নতুন বিজেপি সরকারের স্টেশন থেকে উচ্ছেদ অভিযান পুঁজি, বঞ্চনা এবং এই শহরটা ঠিক কোন অর্থনীতির দিকে নজর দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে সম্পর্কে কী প্রকাশ করছে।

মেশিনগুলি ভোরের আলো ফোটার আগেই উপস্থিত হয়েছিল।
১৭ই মে, ২০২৬ এর রাতে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথমবার শপথ গ্রহণ করে ক্ষমতায় আসার মাত্র নয় দিন পরেই মাঝরাতে হাওড়া নদীর পাড় বরাবর বুলডোজার চলতে শুরু করল। সূর্যের আলো ফুটতে না ফুটতে, গঙ্গার ঘাট থেকে স্টেশন চত্বর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় থাকা প্রায় ১৫০টা স্টল আর অস্থায়ী দোকান নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
মাঝরাতকে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বেছে নেওয়া হয়নি। এমন বেছে নেওয়া হয়েছিল, কারণ অন্ধকার হল অপমান করার মাধ্যমে শাসন করার প্রাচীনতম হাতিয়ার। মানুষ তাদের সারা জীবনের বিনিময়ে যা গড়ে তুলেছে, আপনি তা ধ্বংস করে দিচ্ছেন এমন এক সময়ে, যখন তারা সমবেত হতে পারে না, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না এবং আপনি তাদের সাথে কী করছেন, তা আপনাকে দেখতে বাধ্যও করতে পারে না।
কোনো টাউন ভেন্ডিং কমিটির মিটিং ডাকা হয়নি। কোনো বায়োমেট্রিক সার্ভে সম্পন্ন করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত একজন হকারের নামেও ভেন্ডিং সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়নি। ২০১৪ সালের রাস্তার ধারের বিক্রেতা (জীবিকা সুরক্ষা ও রাস্তার ধারের বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ) আইন যাকে একটা বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে, তা ডিজেল ইঞ্জিনের গর্জনে এবং ঘুমন্ত শহরের নিস্তব্ধতায় পুরোপুরি পিষে ফেলে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০টা আসনের বিপরীতে বিজেপি ২০৮টা আসনে জয়লাভ করে—(বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর বক্তব্য) যার মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের নিরবচ্ছিন্ন বামফ্রন্ট এবং পরবর্তীকালে তৃণমূলের শাসনের অবসান ঘটে। এই জনাদেশের পর যা ঘটল, তা নিমেষের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। হাওড়া স্টেশনে রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (RPF), গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ (GRP) এবং হাওড়া সিটি পুলিশের যৌথ অভিযানে স্টেশনের প্রবেশপথ, বাস স্ট্যান্ড এলাকা এবং গঙ্গার ঘাটের চত্বর থেকে খাবারদাবার, ফলমূল, খেলনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রেতা হকারদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই শিয়ালদহে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে শত শত হকার ও রাস্তার ধারের দোকানপাট সরিয়ে ফেলা হয়; এর ফলে স্টেশনের 21টা প্ল্যাটফর্মের প্রতিটাই হকারমুক্ত হয়ে গেল। মে মাসের শেষের দিকে, দমদম রেল স্টেশন এলাকা থেকেও হকার ও অস্থায়ী দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছিল।
শহরের তিনখানা ব্যস্ততম রেল স্টেশন। শত শত হকার। রাতারাতি।
সরকারি বয়ানটা এমন এক ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রশাসন যখনই তাদের কাছে অসুবিধাজনক মানুষদের উচ্ছেদকে প্রগতি হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজন পড়ে, তখনই তারা এই ভাষা প্রয়োগ করা রপ্ত করে নেয়। জনসমাগমের পরিসরকে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। যাত্রীদের কাছে প্ল্যাটফর্মগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অমৃত ভারত প্রকল্পের আওতায় পরিবহন পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে। সেই সুশৃঙ্খল অবস্থা, যা কিনা দীর্ঘকাল ধরে বিলম্বিত ছিল, অবশেষে এসে উপস্থিত হচ্ছে।
