‘জন গণ মন’: অধিনায়ক থেকে জাতিরাষ্ট্র — স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত নির্বাচনের অন্তরালের ইতিহাস
একটি পুনর্বিবেচনা: রবীন্দ্রনাথ, INA-র শুভ সুখ চৈন, নেহরু এবং ১৯৫০-এর সিদ্ধান্ত

ভূমিকা:
ভারতের জাতীয় সংগীত জন গণ মন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। গানটি কি পঞ্চম জর্জকে উদ্দেশ করে লেখা হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই দিয়ে গিয়েছেন। ১৯৩৭ সালে পুলিনবিহারী সেনকে লেখা চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে তাঁর গানের “ভারতভাগ্যবিধাতা” কোনও George V, George VI বা অন্য কোনও George নন। তিনি যে সত্তাকে বন্দনা করেছিলেন, তিনি ভারতের ইতিহাসের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে মানুষের পথপ্রদর্শক, এক চিরন্তন ‘রথী’ বা ‘চালক’। Indian Express
অতএব ‘জন গণ মন’ ব্রিটিশ রাজাকে উদ্দেশ করে লেখা হয়েছিল—এই প্রচলিত অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই।
কিন্তু এর পরেই একটি অন্য প্রশ্ন উঠে আসে, যা তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়: স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে ১৯৫০ সালে ‘জন গণ মন’ কেন নির্বাচিত হল?
এবং আরও নির্দিষ্টভাবে: একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত কি দেশ ও তার জনগণকে সরাসরি সম্বোধন করলে অধিক উপযুক্ত হতো না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ১৯৫০-এর ২৪ জানুয়ারির ঘোষণায় থামলে চলবে না। আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৪৭–৪৮-এর সরকারি নথিতে, যেখানে জাতীয় সংগীত নিয়ে বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট হতে শুরু করে।
১. ১৯১১: ‘জন গণ মন’-এর জন্ম
জন গণ মন প্রথম প্রকাশ্যে গাওয়া হয় ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় Indian National Congress-এর অধিবেশনে।
এই ঐতিহাসিক ব্যবহার গানটিকে জাতীয় রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলে। কিন্তু এটিই যে পরবর্তীকালে জাতীয় সংগীত নির্বাচনের প্রধান কারণ ছিল, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দরকার: কংগ্রেস-এর অধিবেশনে গানটির প্রাথমিক ব্যবহার → ঐতিহাসিক পরিচিতি কিন্তু, ১৯৪৮–৫০-এ জাতীয় সংগীত নির্বাচন → একটি পৃথক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
২. ১৯৪৩: আইএনএ এবং ‘শুভ সুখ চৈন’—একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়
এখানেই ইতিহাসের একটি অসাধারণ পর্ব শুরু হয়।
সুভাষ চন্দ্র বোসের-এর নেতৃত্বাধীন Provisional Government of Free India বা আজাদ হিন্দ সরকার-এর জন্য একটি জাতীয় সংগীত প্রয়োজন ছিল। বন্দে মাতরম-এর ধর্মীয় প্রতীক ও সংস্কৃতঘেঁষা ভাষা নিয়ে আইএনএ-র বহুধর্মীয় সৈন্যদের মধ্যে সমস্যা ছিল।
রবীন্দ্রনাথের জন গণ মন-এর সুর ও ঐক্যের ভাব বোস-এর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু তিনি গানটির সংস্কৃতঘেঁষা বাংলা ভাষাকে আইএনএ-র সর্বভারতীয় সৈন্যদের জন্য উপযুক্ত মনে করেননি। ফলে গানটির ভিত্তিতে হিন্দুস্তানী ভাষায় নতুন রূপ তৈরি হয়—‘শুভ সুখ চৈন’। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আবিদ হাসান সাফরানী ও মুমতাজ হুসেইন; সুরের রূপ দেন ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুরি। Wikipedia
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হোলো
জন গণ মন-এ:
“জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে
ভারতভাগ্যবিধাতা…”
