে দিয়ে সে আজ তারই নাগরিককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। বৃদ্ধ, দরিদ্র, প্রান্তিক, বঞ্চিত—যারা রাষ্ট্রের আশ্রয়প্রার্থী নয়, বরং রাষ্ট্রেরই স্বীকৃত অধিকারভোগী—তাদের আজ বাধ্য করা হচ্ছে সেই পরিচয় প্রমাণ করতে, যা ছিল তাদের জন্মগত প্রাপ্য। “নির্বাচনী বিশুদ্ধতা”-র মুখোশের আড়ালে তাই ভেসে উঠছে অন্য এক মুখ—ব্যাপক ভোটাধিকারহরণের, এবং ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের আত্মাকে নতুন ছাঁচে ঢালার এক বিপজ্জনক অভিসন্ধি।

এই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার জন্য আমাদের ফিরতে হবে প্রজাতন্ত্রের সূচনালগ্নে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারত কেবল নতুন সংবিধান কার্যকর করেনি; সে এক সাহসী নৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা শুরু করেছিল—সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তির পরীক্ষা। ১৯৩১ সালের করাচি অধিবেশনেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে রাজনৈতিক সমতা ও সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছিল। নেহরু সেই স্বপ্নকে প্রতিষ্ঠান দিয়েছিলেন, আর ড. বি. আর. আম্বেডকর তাকে দিয়েছিলেন তার নৈতিক ও আইনি অস্থিমজ্জা। রাষ্ট্রের ধারণা ছিল স্পষ্ট: সব ধর্মের প্রতি সমদূরত্ব, সমাজের সব স্তরকে জাতীয় জীবনে অংশীদার করা, আর নাগরিকত্বকে কোনো বিশেষাধিকারের ফল না বানিয়ে জন্মগত মর্যাদার স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ঔপনিবেশিক শাসনের বৈষম্যমূলক রাজনীতির বিপরীতে এ ছিল এক দুর্দান্ত ঐতিহাসিক বাঁক। গভীর অসমতার ভিতর থেকেও ভারত ঘোষণা করেছিল—এই প্রজাতন্ত্রে সকল প্রাপ্তবয়স্কের ভোট সমান।

কিন্তু ২০২৬-এ এসে সেই ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির সামনে দাঁড়িয়েছে এক বাছাই-করা প্রশাসনিক যন্ত্র, যার প্রকৃতিই হলো বর্জনকারী, অন্তর্ভুক্তি নয়। গত কয়েক বছরে বিজেপি যে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিয়েছে, তা আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে পড়লে ভুল হবে; এগুলি মিলে গড়ে উঠেছে গণতন্ত্রের কাঠামোকে ভিতর থেকে ক্ষয় করার এক পরিকল্পিত রূপরেখা। একে কেরানির ভুল, সফটওয়্যারের ত্রুটি, বা স্রেফ প্রশাসনিক অদক্ষতা বলে রেহাই দেওয়া যায় না। এটি একটি শীতল রাজনৈতিক প্রকল্প—ভারতীয় জনতা পার্টির হাতে বাস্তবায়িত, এবং যার সুদীর্ঘ আদর্শিক রেখাচিত্র টেনে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পাস হওয়া বিভিন্ন আইন, প্রশাসনিক কৌশল, এবং সাংবিধানিক চেতনার বিরুদ্ধে নানা পরোক্ষ আঘাত, সব মিলিয়ে যেন এক বৃহৎ উদ্দেশ্যের দিকে ইঙ্গিত করে: ভারতকে তার ধর্মনিরপেক্ষ আত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাষ্ট্র হিসাবে রূপান্তর করা। সেখানে নাগরিকের সমতা নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আধিপত্যই হয়ে ওঠে রাজনীতির মূল তন্ত্র।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি ধরা পড়ে সেখানে, যেখানে “আইনের শাসন” সরে গিয়ে জায়গা করে দেয় “পরিচয়ের শাসন”-কে। সংবিধান যদি রাষ্ট্রের কাছে আর পবিত্র সীমারেখা না থেকে কেবল অতিক্রম্য বাধা হয়ে ওঠে, তবে “ভারত” নামক ধারণাটিও সংকটে পড়ে। কারণ ভারত কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; এটি বহু পরিচয়, বহু বিশ্বাস, বহু ভাষা, বহু স্মৃতির সহাবস্থানের নৈতিক নাম। যখন নাগরিকত্বকে ধর্ম, বর্ণ, বংশপরিচয়, বা পূর্বপুরুষের নথিপত্রের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়, তখন সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের ভিতেই ফাটল ধরে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন নিজের দেশেই নিজেকে অনধিকারপ্রাপ্ত, অবাঞ্ছিত, প্রায় অনুপ্রবেশকারীর মতো অনুভব করতে শুরু করে। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল সংখ্যালঘু বা প্রান্তিকের ক্ষতি করে না; এটি সমগ্র জাতির অভ্যন্তরীণ স্থিতি নাড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্র তখন আর উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হয় না; সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের নাগরিকদের পর্যবেক্ষণ, সন্দেহ, ছাঁকনি ও শাস্তির মধ্য দিয়ে পরিচালনা করতে।

এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে এক গভীর, এবং বলতেই হয়, বেআইনি নীতিগত ওলটপালট। ইতিহাসগতভাবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল প্রত্যেক যোগ্য নাগরিক যেন ভোটারতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ নাগরিকের অধিকারের ভার ছিল রাষ্ট্রের ওপর। কিন্তু আজ সেই যুক্তিকেই নিষ্ঠুরভাবে উল্টে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র নিজের জবাবদিহি ঝেড়ে ফেলেছে; এখন নাগরিককেই নিজের বৈধতার সাক্ষ্য বহন করতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে—তোমার ভোটাধিকার স্বতঃসিদ্ধ নয়, তোমাকেই তা প্রমাণ করতে হবে। বহু দশকের পারিবারিক নথি, পূর্বপুরুষের পরিচয়ের প্রমাণ, জমির দাগ, বংশসূত্র—সবকিছু টেনে আনতে হবে, যেন সে আদালতের অভিযুক্ত, আর রাষ্ট্র তার অভিভাবক নয়, প্রসিকিউটর। নাগরিকত্ব এখানে আর অধিকার নয়; বরং শর্তপূরণ সাপেক্ষে প্রাপ্ত এক অনিশ্চিত স্বীকৃতি।

এই প্রশাসনিক আগ্রাসনের চূড়ান্ত রূপই ২০২৬ সালের SIR। বহু কর্মী ও পর্যবেক্ষক ইতিমধ্যেই একে দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম ভোটাধিকারহরণের প্রয়াস বলে আখ্যা দিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ১.২৫ কোটিরও বেশি ভোটার-রেকর্ড প্রথমে অসঙ্গতির অভিযোগে চিহ্নিত করা হয়, এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়ে। বিহারে এই প্রক্রিয়া একটি পরীক্ষামূলক পূর্বাভ্যাস হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, অনেকের মতে, বিহার ছিল কেবল মহড়া—পশ্চিমবঙ্গই ছিল আসল ময়দান। বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, যেখানে বিজেপি নিজের রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে নিশ্চিত নয়, সেইসব রাজ্যের নির্বাচনী গুরুত্ব কমানোর জন্যই SIR-কে ব্যবহার করা হচ্ছে।  অনেকে এটিকে বিতর্কিত NRC CAA-র পরোক্ষ ভাবে পেছনের দরজা দিয়ে অবৈধ প্রবেশ” বলেই দেখছেন।