ভাষাটা সভ্য, প্রযুক্তিবিদের মতো আর ভবিষ্যৎমুখী। এটা এক বিশেষ ধরনের হাতসাফাইও দেখাচ্ছে এবং এই বর্ণনার অন্য যেকোনো বিষয় খতিয়ে দেখার আগেই সেই হাতসাফাইয়ের সঠিক নাম উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়।
যাকে পরিচ্ছন্নতা অভিযান বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক পরিভাষায় তা হল এক ধরনের হস্তান্তর।
সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মের বাইরে যিনি ছয় টাকায় ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন, সেই ঝালমুড়ি বিক্রেতাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্টেশনের ভেতরে অবস্থিত সেই লাইসেন্সপ্রাপ্ত খাবারের দোকানটা, যেখানে পঞ্চাশ টাকায় একটা স্যান্ডউইচ বিক্রি হয়, সেটাতে কোনো হাত দেওয়া হয়নি। বারাসাত থেকে আসা প্রথম লোকাল ট্রেনে করে আসা শ্রমিকদের মাটির ভাঁড়ে পাঁচ টাকা দরে এক কাপ চা পরিবেশনকারী সেই মহিলার দোকানও সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেই একই রকম কাপে চা দিয়ে পঁচিশ টাকা দাম হাঁকা ব্র্যান্ডেড চায়ের কাউন্টারটা আজ সকালেও খোলা আছে, ঠিক যেমন ভাবে খোলা ছিল বুলডোজার আসার আগের সকালে, আর যেমন ভাবে খোলা থাকবে আগামীকালও।
হাওড়া স্টেশনের বিশাল ফুড কোর্ট এবং এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত খাবারের দোকানগুলো সম্পূর্ণ সচল ও অক্ষত রয়েছে।
শিয়ালদহ স্টেশনের IRCTC ফুড কোর্ট, এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাউন্টারগুলো আর বিল্ডিঙের ভিতরে থাকা আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিবদ্ধ খাবারের স্টল, এরা সবাই নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের কাজ অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে।
"যা হস্তান্তরিত হয়েছে তা কোনো জায়গা না। এ হল খিদের সুযোগে মুনাফা করার অধিকার।"
যে অধিকারটা, যা একসময় তাদের দখলে ছিল, যারা কেবল নিজেদের উপস্থিতি, নিত্যদিনের কঠোর পরিশ্রম এবং যাত্রীদের সম্পর্কে দশকের পর দশক ধরে অর্জিত গভীর জ্ঞানের সুবাদে এর অধিকারী হয়েছিলেন, তা এখন বুলডোজারের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়ে চলে গেছে তাদের হাতে, যারা রেল কর্তৃপক্ষের সাথে সম্পাদিত একটা লাইসেন্স চুক্তির সুবাদে বর্তমানে এর দখলদার। এই দুই ধরনের দাবির মধ্যকার পার্থক্যটা স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত না। এটা নিরাপত্তা সম্পর্কিতও না। একে জনশৃঙ্খলাও বলা যাবে না। এ হল পুঁজি।
এ হল এমন এক ধরনের দাবি যা পুঁজি দ্বারা সমর্থিত এবং তাই রাষ্ট্রের কাছে বোধগম্য। অন্যটা কেবল প্রতিদিন সকালে উপস্থিত হওয়া ব্যক্তি এবং তার উপর নির্ভরশীল গ্রাহকদের দ্বারা সমর্থিত। প্রশাসনিক ধারণায়, সেই দ্বিতীয় ধরনের দাবিটা আদতে কোনো দাবিই না।
উন্নয়নকে যখন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয় না, তখন তা এভাবেই কাজ করে। এটা শূন্য থেকে কোনো মূল্য সৃষ্টি করে না। এটা ব্যবস্থিতভাবে এবং প্রবল শক্তি প্রয়োগ করে সেই অর্থনীতি থেকে মূল্য স্থানান্তরিত করে, যা বহু মানুষকে সেই অর্থনীতির মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখে, যার মূল্য কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষই পরিমাপ করেন।
মসলা মুড়ি বিক্রেতা এমন একটা খাদ্য ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছিলেন, যা শহরের হাজার হাজার দরিদ্রতম যাত্রীকে তাদের সাধ্যের মধ্যে থাকা দামে খাবার সরবরাহ করত। সেই অর্থনীতিটা ছিল বাস্তব। এটা কার্যকর ছিল। যেকোনো সৎ হিসাব-নিকাশে, শহুরে শ্রমিকদের আহার জোগানোর কাজে এটা রেলওয়ের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ঠিকাদাররা এযাবৎ যা কিছু করতে পেরেছে, তার যেকোনো কিছুর চেয়েই বেশি দক্ষ ছিল।
কিন্তু এটা বোধগম্য ছিল না। এটা কোনো লাইসেন্স রেজিস্ট্রি, ট্যাক্স ফাইলিং বা কর্পোরেট রাজস্বর বিবৃতিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এর ছবিকে প্রগতি বলে উপস্থাপন করা যেত না। আর তাই, সেই হিসাবনিকাশের খাতায়, যা শহরগুলো কী রেখে দেবে আর কী সরিয়ে ফেলবে নির্ধারণ করে, এর কোনো পূর্ণ অস্তিত্ব ছিল না।
