ভারতে একের পর এক নির্বাচনে বুথফেরত সমীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির অভ্যাস বদলায় না —তাদের ভবিষ্যৎবাণী মিলে গেলে অলৌকিক সাফল্যের দাবি করে, আর ভুল হলে নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে যায়। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন এর চেয়েও গভীর এক অস্বস্তিকর সংকটের দিক উন্মোচন করেছে। সমস্যাটা শুধু ভুল পূর্বাভাসের নয়। বরং এমন এক ব্যবস্থার যেখানে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলো নীরব হয়ে যায়, আর নবাগতরা আত্মবিশ্বাসের সাথে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে, অথচ কাউকেই কখনও কারো কাছেই কোনো জবাবদিহি করতে হয় না।

একটা পুরোনো প্রবাদ আছে যে ঝড়ে বক মরে আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে। ভারতের বুথফেরত সমীক্ষার ক্ষেত্রে এর চেয়ে জুতসই রূপক আর হয় না। প্রতিটি নির্বাচনী চক্রে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে— প্রতিটি বিশ্লেষণকারী সংস্থাই প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে কোন এক পক্ষকে বিজয়ী ঘোষণা করে। যদি তারা সঠিক হয়, তবে দূরদর্শিতার দাবি করে; আর যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তবে তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। ইতিহাস এমন অসংখ্য 'অলৌকিক ঘটনা' এবং উধাও হয়ে যাওয়ার সাক্ষী।
২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বহু নামী সংবাদমাধ্যম একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কেউ বিজেপি-কে এগিয়ে রেখেছিল, আবার কেউ তাদের আসন সংখ্যা ১০০-১২০-এর ঘরে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। অথচ সেই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছিল ২১৩টিরও বেশি আসনে। সংস্থাগুলো কেবল জয়ের ব্যবধান নয়, বরং জনমত বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। কোনো কর্মপদ্ধতি প্রকাশ করা হয়নি, কোনো ভুল স্বীকার করা হয়নি; আলোচনার টেবিল থেকে সেই পরিসংখ্যানগুলো স্রেফ হাওয়া হয়ে গিয়েছিল।
২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন এই কাহিনিতে এক নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় যোগ করেছে। ভারতের দুই প্রতিষ্ঠিত সমীক্ষা সংস্থা—সি-ভোটার এবং অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া—পশ্চিমবঙ্গের জন্য কোনো বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করেনি। অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার প্রধান প্রদীপ গুপ্ত স্বীকার করেছেন যে, ভোটাররা তাদের পছন্দের কথা জানাতে অনিচ্ছুক ছিলেন, যার ফলে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, সি-ভোটার তাদের নীরবতার জন্য কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যাই দেয়নি।
এই শূন্যস্থানে ঢুকে পড়ে ম্যাট্রিজ, পিপলস পালস, পোল ডায়েরি এবং জনমত পোলসের মতো একঝাঁক অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত সংস্থা। অভিজ্ঞ সংস্থাগুলো যেখানে পিছিয়ে গেল, সেখানে এই নবাগতরা রাজ্যের আসন ধরে ধরে আত্মবিশ্বাসের সাথে পূর্বাভাস দিতে শুরু করল। আর টেলিভিশনের পর্দা যথারীতি ভরে উঠল শুধু ব্যাখ্যাকারীর সংখ্যায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি অভিজ্ঞ সমীক্ষকরা বাংলার ভোটারদের কথা বলতে অনিচ্ছুক দেখেন, তবে এই নতুনরা কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করলেন? নাকি এই পূর্বাভাসগুলো ফিল্ডওয়ার্ক ছাড়াই অন্য কিছুর ভিত্তিতে তৈরি?