file_0000000075c071fa9a64bd4b0146a04e

এই “আসল খেলা”-র মানবিক দিকটি সবচেয়ে নির্মমভাবে ধরা পড়ে সেইসব মুখে, যাদের আজ নিজেদের মাটিতেই সন্দেহভাজন হতে হচ্ছে। মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ২৪ পরগনার মতো মুসলিম-অধ্যুষিত জেলায় “under adjudication” নোটিসের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে এক বিশেষ প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে শুধু সাম্প্রদায়িক হিসাবেই পড়লে তার বিস্তার ধরা পড়বে না। এটি আরও বৃহত্তর অর্থে প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে এক পদ্ধতিগত আক্রমণ। মতুয়া সম্প্রদায়ের উদাহরণই যথেষ্ট—যারা দীর্ঘদিন সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির জন্য সংগ্রাম করেছেন, তারাই আজ সেই রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের নিশানায়, যাকে একদিন তাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। উদ্বাস্তু ও দলিত সম্প্রদায়ের জীবনে পূর্বপুরুষের জমির নথি, বা তথাকথিত “পিতৃসূত্র”, বহু ক্ষেত্রেই নেই—এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকেই রাষ্ট্র অস্ত্রে পরিণত করেছে। ফলে যাদের কণ্ঠ ছিলই ক্ষীণ, তাদের আরও নিঃশব্দ করে দেওয়ার অবকাঠামো প্রস্তুত হয়েছে।

এই ব্যাপক লক্ষ্যভেদ আসলে SIR-এর গভীর আদর্শগত ক্ষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে: এক প্রতিক্রিয়াশীল মনুবাদ (মনুবাদী শ্রেণিবিন্যাস)। সমালোচকেরা বলছেন, আরএসএস-সমর্থিত হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন আসলে আম্বেদকরের সমতাভিত্তিক সংবিধানকে বদলে দিয়ে এমন এক স্তরভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শূদ্র, দলিত, মহিলা, ভূমিহীন, উদ্বাস্তু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র—সর্বজনীন ভোটাধিকার—থেকে বঞ্চিত করা যায়। নাগরিকদের “সন্দেহভাজন” হিসেবে চিহ্নিত করে শাসকগোষ্ঠী আসলে এমন এক শ্রেণিবিন্যাসমূলক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যা গণতান্ত্রিক সমতার বদলে বিশেষ সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়।

এই বিশৃঙ্খলা যে ইচ্ছাকৃত সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তা এমন রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয় যেখানে শাসক দল ইতিমধ্যেই নিরাপদ অবস্থানে আছে। আসামে একই ধরনের SIR-এর ফলে ১০.৫৬ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল মূলত মৃত্যু বা স্থানান্তরের মতো স্বাভাবিক কারণে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন যেন স্বাভাবিক বর্জনকে যথেষ্ট মনে করেনি বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি করেছে সফটওয়্যার-উৎপাদিত তথাকথিত “logical discrepancies” বা “যুক্তিগত অসঙ্গতি”-কে যা ব্যবহার করা হয়েছে বিরোধী দলের বিশ্বস্ত ভোটারদের গণহারে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে—একটি পূর্বপরিকল্পিত আঘাত, যার লক্ষ্য নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়া। এই দ্বিমুখী মানদণ্ড প্রমাণ করে যে SIR আসলে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক।