শুধুমাত্র শিয়ালদহ একাই প্রতিদিন ১৫ লক্ষেরও বেশি যাত্রী সামলায় (উইকিপিডিয়ার হিসাব), যা একে ভারতের দ্বিতীয় ব্যস্ততম রেল স্টেশনে পরিণত করেছে।
হাওড়া ভারতের বৃহত্তম ও ব্যস্ততম রেল কমপ্লেক্স, যেখানে প্রতিদিন দশ লক্ষেরও বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। (ওয়ান্ডারলগের হিসাব) এই যাত্রীদের বেশিরভাগই শহুরে মধ্যবিত্ত নন, যাদের কাছে পঞ্চাশ টাকার একটা স্যান্ডউইচকে সামান্য অসুবিধা বলে মনে হয়। তাঁরা হলেন শ্রমিক, পরিযায়ী, দিনমজুর, ছাত্রছাত্রী এবং গ্রাম বাংলা থেকে আসা পরিবারবর্গ। তাঁদের অনেকেই দিনের প্রায় সমস্ত সঞ্চয় ট্রেনের টিকিটের পেছনেই খরচ করে ফেলেছেন। তাঁদের জন্য ছয় টাকার মশলা মুড়ি আর পাঁচ টাকার মাটির কাপের চা কোনো স্বস্তিদায়ক বিষয় ছিল না। এটা ছিল পেট ভরানোর খাবার।
পশ্চিমবঙ্গের রেলওয়ে হকারদের নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে যে অনেক ট্রেনের প্যান্ট্রি গাড়ি বা খাদ্য পরিষেবা নেই, হকাররাই যাত্রীদের জন্য খাবারের একমাত্র উৎস। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, শহুরে দরিদ্রদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক হচ্ছেন হকাররা, যারা মূলত গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা পরিযায়ী, কাঠামোগত বেকারত্বের মুখোমুখি হয়ে যাদের জন্য রাস্তার ধারে বিক্রি করাই হল অল্প কিছু আয়ত্তের মধ্যে থাকা রোজগারের উপায়গুলির মধ্যে অন্যতম।
হাওড়া ও শিয়ালদহে যা ধ্বংস করা হয়েছিল তাকে খাদ্য ব্যবস্থার উপর আক্রমণ বলা যাবে না। বরং এটাই ছিল সম্পূর্ণ খাদ্য ব্যবস্থা। যেটা প্রকৃতপক্ষে কাজে লাগত তাদের, যাদের জন্য এটা কার্যকর থাকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় ছিল, যা প্রতিস্থাপিত হয়েছে এমন একটা খাদ্য ব্যবস্থার দ্বারা যা সেই লোকদের জন্য কাজে দেয় যাদের ইতিমধ্যে অন্য বিকল্প ছিলই।
শিয়ালদহের যাত্রীদের যখন এই উচ্ছেদ করার পরে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তারা স্বীকার করে যে তারা ইতিমধ্যে তাদের যাতায়াতের সময় যে চা, জলখাবার এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় জিনিস কিনতেন সেটা এখন মিস করছেন। একজন যাত্রী যিনি ১৯ বছর ধরে প্রতিদিন শিয়ালদহ রুট ব্যবহার করেছেন তিনি বলেন যে হকারদের নিয়ে কোনো বড় সমস্যা ছিল না। বরং, আরও অনেক সমস্যা রয়েছে যেগুলোর সমাধান প্রয়োজন।
এটা কোনো আদর্শের কথা নয়। এটা ১৯ বছরের জীবন ধারণের অভিজ্ঞতা। তিনি আপনাকে বলছেন যে প্রশাসন যে সমস্যাটা সমাধান করতে বেছে নিয়েছে তা প্ল্যাটফর্মে তিনি যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন তা না। তিনি বলছেন যে, যানজটের সমাধান হিসেবে যা উপস্থাপন করা হয়েছে, তাকে তার ভিতরের মানুষেরা তাদের প্রয়োজনীয় কিছু অপসারণ করা হচ্ছে এভাবে অনুভব করেছেন।মধ্যরাতের অপারেশনের আগে প্রশাসন এই কথা শোনেনি। যদি তাই করা হত, তাহলেও সেই সিদ্ধান্ত বদলানো হত না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হকার, উচ্ছেদ হয়ে যাবার পরে প্ল্যাটফর্মের কাছাকাছি একটা কোণ থেকে বলে ওঠেন: আমরা এখন কোথায় যাব? যাত্রীদের বিরক্ত না করে আমরা কোণায় বসে থাকি। (মিলেনিয়ামপোস্ট এর রিপোর্ট) অন্য একজন, তার স্টল ভেঙে ফেলা দেখতে দেখতে বলেন: যদি কোনো পুনর্বাসন না দেওয়া হয় তাহলে আমাদের আত্মহত্যার আশ্রয় নিতে হবে।
এই দুটো বাক্য মিলিত ভাবে ভাবলে হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে যা ঘটেছে তার পূর্ণ নৈতিক গুরুত্বকে প্রকাশ করে।