বুথফেরত সমীক্ষাগুলো নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক অন্তর্দৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে জাহির করলেও বাস্তবে তারা চলে এক ঘন কুয়াশায় ঢাকা অস্বচ্ছ পথ দিয়ে। বড় জাতীয় সংস্থাগুলো তাদের কর্মপদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক নিয়ম হিসেবে নয়, বরং ব্যবসায়িক গোপনীয়তা হিসেবে গণ্য করে। আমরা টেলিভিশনে কেবল চূড়ান্ত আসন সংখ্যা দেখি, কিন্তু আসল তথ্য—বুথ থেকে পাওয়া সরাসরি প্রতিক্রিয়াগুলো তালাবদ্ধই থেকে যায়। স্বচ্ছতাহীন বিজ্ঞান শেষ পর্যন্ত দায়বদ্ধতাহীন এক শক্তিতে পরিণত হয়।
আমাদের বলা হয়, এই সমীক্ষাগুলি 'বৈজ্ঞানিক'। অথচ যে কঠোরতা ও স্বচ্ছতার দাবি এই শব্দটি বহন করে, তার কোনওটিই বাস্তবে দৃশ্যমান নয়। স্ক্রুটিনি ছাড়া বিজ্ঞান ক্ষমতায় পরিণত হয় যার মানে দাঁড়ায় জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতা।
আমরা যা দেখছি, তা হয়তো গণতন্ত্রের পরিমাপ নয়, বরং তার এক রিহার্সাল।
সমস্যা এই নয় যে বুথফেরত সমীক্ষাগুলো মাঝেমাঝে ভুল হয় বা ভুল করতে পারে। সমস্যাটা হল এই যে, কীভাবে তারা তাদের পূর্বাভাসকে ঠিক হিসাবে দেখায় সে পদ্ধতিটাকেই আমাদের কখনও দেখতে দেওয়া হয় না। এখানে তাদের দেওয়া সরল যুক্তিটা হল: ছোট নমুনা গোটা সমষ্টিকেই প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। কিন্তু তার প্রয়োগ মোটেই অত সরল নয়। দু'লক্ষ ভোটারের একটি কেন্দ্রে হয়তো হাজারখানেক মানুষের মত নেওয়া হয়। কিন্তু এই হাজারজন কারা? কোথায় তাঁদের পাওয়া যায়? কীভাবেই বা তাঁদের বাছা হয়? এগুলি কখনো জানা যায় না, এগুলি নিছক পদ্ধতিগত প্রশ্ন নয়। এগুলিই বিজ্ঞান আর নাটকের মধ্যে ফারাক গড়ে দেয়।
দশকের পর দশক বুথফেরত সমীক্ষা চলছে। অথচ এই প্রশ্নগুলির উত্তর জনপরিসরে আজও মেলেনি। অধিকাংশ নাগরিক জীবনে কখনও এক্সিট পোল সমীক্ষকের মুখোমুখি হননি। অনেকে তো এমন কাউকেও চেনেন না যিনি হয়েছেন। যে প্রক্রিয়া জনগণের মতামত প্রতিফলিত হওয়ার দাবি করে সেটাই মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেও নেই।
বর্তমানে ভারতের কোনো বড় সংস্থা তাদের সংগৃহীত নির্ভেজাল তথ্য, জনতাত্ত্বিক গুরুত্ব বা বুথ-স্তরের নমুনার ভিত্তি প্রকাশ করে না। নির্বাচন কমিশনও কেন্দ্র-ভিত্তিক ভ্রান্তির মাত্রা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেনি। ক্ষেত্রসমীক্ষার স্বাধীন নিরীক্ষা আজও কোন কাঠামোগত বা প্রকাশ্য রূপে বিদ্যমান নয়। যাচাইযোগ্য পদ্ধতির অনুপস্থিতিতে প্রকৃত ক্ষেত্রসমীক্ষা আর অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি পূর্বাভাসের মধ্যে ফারাক করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর সেখান থেকেই উঠে আসে এক অস্বস্তিকর সম্ভাবনা যে এই সমীক্ষাগুলি কি আদৌ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে তৈরি হয়েছে নাকি অস্তিত্ববিহীন এক ভুয়ো জনগণের নমুনাকে উপস্থাপন করছে?

সমীক্ষা প্রকাশের সময় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সন্ধ্যা ৬টায় ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত এগুলো প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ঠিক সেই মুহূর্তেই টেলিভিশনের পর্দায় পূর্বাভাসের বন্যা বয়ে যায়। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই ফলাফল তৈরি থাকাটা গণতান্ত্রিক পরিমাপের চেয়ে আগে থেকে লিখে রাখা কোনো চিত্রনাট্যের মতো মনে হয়। নয়ডা বা দিল্লিতে বসে মুর্শিদাবাদের কৃষক বা কোয়েম্বাটোরের শ্রমিকের মনের খবর নেওয়াটা এক ধরনের গণতান্ত্রিক শূন্যতা তৈরি করে। অথচ মুর্শিদাবাদের কৃষক, আলপ্পুঝার মৎস্যজীবী, কোয়েম্বাটোরের মিলশ্রমিকের মেজাজ তাঁরা মাপছেন সেই একই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিস থেকে।