এই বিকৃত নকশার সবচেয়ে নির্মম অভিঘাত এসে পড়েছে নারীদের এবং প্রবীণদের ওপর। বিবাহের পর বহু নারী যেহেতু অন্য গ্রামে, অন্য জেলায়, অন্য পরিবারে গিয়েছেন, তাদের পক্ষে বহু দশকের পুরনো তথাকথিত “পিতৃসূত্র” বা উত্তরাধিকারী দলিল হাজির করা প্রায় অসম্ভব। ফলে তাদের নাম বাদ পড়ার হার পুরুষদের তুলনায় ৭.১ শতাংশ বেশি বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রবীণ নাগরিকদের প্রতিও এই ব্যবস্থার নির্দয়তা কম নয়। কার্গিলযুদ্ধের প্রাক্তন সেনা, বহু সম্মানপ্রাপ্ত যোদ্ধা, এমনকি একসময় নিজে নির্বাচন পরিচালনা করা মানুষকেও আজ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের ভোটার-পরিচয় রক্ষা করতে হচ্ছে। রেজানুল করিম তরফদারের মতো মানুষদের ক্লান্ত, অপমানকর সারিতে দাঁড় করিয়ে রাষ্ট্র যেন নিজেরই স্মৃতিকে অপমান করছে। যে মানুষরা এই দেশের জন্য জীবনপাত করেছেন, তাদের বার্ধক্যে গিয়ে জানানো হচ্ছে—আপনারা আর “বৈধ” নন। কোনো সফটওয়্যার-ত্রুটি এই নিষ্ঠুরতার ব্যাখ্যা হতে পারে না।

1776139067713~2

CAA NRC-র পারস্পরিক সম্পর্ক এই সংকটকে আরও গাঢ় করে তোলে। এখানে NRC যদি হয় ছাঁকনি, তবে CAA হয়ে ওঠে নিরাপত্তাজাল—কিন্তু তা সকলের জন্য নয়, অ-মুসলিমদের জন্য। ফলে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য তৈরি হয় এক বিশেষ, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তাহীনতা। নন্দীগ্রামের মতো এলাকায় যেখানে মুছে ফেলা নামের ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত মুসলিম বলে অভিযোগ উঠেছে, সেখানে ঘটনাটি আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ বলে মনে হয় না; বরং তা এক রকমের লক্ষ্যভেদী বর্জন নীতিরই চিত্র হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রতিরোধও তীব্র হয়েছে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস, রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে, SIR-এর বিরুদ্ধে জন-আন্দোলন ও আইনি আপত্তির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিষয়টিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের আশঙ্কাকে দৃশ্যমান করেছে। সংশয়বাদীরা একে তাঁর নিজস্ব নির্বাচনী ঘাঁটি রক্ষার মরিয়া প্রচেষ্টা বলে দেখতে পারেন; কিন্তু তাতেও এই সত্য বদলায় না যে তৃণমূলের আওয়াজ SIR-এর সম্ভাব্য নির্বাচনী কারসাজিকে দেশজুড়ে আলোচ্য করেছে। একই সময়ে বামফ্রন্টও একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবাদের ভাষা নির্মাণ করেছে। CPI(M)-এর সাধারণ সম্পাদক এম. এ. বেবি ৯ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লেখা চিঠিতে “উদ্বেগ, গভীর চিন্তা ও তীব্র প্রতিবাদ” জানিয়ে SIR-কে “ব্যাপক ভোটাধিকারহরণের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া” বলে বর্ণনা করেন।

কিন্তু এই সমগ্র সংকটকালে দেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা গভীর অস্বস্তির জন্ম দেয়। সুপ্রিম কোর্ট তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিলেও, বাস্তবে যাদের নাম বাদ পড়েছে—প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ—তাদের কার্যত জানিয়ে দিয়েছে যে, “এইবার হয়তো আপনারা ভোট দিতে পারবেন না।” আদালত আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রশাসনিক পরিকাঠামো নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে, কিন্তু আপিলের বিষয়টি—অর্থাৎ ভোটাধিকারহরণ—তাকে তার প্রকৃত নৈতিক ও রাজনৈতিক নামে ডাকার সাহস দেখায়নি। এই নীরবতা, এই এড়িয়ে চলা, এই অর্ধস্বীকৃতি—সব মিলিয়ে তা সংকটের অন্ধকারকে আরও গভীর করে তুলেছে।

