কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ: ভারতের প্রথম আন্তঃসংযোগ প্রকল্প এবং তার বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি
বুন্দেলখণ্ড হল মধ্যপ্রদেশ আর উত্তরপ্রদেশের মাঝে এমন এক মালভূমি যা কিনা খরার দেশ, কৃষকেদের আত্মহত্যার দেশ। তথ্য বলছে ২০০০ সাল থেকে পনেরোটি বর্ষা ব্যর্থ হয়েছে এই অঞ্চলে। ফসল মরেছে, মানুষ শহরে পালিয়েছে, মাঠ ফেটে গেছে। এই যন্ত্রণার উত্তর হিসেবে ভারত সরকার এনেছে কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্প — সংক্ষেপে KBLP। মধ্যপ্রদেশের কেন নদীর ‘উদ্বৃত্ত’ জল টেনে উত্তরপ্রদেশের বেতোয়া নদীতে ঢালা হবে। ১৯৯৫ সালে এ ব্যাপারে প্রথম ভাবা হয় যা কিনা ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায় এবং এর জন্য ৪৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার অনুমোদন করা হয় [Rau’s IAS, 2024; PWOnlyIAS, 2024]। ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর খাজুরাহোয় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যা কিনা ভারতের প্রথম আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, এবং ভবিষ্যতে আরও ত্রিশটি এমন সংযোগের নমুনা হিসেবে একে ব্যবহার করা হবে [Rau’s IAS, 2024]। সফল হলে এটি হবে একটি ইতিহাস। আর যদি ব্যর্থ হয় তাহলে সেই ব্যর্থতার দাম দেবে বন, বাঘ, আর যাদের জন্য এই প্রকল্প বলা হচ্ছে — সেই আদিবাসী মানুষেরা।
প্রকল্পটির যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে সহজ: মধ্যপ্রদেশের কেন নদীতে ‘অতিরিক্ত’ জল আছে; উত্তরপ্রদেশে প্রবাহিত বেতওয়ায় নেই। এজন্য পান্না টাইগার রিজার্ভের ভেতরে ৭৭ মিটার উঁচু দৌধন বাঁধ তৈরি হবে, আর ২২১ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল সেই জলকে বেতওয়া অববাহিকায় পৌঁছে দেবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী সুফলও বড়: দশটি জেলায় ১০.৬২ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ, ৬২ লক্ষ মানুষের জন্য পানীয় জল, আর ১০৩–১৩০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ—যা ২০৩৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা [NextIAS, 2025; Down to Earth, 2024]।

যে উদ্বৃত্ত আসলে নেই
প্রকল্পের যুক্তিটা সহজ: কেন নদীতে জল বেশি, বেতোয়ায় কম — তাই এর থেকে ওকে একটু জল সরিয়ে দাও। কিন্তু এই ‘সহজ’ যুক্তির গোড়াতেই প্রশ্ন উঠছে।
হিমাংশু ঠাক্কর — দক্ষিণ এশিয়া নদী ও বাঁধ নেটওয়ার্কের (SANDRP) প্রধান, এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রাক্তন সদস্য —স্পষ্ট কথায় বলছেন যে: “এই প্রকল্পের কোনো ন্যায্যতা নেই, এমনকি জলবিজ্ঞানের দিক থেকেও নয়। কেন নদীতে উদ্বৃত্ত জল আছে — এই দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই” [SANDRP, 2024]। আরও অবাক করার বিষয় হলো, কমিটির বৈঠকে তিনি যখন জলবিজ্ঞানের তথ্য চাইলেন, তাঁকে বলা হলো — কেন নদী গঙ্গা অববাহিকার অংশ, তাই এর প্রবাহের তথ্য ‘রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় কারী তথ্য’এবং তা কমিটির সদস্যকেও দেওয়া যাবে না [Dialogue Earth / The Third Pole, 2024]।
পিপলস সায়েন্স ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা রবি চোপড়া আরেকটা সহজ কথা বলেছেন: কেন আর বেতোয়া পাশাপাশি নদী। একই আকাশের নিচে, একই বৃষ্টির উপর এরা নির্ভরশীল। একটায় খরা হলে অন্যটাতেও হয়। তাহলে একটাকে ‘উদ্বৃত্ত’ আর অন্যটাকে ‘ঘাটতি’ বলার মানে কী? [Countercurrents, 2024]। পান্নার প্রাক্তন জেলাশাসক নিজে দাপ্তরিক চিঠিতে লিখেছিলেন: কেন নদীতে যে জল দেখা যাচ্ছে, তার কারণ উপরের অববাহিকায় এখনও জলসেচের বড় পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। প্রকল্প চালু হলে সেই এলাকা চিরকালের জন্য পিছিয়ে থাকবে [SANDRP, 2017]।
কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন সচিব শশী শেখর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে একটি খোলামেলা আলোচনায় বলেছেন: “তথ্য কারচুপি করে এই প্রকল্পকে ন্যায্য দেখানো হয়েছে। সঠিক তথ্য দিয়ে বিচার করলে এই প্রকল্প কখনোই ছাড়পত্র পেত না” । তিনি আরও বলেছেন, দশ লক্ষ হেক্টরের বেশি জমিতে সেচের যে দাবি করা হচ্ছে, সেটা “শূন্য থেকে বের করা সংখ্যা”। আর বিকল্প ব্যবস্থার কথা কি ভাবা হয়েছিল? তাঁর উত্তর: “আমার জানামতে, বিকল্প নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি” [SANDRP, 2025]। সবচেয়ে তীক্ষ্ণ কথাটা হয়তো ঠাক্কর নিজেই বলেছেন — প্রকল্পের নিজস্ব ‘বিশদ প্রকল্প প্রতিবেদন’-এ লেখা আছে, এর মূল উদ্দেশ্য বুন্দেলখণ্ড নয়, বরং মধ্যপ্রদেশের বিদিশা আর রায়সেন জেলায় জল পৌঁছানো — যেগুলো বুন্দেলখণ্ডের অংশই নয়। তাহলে বুন্দেলখণ্ডের নাম করে প্রকল্প বেচা হচ্ছে কাদের জন্য? [IndiaSpend, 2021]।