কিন্তু শুভ সুখ চৈন-এর রাজনৈতিক ভাষায় ‘অধিনায়ক’ বা ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ নেই।
বরং সেখানে ভারত, তার ভূগোল, তার জনগণ, ঐক্য এবং আজাদ হিন্দ সামনে আসে।
অর্থাৎ একই রবীন্দ্র-উৎস থেকে একটি স্বাধীনতাকামী রাজনৈতিক সংগঠন একটি নতুন জাতীয়তাবাদী ভাষা নির্মাণ করেছিল।
৩. ১৯৪৭: আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘জন গণ মন’
স্বাধীনতার পর জাতীয় সংগীতের প্রশ্নটি যখন সামনে আসে, তখন জন গণ মন ইতিমধ্যেই নতুন এক সুবিধা অর্জন করেছে।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ-এ নিউইয়র্ক অধিবেশনের সময় ভারতীয় প্রতিনিধিদলের কাছে জাতীয় সংগীত চাওয়া হয়। তারা জন গণ মন-এর একটি রেকর্ডিং পরিবেশনার জন্য দেয়। সেটি বাজানোর পর বিদেশি প্রতিনিধিরা গানটির সুরকে প্রশংসা করেন এবং সঙ্গীতলিপি-এর জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। The Nehru Archive
এই ঘটনা পরবর্তী সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তখন ভারতকে শুধু নিজেদের জন্য একটি জাতীয় গান নির্বাচন করতে হচ্ছিল না।
একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে এমন গানও দরকার ছিল যা:
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বাজানো যায়,
মিলিটারী ব্যান্ড বাজাতে পারে,
বিদেশে দূতাবাস-এ বাজানো যায়,
আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে মর্যাদাপূর্ণ শোনায়।
৪. ১৯৪৮: নেহরুর নথি—আমাদের অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল
১৯৪৮ সালের ২১ মে জহরলাল নেহরু ক্যাবিনেট-এর সামনে জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক বার্তা রাখেন।
এখানে প্রথমবার আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব যুক্তিগুলি বেশ পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই।
নেহরু উল্লেখ করেন যে জন গণ মন ইতিমধ্যে:
মিলিটারী ব্যান্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে,
সরকারী অনুষ্ঠান-এ ব্যবহৃত হচ্ছে,
বিদেশেও ব্যবহৃত হয়েছে,
এবং আইএনএ-র ভ্যারিয়েশন-এর কারণে গানটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন:
“Jana Gana Mana owes part of its present popularity to the use which was made of a variation of it by the I.N.A.” The Nehru Archive
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি। অর্থাৎ স্বাধীন ভারতের সরকার নিজেই স্বীকার করছিল যে আইএনএ-র ব্যবহারের ফলে গানটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
৫. নেহরুর কাছে ‘সুর’ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
১৯৪৮ সালের ১৫ জুন বি. সি. রায়কে লেখা চিঠিতে নেহরু জাতীয় সঙ্গীত সম্পর্কে আরও স্পষ্ট মত প্রকাশ করেন।
তিনি লিখেছিলেন:
“A national anthem should be something of victory and fulfilment, not of past struggle.” The Nehru Archive
এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ:
“A national anthem is chiefly music and not words.” The Nehru Archive
এই দ্বিতীয় বক্তব্যটি আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে রাখা উচিত।
কারণ, ‘অধিনায়ক’ কে? ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ কে? কেন দেশকে সরাসরি সম্বোধন করা হল না?
কিন্তু নেহরুর ১৯৪৮-এর বাস্তব সিদ্ধান্তে গানের শব্দের চেয়ে সুর, অর্কেস্ট্রাল পরিবেশনা, সামরিক ব্যান্ড এবং আন্তর্জাতিক ব্যবহারযোগ্যতা-কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এটি কোনও অনুমান নয়—নেহরুর নিজের লেখা।
৬. নেহরু কেন ‘জন গণ মন’ পছন্দ করেছিলেন?