SIR ২০২৬-এর রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ আমাদের এক অনিবার্য সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করায়। এই সমগ্র প্রক্রিয়া “নির্বাচনী বিশুদ্ধতা”-র কোনো আন্তরিক প্রয়াস নয়; এটি এক বিরাট প্রদর্শন, এক মুখোশ, যার আড়ালে স্বৈরতন্ত্র নিজের মুখ লুকিয়ে রেখেছে। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট—ব্যাপক ভোটাধিকারহরণের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার স্থায়ী অধিগ্রহণ, এবং সেই পথ ধরে এক অ-ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তি সুদৃঢ় করা। প্রজাতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে হলে নাগরিকদের এই খেলার গুটি/মোহরা হতে অস্বীকার করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে শাসকদলের নয়, আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। প্রত্যেক ভারতীয়কে জন্মগত অধিকারেই নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। কারণ এই অপহরণকে যদি আমরা চিনতে না পারি, তবে সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র খুব শিগগিরই শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে, আর তার স্থান নেবে এক সাম্প্রদায়িক ছাঁচে গড়া রাষ্ট্র। সেটাই হবে ১৯৫০-এর প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা, এবং ২০২৬-এর অন্ধকারতম দলিল।

মন্তব্য

উত্তর দিচ্ছেন
Naresh Mishra 15/04/2026 16:35
​This is a very deep and scary look at what is happening in West Bengal. It seems like "cleaning the lists" is just an excuse to silence certain voters. If we aren't careful, the freedom our leaders fought for in 1950 will be gone.
Anuj Jain 15/04/2026 16:59
Very powerfull tone and perfectly analyzed. This whole process feels less like a simple mistake and more like a plan to take away people's right to vote. When the poor and marginalized are forced to struggle just to prove who they are, the heart of our democracy is in trouble.
অনিমেশ ভদ্র 15/04/2026 17:21
ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যেভাবে সাধারণ মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তা সত্যিই আমাদের দেশের ভবিষ্যতের জন্য খুব আশঙ্কার বিষয়!
Joydeep Chakraborty 15/04/2026 21:30
The editorial lacks ground realities of SIR in a border state like West Bengal and totally provided an illusion of a perfect state where no illigal migration has taken place under political sponsership after 1971or 1947. The real picture we have seen on TV and social media is a exodus of people either to Bangladesh or to the other states of India where SIR is not happening now. Who are these people? If they are citizens of India why they are living? Coming to state West Bengal SIR ,from the very first day the TMC was against the process and wanted to follow the 2002 voter list and instructed BLO,ARO's to create a shit out of documents so that the ECI and Supreme Court are not able to separate the legal and illigal voters and orders voting on the old list so that all the dead men and women could walk in to cast there votes without meeting there near and dear ones of there family. With West Bengal 10 other states and Union territories also has SIR which is completed in time without any court intervention there also we have seen exclusion and its a big propaganda that Muslims are excluded intentionally,if one goes through the exclusive the number of Hindus are more than Muslims in all the states even in West Bengal because it's natural as we a Hindu majority population. Intention of West Bengal government was very clear even in Supreme Court which leads to Judicial officer intervention and formation of Tribunal which will further delay the matter and will be even very strict as judges will go by authentic documents only to prove citizenship.One thing has to be noticed that the districts where we see more exclusion are the bordering districts with Bangladesh where obviously infiltration has taken place and Aadhar,Pan has been made by local authorities under the influence of the ruling party. India cannot be a "Dharamshala" for everyone where migrants will feed the food provided for it's citizens. Muslims has got 52 countries what is wrong if we ask for a Hindu country? If all citizens are equal why we need to protect the minorities with special laws and reservations? Partition has taken place on the basis of religion not geographically in India because Muslims are not feeling safe to stay with Hindus so a separate country is formed if they have not gone the problem is with them not the Hindus who have migrated both from East Pakistan and Pakistan to India in a single cloth.SIR should happen every year in our country and illegal immigrants should be pushed back to their original country. India belongs to Indians from heart not for pseudo Indians the concept needs to change drastically.