পান্না: যে সাফল্যের গল্প এখন বিপন্ন
জলবিজ্ঞান বিতর্কিত। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে বিতর্ক নেই — সেটা নিশ্চিত। দৌধন বাঁধের জলাধার পান্না বাঘ সংরক্ষণ এলাকার মূল অঞ্চলের দশ শতাংশেরও বেশি — ছয় হাজার হেক্টরেরও বেশি বন — ডুবিয়ে দেবে [Anantam IAS, 2025]। এই পান্নাই সেই অভয়ারণ্য যেখানে ২০০৯ সালে একটিও বাঘ ছিল না। সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তারপর শুরু হয় পুনঃপ্রবর্তন কর্মসূচি — আজ সেখানে শাবকসহ পঁয়ষট্টি থেকে নব্বইটি বাঘ আছে [The Wildlife India, 2021; BusinessToday, 2024]। পৃথিবীর বাঘ সংরক্ষণের ইতিহাসে এই পুনরুজ্জীবন একটা বিরল সাফল্য। সেই সাফল্যকে এখন ডুবিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে।
কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশ যেদিন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলো, সেদিনই বললেন: শুধু বাঘ নয় — শকুনের বাসস্থান, ঘড়িয়ালের নদী, চারশোরও বেশি প্রজাতির গাছপালা — সব যাবে এবং তেইশ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটা পড়বে [BusinessToday, 2024]। ২০২৫ সালের মার্চে যখন বাঁধ নির্মাণের রাস্তা কাটতে পান্নার মূল অঞ্চলে পনেরো হেক্টর বন সাফ হলো, তখনই হরিণ আর সম্বর উত্তরে সরে যেতে শুরু করল। বানর আর পাখি ছেড়ে গেল পুরোনো জায়গা [Drishti IAS, 2025]। জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ (NTCA) নিজেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি মধ্যপ্রদেশ সরকার চুপচাপ পরিকল্পনা করছে পান্না থেকে বাঘ সরিয়ে সার্ভাঙ্গা আর পারসামানিয়া নামে নতুন দুটি সংরক্ষণ এলাকায় পাঠাতে । কিন্তু সেই এলাকাগুলো এখনও তৈরি নয়, যেখানে বন্যপ্রাণীদের শিকারের পরিবেশ নেই। তাছাড়া সেখানকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথেও আলোচনা এখনো শেষ হয়নি [Prakriti Darshan, 2025]। বাঘ অত্যন্ত এলাকাভিত্তিক প্রাণী — নতুন জায়গায় গেলে সংঘাত হবে, প্রজনন ব্যাহত হবে। সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা জিজ্ঞেস করছেন: বাঁধের রেখা একটু সরিয়ে দিলেই তো অভয়ারণ্য বাঁচত — সেই সম্ভাবনা কি একবারও ভাবা হয়েছিল? উত্তর: না [Prakriti Darshan, 2025]।