বি. সি. রায়কে লেখা চিঠিতে নেহরু বলেন যে নিউইয়র্কের ওয়ালডর্ফ-এ একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে গানটির অর্কেস্ট্রাল পরিবেশনা বাজানো হলে বিদেশি প্রতিনিধিরা অত্যন্ত প্রশংসা করেছিলেন।
এরপর তিনি রেকর্ড সংগ্রহ করেন এবং আর্মি ব্যান্ড-কে গানটি অনুশীলন করতে বলেন।
ফলে গানটি দ্রুত আর্মি, নেভি এবং এয়ার ফোর্সের আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত ভাণ্ডার-এ প্রবেশ করে। The Nehru Archive
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট:
‘জন গণ মন’কে জাতীয় সংগীত বানানোর প্রক্রিয়াটি ১৯৫০-এর ২৪ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়নি।
১৯৪৭–৪৮-এই গানটি কার্যত একটি অস্থায়ী জাতীয় সংগীত-এর মতো ব্যবহার পেতে শুরু করেছিল।
৭. ১৯৪৮ সালের ২১ মে নেহরুর ক্যাবিনেট নোট-এ বলা হয়েছিল যে জন গণ মন-কে আপাতত জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
কিন্তু একই নথিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে:
“Some indication will have to be given…”
এবং তার আগেই তিনি লিখেছিলেন যে গানটির কয়েকটি শব্দ পরিবর্তন করে সেটিকে সহজ হিন্দুস্তানী করার চেষ্টা করা যেতে পারে; এমনকি সিন্ধ-এর পরিবর্তে আসাম রাখার কথাও আলোচিত হয়েছিল। The Nehru Archive
আরও গুরুত্বপূর্ণ:
সিদ্ধান্তটি তখনও “নিশ্চিতভাবে অস্থায়ী এবং পরিবর্তনযোগ্য” ছিল। The Nehru Archive
অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে গানটি অপরিবর্তনীয় বা চূড়ান্ত ছিল না।
৮. তাহলে কি নতুন গান করার সম্ভাবনা ছিল?
হ্যাঁ। এটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
১৯৪৮-এর নথিতে নেহরুর আলোচনায় একেবারে নতুন সুর বা নতুন শব্দের এর সম্ভাবনাও খোলা ছিল।
অর্থাৎ স্বাধীন ভারতের সামনে তাত্ত্বিকভাবে তিনটি পথ ছিল:
পথ ১
জন গণ মন রাখা।
পথ ২
জন গণ মন-এর শব্দ কিছুটা পরিবর্তন করা।
পথ ৩ একেবারে নতুন জাতীয় সংগীত তৈরি করা।
শেষ পর্যন্ত পথ ১-ই বেছে নেওয়া হল।
কেন? এর একটি অংশ নথিতে পাওয়া যায়—সুরের মর্যাদা, সামরিক ব্যবহারযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, বর্তমান প্রচলন এবং আইএনএ -র মাধ্যমে জনপ্রিয়তা।
কিন্তু ‘অধিনায়ক’ বনাম ‘দেশ’—এই দার্শনিক প্রশ্নের কোনও বিস্তারিত আলোচনা নথিতে পাওয়া যায় না।
৯. ‘শব্দগুলি পুরোপুরি উপযুক্ত নয়’—এমন কথাও উঠেছিল
১৯৪৮ সালের ২৫ আগস্ট গণপরিষদ-এ নেহরু জাতীয় সঙ্গীতের সুর নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
সেখানে তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল—‘জন গণ মন’-র ভাষার ব্যবহার পুরোপুরি উপযুক্ত নয়, এবং কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু বাস্তব রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুরটির একক, স্বীকৃত ও সর্বজনগ্রাহ্য রূপে প্রতিষ্ঠা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। The Nehru Archive
এখানে একটি অসাধারণ প্রশ্ন তৈরি হয়:
যদি স্বাধীন ভারতের নেতৃত্ব ১৯৪৮ সালেই মনে করে থাকে যে ভাষার ব্যবহার “not wholly appropriate”, তবে ১৯৫০ সালে মূল ভাষার ব্যবহারই কেন রেখে দেওয়া হল? আমরা প্রাথমিক নথিতে এর একটি পূর্ণাঙ্গ উত্তর পাই না। এটি গবেষণার একটি নথিগত শূন্যতা।
১০. ১৫ জুন ১৯৪৮-এর নেহরু–বি. সি. রায়ের চিঠি আরও একটি রাজনৈতিক কারণ প্রকাশ করে
নেহরু বন্দে মাতরম -এর বিষয়ে খুব স্পষ্ট ছিলেন।
তিনি লিখেছিলেন: “A national anthem should be something of victory and fulfilment, not of past struggle.” The Nehru Archive
অর্থাৎ তাঁর কাছে:
বন্দে মাতরম → স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি
আর
‘জন গণ মন’ → স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রের পরিচয়।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবাদর্শগত পার্থক্য।
নেহরু এমন একটি জাতীয় সংগীত চেয়েছিলেন যা স্বাধীন ভারতের নতুন রাষ্ট্রীয় পরিচয় প্রকাশ করবে, কেবল ঔপনিবেশিক-বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি নয়।
১১. ১৯৫০: শেষ সিদ্ধান্ত
২৪ জানুয়ারি ১৯৫০, গণপরিষদ-এ প্রেসিডেন্ট ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘোষণা করেন:
“The composition consisting of the words and music known as Jana Gana Mana is the National Anthem of India…”
এবং সঙ্গে বলেন, বন্দে মাতরম, যা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে, তাকে ‘জন গণ মন’-র সঙ্গে সমান মর্যাদা দেওয়া হবে। E-Parliament
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
কোনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নেওয়া হয়নি। রাজেন্দ্র প্রসাদ নিজেই বলেন যে আগে ভাবা হয়েছিল আইনসভায় প্রস্তাব এনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বিবৃতি-এর মাধ্যমে বিষয়টি ঘোষণা করেন। E-Parliament
কেন এই গান—তার পূর্ণ রাজনৈতিক যৌক্তিকতা কোথায়?