প্রথমটা হচ্ছে একাত্মতার প্রশ্ন। এই শহর, যেটা আমরা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছি এবং যেখানে আমরা 30 বছর ধরে প্রতিদিন সকালে খাওয়ানোর চেষ্টা করছি, সেখানে আমাদের কি অস্তিত্বের অধিকার আছে? দ্বিতীয় উত্তরটা তখন দেওয়া হয় যখন সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। আয়ের অভাবে বেঁচে থাকার অংক শুধুমাত্র এক দিকেই এগিয়ে চলে।
উভয় কথারই সঠিক রিপোর্ট করা হয়েছে। কোনো কথাকে একটুও পরিবর্তন করা হয়নি।
এখন সেই মেশিন যা স্পর্শ করেনি তার ভূগোলের দিকে নজর দিন, তাহলেই এই পুরো কার্যকলাপের প্রায়োগিক নীতি পরিষ্কার দেখতে পাবেন।
গড়িয়াহাট বাজার যথারীতি খোলা রয়েছে। বেহালার হকাররা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। উত্তর কলকাতার ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র—বড়বাজার—তার চিরপরিচিত জনাকীর্ণতা নিয়ে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই এলাকাগুলো এবং হাওড়া, শিয়ালদহ বা দমদম স্টেশন চত্বরের মধ্যে মূল পার্থক্যটা কিন্তু তাদের বিক্রি করার পদ্ধতির ধরনে না। বরং পার্থক্যটা লুকিয়ে আছে এর পিছনে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি জড়িয়ে আছে মধ্যে।
শহরের এই ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর পেছনে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা শ্রমিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত শক্তি এবং মধ্যবিত্ত ক্রেতা-অর্থনীতির সাথে তাদের গভীর ও নিবিড় সংযোগ। শহরকে অচল করে দেওয়ার মতো তাদের যে সংগঠিত ক্ষমতা রয়েছে, তার বাস্তব নির্বাচনী প্রতিফল রয়েছে। রেল স্টেশনের হকারের সম্বল বলতে আছে কেবল এক বস্তা ফল আর গত ত্রিশ বছর ধরে গড়ে তোলা নিজের নিত্যযাত্রীদের সম্পর্কে অর্জিত গভীর অভিজ্ঞতা।
আর বুলডোজারের কাছে এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারাটা অত্যন্ত সহজ একটা কাজ।
২০১৪ সালের রাস্তার ধারের বিক্রেতা আইন (Street Vendors Act) অস্তিত্ব আছে ঠিক এই কারণেই—যাতে গভীর রাতে যন্ত্রের মাধ্যমে এ ধরনের কোনো বিভাজন বা পার্থক্য সৃষ্টি করা না যায়। এই আইন অনুযায়ী, স্থান-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে 'টাউন ভেন্ডিং কমিটি' গঠন করা প্রয়োজন, যেখানে বিক্রেতাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অন্তত চল্লিশ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। এই আইন এটা বাধ্যতামূলক করে যে, কোনো উচ্ছেদ অভিযান শুরু করার আগে অবশ্যই একটা বায়োমেট্রিক সার্ভে সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রত্যেক বিক্রেতাকে আলাদাভাবে বিক্রয় সার্টিফিকেট (Certificate of Vending) দিতে হবে। এই বিধান অনুসারে, ৩০ দিনের লিখিত বিজ্ঞপ্তি দিতে হয় এবং আগেই বিক্রেতাদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ও উপযুক্ত একটা বিকল্প বিক্রি করার মতো এলাকা চিহ্নিত করা থাকতে হবে।
হাওড়ায় এর কোনোটাই করা হয়নি। শিয়ালদাতেও না। দমদমেও না।
এই আইনের সংশোধন করা হয়নি। আদালতে একে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। একে স্রেফ উপেক্ষা করা হয়েছিল, যা আইনটা বাতিল করার চেয়েও অবজ্ঞা করার এক আরও কার্যকর রূপ।
কলকাতা হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছে যে, হাওড়া স্টেশনের অদূরে জারি করা একটা উচ্ছেদ নোটিশে কোনো স্বাক্ষর ছিল না; এমনকি, কোন বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বা ক্ষমতাবলে ওই নোটিশটা জারি করা হয়েছে, তারও কোনো উল্লেখ বা পরিচয় তাতে ছিল না।

আইনের দৃষ্টিতে বলতে গেলে, এটা ছিল একটা অস্পষ্ট বা ভিত্তিহীন হুমকি, যার পেছনে ছিল এমন এক প্রশাসনিক যন্ত্রের শক্তি, যা কোনো উত্তরের অপেক্ষা করার প্রয়োজনই বোধ করেনি। বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্য হাওড়া স্টেশনের নিকটবর্তী উচ্ছেদ অভিযানের ওপর একটা অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করে এই পর্যবেক্ষণ জানান যে, উচ্ছেদের মুখে পড়া হকারদের আদালতে নিজেদের বক্তব্য পেশ করার জন্য একটা ন্যায্য সুযোগ দেওয়া উচিত। পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয় 10 জুন। তবে এই স্থগিতাদেশটা অন্যান্য রেল স্টেশনের বাইরের হকার উচ্ছেদ অভিযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।