প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) — যে নথির এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কথা ছিল — সেটি ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে। SANDRP-এর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেই রিপোর্টে ভারতে পাওয়া যায় না এমন প্রজাতির প্যাঙ্গোলিনের উল্লেখ আছে। সংরক্ষিত বনে নৌকাবিহার আর পিকনিকের কথা বলা হয়েছে — যা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ৩০ জন বিশেষজ্ঞ ও প্রাক্তন আমলার সই করা একটি চিঠিতে —যার মধ্যে একজন প্রাক্তন বন পরামর্শ কমিটির সদস্য এবং একজন প্রাক্তন জলসম্পদ সচিবও ছিলেন—EIA-কে বর্ণনা করেছে “গোড়া থেকেই ত্রুটিপূর্ণ, ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিমূলক ও অপর্যাপ্ত প্রভাব মূল্যায়ন, প্রক্রিয়াগত লঙ্ঘন এবং প্রতিটি ধাপে ভুল তথ্য দ্বারা জর্জরিত” [SANDRP; Countercurrents, 2024]।
উচ্ছেদ ও প্রতিরোধ
যাদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা সবচেয়ে কম, মানবিক মূল্যের দায় প্রায় সম্পূর্ণভাবে পড়ছে তাদের ওপর। এর ফলে চব্বিশটি গ্রাম সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর তার মধ্যে আটটি সম্পূর্ণ ডুবে যাবে। অনুমান অনুযায়ী পাঁচ থেকে দশ হাজার গোণ্ড, কোল আর সাহারিয়া আদিবাসী পরিবার উচ্ছেদের মুখে — যাদের জীবিকা নির্ভর করে মহুয়া ফুল, তেন্ডু পাতা, নদীর মাছ ধরা এবং বনজ সম্পদের ওপর তা কোনো পুনর্বাসন কলোনিতে স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। [NewsGram, 2026; TwoCircles, 2025]

২০২৩ সালে আবেদন ও আপত্তি দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ সমকালীন ভারতের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী নাগরিক প্রতিরোধে পরিণত হয়েছে। শত শত আদিবাসী নারী ‘পঞ্চতত্ত্ব আন্দোলন’— এ অংশ নিয়ে জল, মাটি, বায়ু, আগুন, আকাশের সাথে নিজেদের অচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা জানান দিতে —পবিত্র পাঁচ উপাদানকে আহ্বান জানিয়ে কেন নদীতে বুকসমান জলে দাঁড়িয়েছেন। একই সময়ে আদিবাসী পরিবারগুলো ‘চিতা আন্দোলন’-এ অংশ নিয়ে প্রতীকী চিতায় শুয়ে পড়েছেন নির্মাণযন্ত্রের সামনে, যার নেতৃত্বে ছিলেন জয় কৃষাণ সংঘঠনের কর্মী অমিত ভাটনাগর [ANI, 2026; Free Press Journal, 2026]। উচ্ছেদ আর মৃত্যু তাঁদের কাছে একই কথা। টানা এগারো দিনের প্রতিবাদ শেষে, যখন ছতরপুরে প্রখর রোদে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, তখনও কোনো সরকারি কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাননি।
তাদের দাবি স্পষ্ট এবং সাংবিধানিক: ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, বনাধিকার আইনের অধীনে প্রয়োজনীয় প্রকৃত গ্রাম সভার সম্মতি, এবং প্রকল্পের আইনি ও জলবিদ্যাগত ভিত্তির স্বাধীন পর্যালোচনা। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট বনাধিকার সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক রায় দিয়েছে, যা প্রকল্পের কর্তৃপক্ষ এখনও বাস্তবায়ন করেনি [Down to Earth, 2026]। জাতীয় গ্রীন ট্রাইব্যুনাল (NGT) ২০১৭ সালে SANDRP-এর পরিবেশগত ছাড়পত্র চ্যালেঞ্জ করে দাখিল করা আবেদন গ্রহণ করেছিল; এটি এখনও মুলতুবি রয়েছে [IndiaSpend, 2021]।

বুন্দেলখণ্ডের আসল দরকার কী?
বিকল্পের কোনো অভাব নেই—অভাব আছে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার। বুন্দেলখণ্ডের ঐতিহ্যবাহী জলব্যবস্থা—জোহাড় (মাটির বাঁধ), ধাপ কেটে তৈরী করা কূপ এবং জলাধার নেটওয়ার্ক—একসময় আরও ভয়াবহ খরার মধ্যেও অঞ্চলকে টিকিয়ে রেখেছিল। শুধু টিকমগড় জেলাতেই চার দশক আগে প্রায় এক হাজার পুকুর ছিল [SANDRP, 2024]। জলাধার পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং মাটির স্বাস্থ্য কর্মসূচি বিশাল প্রকৌশল প্রকল্পের খরচের দশ ভাগের এক ভাগ খরচে জল নিরাপত্তা দিতে পারে— কোনো উচ্ছেদ ছাড়া, বন ধ্বংস ছাড়া, এবং বিতর্কিত জলবিদ্যার ওপর নির্ভর করে বাঘ সংরক্ষণ এলাকা বাজি না রেখে [Drishti IAS, 2019]।
কেন-বেতওয়া প্রকল্প তৈরি হবে—অথবা হবে না। কিন্তু যেসব মানুষ সেই নদীতে বুকসমান জলে দাঁড়িয়ে আছেন, যা তাদের অস্তিত্বকে হুমকি দিচ্ছে, তারা ইতিমধ্যেই সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন—যে প্রশ্ন প্রকল্পের স্থপতিরা কখনোই গুরুত্ব দিয়ে জিজ্ঞেস করেননি: এই জল কার, আর এই ভবিষ্যৎ কার সেবায় নিয়োজিত?
মন্তব্য