১৯৫০-এর এই রেকর্ডে তার বিস্তারিত উত্তর নেই।
১২. তাহলে কি কংগ্রেস অধিবেশনে গাওয়া হয়েছিল বলেই ‘জন গণ মন’?
এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রাথমিক প্রমাণ-এর ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, শুধু সেই কারণে—না।
কংগ্রেস অধিবেশন-এ ১৯১১ সালে গানটি গাওয়া হয়েছিল—এটি অবশ্যই গানটির ঐতিহাসিক বৈধতা তৈরি করেছিল।
কিন্তু ১৯৪৮-এর বাস্তব সিদ্ধান্তগ্রহণের নথিতে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে:
আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, সামরিক ব্যান্ড, কূটনৈতিক ব্যবহার, অর্কেস্ট্রাল মান, বর্তমান সরকারি প্রচলন, আইএনএ -র মাধ্যমে জনপ্রিয়তা, এবং নেহরুর ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর। The Nehru Archive
অতএব কংগ্রেস-এর ঐতিহ্য ছিল পটভূমিগত বৈধতা; কিন্তু ১৯৪৮-এর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কার্যকরী বাস্তবতা ছিল অনেক বিস্তৃত।
১৩. আইএনএ -র প্রসঙ্গটি আবার ফিরে আসুক
এখানে ইতিহাস একটি সুন্দর বিদ্রূপ তৈরি করে।
১৯৪৩-এ আইএনএ জন গণ মন-এর সুর/ভাবকে গ্রহণ করে শুভ সুখ চৈন তৈরি করেছিল।
আর ১৯৪৮-এ নেহরু নিজেই লিখছেন যে:
‘জন গণ মন’-র বর্তমান জনপ্রিয়তার একটি অংশ আইএনএ-র ব্যবহারের ফল। The Nehru Archive
১৯৫৪ সালে নেতাজী-র জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে নেহরু আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন যে আইএনএ -র মাধ্যমে ‘জন গণ মন’ তাঁর হৃদয়ে গভীরভাবে পৌঁছেছিল এবং “our national anthem were the gifts of Subhas Bose.” The Nehru Archive
অতএব নেতাজীর ভূমিকা এখানে উপেক্ষা করা যায় না।
১৪. কিন্তু ‘শুভ সুখ চৈন’ এবং ‘জন গণ মন’-এর মধ্যে একটি রাজনৈতিক পার্থক্য থেকে যায়
রবীন্দ্রনাথ:
জনগণমন-অধিনায়ক ভারতভাগ্যবিধাতা → একটি চিরন্তন, অতীন্দ্রিয় পথপ্রদর্শককে সম্বোধন।
আইএনএ:
ভারত – তার প্রদেশসমূহ – তার জনগণ – ভেদাভেদ দূরীকরণ – আজাদ হিন্দ দেশ → একটি রাজনৈতিকভাবে মুক্ত, ঐক্যবদ্ধ জাতিরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ নির্মাণ।
একটি একাডেমিক অধ্যয়নও ‘জন গণ মন’ ও ‘শুভ সুখ চৈন’ -এর মধ্যে এই পার্থক্য— ভাষা, মনোভাব, রাজনৈতিক ব্যবহার এবং নিবেদন-এর স্তরে তুলনা করেছে। Teresian Journal of English Studies
১৫. এখানে একটি নতুন মাত্রা হোলো
“রবীন্দ্রনাথের ১৯১১-এর আধ্যাত্মিক-দার্শনিক জাতীয়তার ভাষা কি ১৯৫০-এর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ভাষা ছিল?” গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং এর উত্তর হ্যাঁ বা না—দুইভাবেই যুক্তি দিয়ে দেওয়া সম্ভব।
১৬. একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সার্বভৌম বিষয় হল জনগণ এবং রাষ্ট্র নিজে কোনও ব্যক্তিগত ‘অধিনায়ক’-এর অধীন নয়। সুতরাং জাতীয় সংগীতের ভাষায় দেশ, জনগণ, স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বকে সরাসরি সম্বোধন করা হলে তা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রচেতনার সঙ্গে অধিক প্রত্যক্ষ সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারত।