একটা স্টেশন অন্তত একটা সাময়িক স্বস্তি পেল। প্রশাসন এর মধ্যেই আরও তিন জায়গায় স্টেশন এলাকা হকারমুক্ত করে ফেলেছিল। আদালত এই পর্যবেক্ষণ দেন যে, এমনকি কোনো কাঠামো অবৈধ হলেও তা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে একটা সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে; যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে প্রশাসন একতরফা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না।
একটা ক্ষমতাসীন সরকারকে এই কথাটা পুনরায় মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যখন হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়, তখন তা থেকে আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারি যে একটা দৃশ্যমান ফলাফল বা সাফল্য দেখানোর অতি-তাড়াহুড়োয় প্রশাসনিক তৎপরতা কীভাবে সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপিত করে ফেলেছে।
এই দৃশ্যমান ফলাফলটা ঠিক সেই দর্শকগোষ্ঠীর কাছেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোধগম্য, যাদের লক্ষ্য করে এটা পরিকল্পিত হয়েছিল। হকারমুক্ত প্ল্যাটফর্ম দেখে যে শহুরে মধ্যবিত্ত যাত্রী স্বাগত জানান, তিনি কিন্তু ভুল নন যে হকারমুক্ত প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হেঁটে যাওয়াটা সত্যিই অনেক বেশি সহজ ও সুবিধাজনক। সেই অভিজ্ঞতাটা বাস্তব।
তবে এই অভিজ্ঞতার মধ্যে যে বিষয়টা অনুপস্থিত, তা হল, এই পরিষ্কার পরিবেশটা অর্জনের জন্য ঠিক কী মূল্য দিতে হয়েছে; সেই মূল্য কারা পরিশোধ করেছেন; এবং যে হকাররা যেখানে বসে ব্যবসা করতেন, সেই জায়গাটাতে এখন কী এসে জায়গা করে নিয়েছে।
পঞ্চাশ টাকা দামের একটা স্যান্ডউইচ। কোনো নামী ব্র্যান্ডের চায়ের দোকান। যে স্টেশনটা প্রতিদিন দশ লক্ষ যাত্রী সামলায়, সেখানে একটা ফুড কোর্টে বসার আসন সংখ্যা মাত্র ষাটটা।
এগুলো হকার অর্থনীতির কোনো বিকল্প না। বরং এগুলো হল সেই অর্থনীতির অনুপস্থিতিরই এক একটা স্মারক, যার পণ্যের দাম এমন এক স্তরে নির্ধারিত, যা প্রথম লোকাল ট্রেনে এসে পৌঁছানো শ্রমিককে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, এই নতুন ব্যবস্থায় তার খিদের আদৌ কতটা কদর রয়েছে।
এখানে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার পূর্ণ পরিসর সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট হওয়া অত্যন্ত জরুরি; এবং বিজেপির বর্তমান বাড়াবাড়ির কারণে গত ত্রিশ বছরের ব্যর্থতার সমস্ত দায়ভার কেবল তাদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না।
আন্তর্জাতিক হকার দিবসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন যে, বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর থেকে হকারদের প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে, তা দেখে তিনি বিস্মিত, ক্ষুব্ধ এবং গভীরভাবে ব্যথিত।
তার এই বিস্ময়ের দাবিটা বিশ্বাস করা বেশ কঠিন।
তৃণমূল সরকার চোদ্দো বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। সেই চোদ্দো বছরে, ২০১৪ সালের আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক করা একটাও বায়োমেট্রিক সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়নি। একটাও কার্যকরী টাউন ভেন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়নি। যে বিক্রয় সার্টিফিকেটগুলো আজকের দিনে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের হাতে একটা বৈধ আইনি হাতিয়ার তুলে দিতে পারত, সেগুলো কখনোই ইস্যু করা হয়নি।