সমস্যাটা শুধু দূরত্বের নয়, কিন্তু দূরত্বের কারণে জবাবদিহি করার দায় কমে যায়, সেটিই প্রকৃত সংকট। যে সংস্থা কখনও কোনও কেন্দ্রে পা রাখেনি, সে যখন সেই কেন্দ্রের আসন-ধরে পূর্বাভাস প্রকাশ করে, অথচ তার ক্ষেত্র সমীক্ষা দেখাতে চায় না বা বাধ্য নয় তখন ক্ষেত্রসমীক্ষার ভৌগলিক কাঠামোতগত ফারাকের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ফারাকও তৈরি করে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় গভীরতর এক অস্বস্তি। পূর্বাভাস হয়তো আগেই তৈরি করা হয়ে রয়েছে। নির্ধারিত মুহূর্তে শুধু পর্দা সরানো হয়। আর যখন পূর্বাভাস পূর্বপরিকল্পনার মতো দেখতে লাগে তখন সেখানে বিশ্বাসের কোন স্থান থাকে না। বুথফেরত সমীক্ষা শুধু মতামত প্রতিফলিত করে না, তা মতামত গড়েও তোলে। বাজারের গতি বদলে দিয়ে সংবাদমাধ্যমের বয়ানকে নিয়ন্ত্রণ করে যা জনমানসকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সরকারি ফল ঘোষণার আগেই কারও ঘরে নেমে আসে উদ্যাপন আর কারও ঘরে আসে হতাশা। সমাজমাধ্যমের যুগে এই বিকৃতি বহুগুণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অসরকারি পূর্বাভাসগুলো বিশ্লেষণ আর কল্পনার সীমারেখা মুছে দিচ্ছে যেখানে জল্পনা ছাপিয়ে যাচ্ছে যাচাইকে। যা পরিমাপ বলে উপস্থাপিত করা হচ্ছিল তা ক্রমেই প্রভাবের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এটি তথ্যের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি নয়, বরং অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বুথফেরত সমীক্ষা বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা দাবি করলে তাদের অবশ্যই স্বচ্ছ পদ্ধতি, স্পষ্ট নমুনার ব্যবহার এবং যাচাইযোগ্য ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজ নিশ্চিত করতে হবে। নির্ভরযোগ্য প্রকাশের অর্থ হলো রঙিন গ্রাফিক্সের বাইরে গিয়ে নির্ভেজাল তথ্য প্রদান করা, নতুবা এগুলো গবেষণার চেয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের কাছাকাছি থেকে যায়।
এটি কোনো অসম্ভব মানদণ্ড নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বুথফেরত সমীক্ষা পরিচালনাকারী যৌথমঞ্চকে (কনসোর্টিয়ামগুলোকে) তাদের কর্মপদ্ধতি, নমুনায়নের যৌক্তিক ভিত্তি এবং সম্ভাব্য ত্রুটির সীমা জনসাধারণের নথির অংশ হিসেবে প্রকাশ করতে হয়। জার্মানিতে ফলাফল প্রচারের আগে নমুনায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে সমীক্ষা সংস্থাগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। যুক্তরাজ্যে বুথফেরত সমীক্ষা চালায় একটি মাত্র অনুমোদিত যৌথমঞ্চ (কনসোর্টিয়াম), যারা একটি নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় এবং পদ্ধতিগত মানদণ্ডের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র; এখানকার নাগরিকরাও অন্তত একই মানের স্বচ্ছতা পাওয়ার যোগ্য।
গণতন্ত্র আত্মবিশ্বাসী অনুমানের ওপর ভিত্তি করে শক্তিশালী হয় না, বরং শক্তিশালী হয় নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সেই উদ্দেশ্যেই তিনটি সংস্কারের দাবি তোলা প্রয়োজন:
প্রথমত, ফলাফল ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংগৃহীত নির্ভেজাল তথ্য এবং জনতাত্ত্বিক গুরুত্বের বাধ্যতামূলক প্রকাশ।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি নির্বাচন চক্রের আগে ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজের পদ্ধতির ওপর স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের অডিট বা নিরীক্ষা।
তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্র ভিত্তিক সম্ভাব্য ত্রুটির সীমা (margin-of-error) রিপোর্ট করার কঠোর নিয়ম কার্যকর করা।
চূড়ান্ত রায় কোনো সমীক্ষাকারীর হাতে নেই। এটি কেবল সেই ভোটারের প্রাপ্য যিনি লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, অথচ তাঁর ভোট গণনার আগেই তাঁর সিদ্ধান্তটি তাঁকে অন্য কেউ শুনিয়ে দিচ্ছে।
গণতন্ত্রে ফলাফল কোনো পূর্বাভাস নয়; এটি একটি হিসাব-নিকাশ।
আর এজন্যই স্বচ্ছতাবিহীন নিশ্চয়তা কোন অন্তর্দৃষ্টি নয়। তা হলো শুধুই ক্ষমতা যা কোন রকমের সম্মতি ছাড়াই দাবি করা হচ্ছে।
প্রণয় রায়, যোগেন্দ্র যাদব ইত্যাদি অনেকেই ছিলেন।
পরবর্তী কালে pre poll বন্ধ হয়ে যায়।
সেই সময় ও আজকের exit poll এর উদ্দেশ্য পুরোপুরি বিপরীত।
বিশেষ করে এই রাজ্যে।
Exit poll এ যে sample opinion নেয়া হয় বলে বলা হয় তা প্রায় পুরোটাই ড্রয়িং রুমে বসে।
রাস্তায় দলীয় সমর্থকদের পরিচয় জানার পর।
কারণ উদ্দেশ্য বিভ্রান্ত করা আগুন লাগানো ও ছড়ানো।
পূর্বে পদ্ধতি অনুরূপ ছিল না এতটা।
ধীরে ধীরে বাকি সব স্তম্ভের সাথে এই স্তম্ভটি বিকিয়ে যাওয়ার পর আজ যা দাঁড়িয়েছে প্রতিবেদক তার রূপ যথার্থ ভাবেই তুলে ধরেছেন।
One should stay calm,because on 4th. Dude ka Dudh pani ka pani hogaiga.