রাজনৈতিকভাবে হকাররা তৃণমূলের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল, একটা সুসংহত ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে এবং তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের দলীয় পরিকাঠামোর একটা উৎস হিসেবে। কিন্তু হকাররা সম্ভবত ততটা প্রয়োজনীয় ছিল না যে, তারা সেই একটামাত্র সুরক্ষাটুকু পাবে, যা প্ল্যাটফর্মে তাদের উপস্থিতিকে আইনিভাবে অকাট্য করে তুলতে পারত; আর সেই সুরক্ষাটা হল: এমন একটা আইনি স্বীকৃতি লাভ, যা ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল এবং কেবল বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল।
তৃণমূল আসলে এমন এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যা হকারদের কখনোই প্রকৃত নিরাপত্তা না দিয়ে কেবল নিজেদের ওপর নির্ভরশীল ও কৃতজ্ঞ করে রাখত। দলের প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থাটা ছিল অত্যন্ত দক্ষ। অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তা ছিল উদাসীন।
এই শহরে হকার উচ্ছেদ অভিযান কোনো নতুন ঘটনা না। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে অপারেশন সানশাইন এর মাধ্যমে এই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছিল এবং এরপরও তা বারবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে; তবুও হকাররা সবসময়ই আবার ফিরে আসেন। এলাকাগুলো উচ্ছেদের এর আগের চেষ্টাগুলোও ব্যর্থ হয়েছিল, মূলত এই কারণে যে, কখনোই যথাযথ পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানো হয়নি। (দ্য ফেডারাল এর প্রতিবেদন)
তিন দশক। তিনটা সরকার। হকার বারবার ফিরে আসেন কারণ যে পরিস্থিতি তাকে সৃষ্টি করেছে, সেই পরিস্থিতির মূল কারণগুলো কখনোই সমাধান করা হয়নি।
শিয়ালদহের মশলা মুড়ি বিক্রেতা, হাওড়ার চা-ওয়ালা কিংবা দমদমের ফল-বিক্রেতা, এরা কেউ সেখানে আকস্মিকভাবে বা নিছক আবেগের বশে এসে দাঁড়ায়নি। তারা সেখানে আছেন, কারণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি তাদের জায়গা করে দিতে পারে না। কারণ দশ লক্ষ নিত্যযাত্রীর এমন সব জিনিসের প্রয়োজন, যা এই হকাররা এমন দামে সরবরাহ করে, যা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। আর এর আরেকটা কারণ হল, একটার পর একটা সরকার এসেও, শহর কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টাকে একটা কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে না দেখে, বরং কেবল একটা নান্দনিক সমস্যা হিসেবেই গণ্য করে এসেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি এই মানুষগুলোর কাছে ব্যর্থ হয়ে তারপর সেই ব্যর্থতার জন্য লজ্জিত বোধ করেনি। তারা এই মানুষগুলোর কাছে ব্যর্থ হয়েছে, আর তারপর সেই ব্যর্থতার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলতে বুলডোজার পাঠিয়ে দিয়েছে; আর সেই ফাঁকা জায়গাটায় সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো এক নামী ব্র্যান্ডের খাবারের দোকান, যা তাদের ভাষায় 'উন্নয়ন' এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
বারাকপুর ও শিয়ালদহের মাঝে রেলপথের মহিলা হকারদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই মহিলারা অত্যন্ত দীর্ঘক্ষণ ধরে কাজ করেন, সারাক্ষণ আইনি অনিশ্চয়তা থাকে এবং একই সাথে হকারের কাজ করা ও গৃহস্থালির কাজ, এই দুই রকম বোঝার চাপ সামলে চলেন; অথচ তাদের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষাই নেই।
বুলডোজার আসার আগে, কোনো সরকারি সার্ভেতেই এই মহিলাদের অস্তিত্ব দেখা যায়নি। এই ঘটনা ঘটে যাবার পরেও, কোনো সরকারি সার্ভেতে তাদের নাম উঠবে না।
তারা অর্থনীতির এমন একটা অংশের অন্তর্ভুক্ত, যার কোনো হিসাব বা গুরুত্ব নেই, কারণ সেই অংশের হিসাব কখনোই রাখা হয়নি। এই অর্থনীতিই শহরের দৈনন্দিন জীবনকে তার সবচেয়ে প্রাথমিক স্তরে সচল রাখে; অথচ শহরটা আদৌ উন্নত হচ্ছে কি না, তা পরিমাপ করার জন্য রাষ্ট্র যেসব মানদণ্ড ব্যবহার করে, তার সবগুলোতেই এই অর্থনীতি অদৃশ্য থেকে যায়। যখন তারা প্ল্যাটফর্ম থেকে উধাও হয়ে যায়, তখন কোনো বিকাশের সূচক তাদের এই হারিয়ে যাওয়াকে নথিবদ্ধ করে না। কোনো 'উৎপাদনশীলতা সূচক' এর মান নিচে নেমে যায় না। কোনো সরকারি রিপোর্টে তাদের এই অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয় না।
স্টেশন এখন আরও বেশি পরিচ্ছন্ন। আরও ভালো ছবি তোলা যাচ্ছে। খিদে এখনও পায়ে; আর এখন সেই খিদে মেটাতে খরচ হয় পাঁচ গুণ বেশি।
এখানে উন্নয়নের যে ধারাটা অনুসৃত হচ্ছে, তা এই প্রশ্নটা তোলে না যে এই নারীরা আসলে কী পরিষেবা দিচ্ছিলেন, কাদের উদ্দেশ্যে দিচ্ছিলেন, কী দামে দিচ্ছিলেন এবং তাঁদের ওপর নির্ভরশীল দশ লক্ষ যাত্রীর জীবনে এর কী প্রভাব পড়ছিল। এটা কেবল জানতে চায় যে উচ্ছেদ-পরবর্তী ফাঁকা প্ল্যাটফর্মটা ছবিতে দেখতে কেমন লাগছে; আর এর ঠিক পেছনে থাকা ফুড কোর্টের কাছে কোনো বৈধ লাইসেন্স আছে কি না।
কলকাতা হাইকোর্ট ঠিক সেই কাজটাই করেছে, যা করা আদালতের সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের হঠকারী পদক্ষেপ এবং সেই পদক্ষেপের প্রত্যক্ষ শিকার সাধারণ মানুষের মাঝখানে আদালত আইনের শাসন এর কাঠামো স্থাপন করে দিয়েছে। জুন মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শুনানির মাধ্যমে এই সুরক্ষা-বলয়টা কেবল হাওড়া স্টেশন ছাড়িয়ে অন্য কোথাও প্রসারিত হয় কি না তা থেকেই বোঝা যাবে, বর্তমান সরকার ‘প্রক্রিয়া’ শব্দটার আসলে কী অর্থ বোঝে।
তবে আদালতের কোনো নির্দেশই প্ল্যাটফর্ম সাতের বাইরে থাকা সেই মশলা মুড়ির দোকানটাকে আবার গড়ে দিতে পারবে না।
আদালতের কোনো স্থগিতাদেশই সেই চা-ওয়ালিকে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না, যিনি মাটির ভাঁড়ে মাত্র পাঁচ টাকায় চা বিক্রি করতেন এবং যাঁর ওপর ভরসা করে চলতেন অসংখ্য শ্রমিক; যারাই এখন দাঁড়িয়ে আছেন একটা চকচকে ল্যামিনেশন করা খাদ্যতালিকার বোর্ডের সামনে, আর মনে মনে অংক কষছেন, যা কোনোভাবেই তাঁদের সাধ্যের মধ্যে কুলাচ্ছে না।
এই সংকটটা যে গভীরতম প্রশ্নটা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, তা কিন্তু বিজেপিকে নিয়ে না। টিএমসিকে নিয়েও না। তা রেল কর্তৃপক্ষকে নিয়ে না, এমনকি ২০১৪ সালের সেই আইনটাকে নিয়েও না, যদিও এই সবকটা বিষয়ই নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা মূলত সেই বিষয়টাকে কেন্দ্র করে, যাকে একটা শহর 'বাস্তব' বলে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
হকারের অর্থনীতি ছিল বাস্তব। এটা মানুষের মুখে অন্ন জুগিয়েছে। এটা মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। সারা দেশের শহুরে এলাকার অন্যতম ব্যস্ততম ও জনাকীর্ণ চত্বরগুলোর বুকে এটা মানুষের জীবিকা, সংসার এবং দৈনন্দিন অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছিল। এর কোনো পরিমাপ করা হয়নি, নিবন্ধন করানো হয়নি, কোনো সার্টিফিকেট দেওয়া হয়নি; রাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনীতির আখ্যান রচনার জন্য রাষ্ট্র যেসব নথিপত্র ব্যবহার করে, তার কোনোটাতেই এই অর্থনীতির কোনো অস্তিত্ব বা দৃশ্যমানতা ছিল না।
আর যেহেতু এর কোনো পরিমাপ করা হয়নি, তাই প্রশাসনিক কল্পনায় এটি অবাধে উচ্ছেদ বা অপসারণ করার এক খোলা ময়দান ছিল।
ফুড কোর্টের বৈধ লাইসেন্স আছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিটা হল চুক্তিভুক্ত অস্তিত্ব। ব্র্যান্ডেড দোকানটার হাতে এক বৈধ কাগজ আছে। উপস্থিতির এই রূপগুলোকেই রাষ্ট্র 'বৈধ' বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলোর খরচ বা দাম, যাদের সরিয়ে দিয়ে এরা জায়গা করে নিয়েছে, তাদের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি; যার অর্থ হল, যাদের এই পরিষেবার প্রয়োজন, তাদের মধ্যে তিন থেকে পাঁচ গুণ কম সংখ্যক মানুষকেই এখন এই পরিষেবা দেওয়া হয়।

এটা কোনো নীতিগত দুর্ঘটনা না। এটাই হল নীতি।
শহরগুলো ঠিক তখনই এমন দেখতে হয়, যখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, কেবল সেই অর্থনীতিটাই সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য, যা পুঁজির কাছে ইতিমধ্যেই বোধগম্য; এবং সেই বোধগম্যতার গণ্ডির বাইরে যা কিছু আছে, তা স্বভাবতই এক ধরনের অবৈধ দখলদারি মাত্র।
হাওড়া স্টেশনের সেই হকার সেই যন্ত্রদানব আসার ঠিক আগে শেষবারের মতো মাঝরাতে শহরকে আহার জুগিয়েছিল। কেউই সেই কাজটাকে শহরকে আহার জোগান দেওয়া হিসেবে দেখেনি। প্রশাসন সেটাকে দেখেছিল এক ধরনের অবৈধ দখলদারি হিসেবে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফুড কোর্ট সেটাকে দেখেছিল নিজেদের ব্যবসার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। যে যাত্রী খাবার খেয়েছিলেন, তিনি এটাকে প্রাতরাশ হিসেবেই দেখেছিলেন।
এটাকে দেখার এই তিনটা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মাত্র একটাই সূর্যোদয়ের আগেই ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
প্রামাণ্য উৎসের URL-সমূহ:
১. শিয়ালদহ স্টেশনের প্রযুক্তিগত ও যাত্রীদের বিন্যাস-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য দেখুন:
https://en.wikipedia.org/wiki/Sealdah_railway_station
২. কলকাতার যাতায়াত ব্যবস্থায় শিয়ালদহের আর্থসামাজিক ভূমিকার জন্য দেখুন:
https://cogindia.art/sealdah-railway-station-colonial-infrastructure-partition-urban-calcut/
৩. হাওড়া জংশনের পরিচালনা, যাত্রী-সংক্রান্ত তথ্য এবং ঐতিহাসিক রূপরেখার জন্য দেখুন:
https://wanderlog.com/place/details/15379469/howrah-junction-railway-station
৪. হাওড়া স্টেশনের বিস্তারিত প্রযুক্তিগত ইতিহাস ও বিন্যাসের জন্য দেখুন:
https://en.wikipedia.org/wiki/Howrah_railway_station
৫. আইনি বাধ্যবাধকতা, টাউন ভেন্ডিং কমিটির মানদণ্ডসমূহ এবং ভারত যুক্তরাষ্ট্রের আইনের অধীন উচ্ছেদ-সুরক্ষার জন্য দেখুন:
https://en.wikipedia.org/wiki/Street_Vendors_Act,_2014
৬. ২০১৪ সালের আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জসমূহ বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনার জন্য দেখুন:
https://ccs.in/model-street-vendors-protection-livelihood-and-regulation-street-vending-act
বিচার বিভাগীয় ও বিধিবদ্ধ পোর্টালসমূহ:
১. ট্রানজিট এলাকা থেকে উচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলার অবস্থা, দৈনিক আদেশ এবং বেঞ্চ থেকে জারি করা আধিকারিক রায়গুলোর উপরে নজর রাখার জন্য দেখুন:
https://calcuttahighcourt.gov.in
২. শহুরে হকারি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের হাইকোর্টের আদেশের সমন্বিত ও কেন্দ্রীয় ডেটাবেস অ্যাক্সেস করার জন্য দেখুন:
https://hcservices.ecourts.gov.in
৩. আধিকারিক আইন প্রণয়ন বিষয়ক তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে ২০১৪ সালের রাস্তার ধারের বিক্রেতা আইন এর যাচাইকৃত বিধিবদ্ধ পাঠ্যবস্তু, সাংবিধানিক বিধানসমূহ এবং আইনি কাঠামোর জন্য দেখুন: https://www.indiacode.nic.in
উচ্ছেদ করার ফলে সেই চেন টা ছিন্ন হয়ে গেল।
সেটা জনসংখ্যা আকারে five folded of what is just visible
Its damaged some how
আরো একটা কথা মাথায় আসছে। এই সব ঘটনা আত্মঘাতীও। এত শত শত মানুষের খাদ্য সুরক্ষা (কেউ অন্যকে খাবার জোগান দিয়ে বা অন্য কিছু বিক্রি করে নিজের খাবার ব্যবস্থা করছেন ) ভেঙে পড়লে রাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ে। কখনো কখনো শাসকের ইচ্ছে না থাকলেও (যতক্ষণ না বিশেষ কোন উপায়ে গণহত্যা না করে একটা বিরাট জনসংখ্যাকে মেরে না ফেলা যাচ্ছে, আবার সেটা পারলেও সেটা সাময়িক, যেমন গণহত্যার পরেও ইহুদিদের আজকের যুদ্ধ) জনগনের quantitative pressure শাসকের ওপর এসে পড়ে। যতক্ষণ মানুষ নূন্যতমও খেতে পায়, অধিকার খর্বের কথা না ভেবে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে, কিন্তু পেটের ভাত না থাকলে তার animal killing instinct জেগে ওঠে। শাসক ক্ষমতার illusion এ বারবার এই তত্ত্ব ভুলে যায়।