এটি একটি সংবিধানগত–সাংস্কৃতিক যুক্তি, কোনও ইতিহাস-বিরোধী বক্তব্য নয়।
১৭. কিন্তু এর বিপরীতে শক্তিশালী যুক্তিও আছে
একজন রবীন্দ্র-গবেষক বলতেই পারেন: ‘অধিনায়ক’ কোনও ব্যক্তি নন। তিনি জনগণের সমষ্টিগত মন-এর চিরন্তন পথপ্রদর্শক;
ভারতীয় সভ্যতার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা; কোনও সরকার বা রাজা নন; রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যক্তিগত প্রতিনিধি নন। সুতরাং গানটিকে রাজতান্ত্রিক বলা ভুল হবে।
কিন্তু এখানেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়।
রাজতান্ত্রিক না হলেও, একটি আধুনিক প্রজাতন্ত্র-এর জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে এমন অধিবাস্তব সার্বভৌম-এর ভাষা কি প্রয়োজনীয়? এটি এখনও একটি বৈধ দার্শনিক প্রশ্ন।
১৮. রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে অন্য কিছু কি ভাবতেন?
এটি আমরা কখনও প্রমাণ করতে পারব না। রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১ সালে মারা যান। ১৯৫০-এর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত তিনি দেখতে পাননি।
তবে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিবর্তন বিবেচনা করলে একটি বিষয় নিশ্চিত: তিনি জাতীয়তাবাদ-কে কখনও অন্ধ রাষ্ট্রপূজায় পরিণত করতে চাননি। তাঁর কাছে মানুষের মর্যাদা রাষ্ট্রের চেয়ে বড়। তাই তিনি ১৯৫০-এর ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত নির্বাচন নিয়ে কী মত দিতেন—তা বলা ইতিহাস নয়; তা অবাস্তব অনুমান।
কিন্তু “তিনি হয়তো পুনর্বিবেচনা করতেন”—এটি একটি চিন্তার সম্ভাবনা হিসেবে রাখা যেতে পারে।
১৯. তাহলে কি ‘জন গণ মন’ নির্বাচন ভুল ছিল?
না—এটিকে ঐতিহাসিক ভুল বলা যায় না।
কারণ ১৯৪৮-এর মধ্যে গানটি ইতিমধ্যেই:
ভারতীয় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত,
সামরিক ব্যান্ডে ব্যবহৃত,
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরীক্ষিত,
আইএনএ-র মাধ্যমে জনপ্রিয়,
এবং নেহরুর পছন্দের গান হয়ে উঠেছিল। The Nehru Archive
কিন্তু একই সঙ্গে বলা যায়:
১৯৫০ সালে অন্য একটি গান বেছে নেওয়ার বৌদ্ধিক সম্ভাবনা ছিল।
এবং নতুন শব্দচয়ন বা নতুন জাতীয় সঙ্গীত -এর সম্ভাবনাও ১৯৪৮-এ আলোচনার বাইরে ছিল না।
সুতরাং নির্বাচনটি অপরিহার্য ছিল—এমন দাবি করা যাবে না।
২০. সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপসংহার
এভাবে করা যায় :
ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’ হওয়া কোনও ব্রিটিশ রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকারকে সচেতনভাবে পুনরুজ্জীবিত করার ফল—এমন প্রমাণ নেই। বরং প্রাথমিক নথি দেখায় যে গানটির নির্বাচন ক্রমশ তার পূর্ববর্তী জাতীয় ব্যবহার, আইএনএ-র মাধ্যমে জনপ্রিয়তা, সামরিক ও আন্তর্জাতিক পরিবেশনযোগ্যতা এবং জওহরলাল নেহরু -র ব্যক্তিগত পছন্দের ফলে একটি প্রায় স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু— এই সিদ্ধান্তের নথিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিতি আছে: ‘অধিনায়ক’ ও ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’-র ধারণা একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত—এই প্রশ্নটি প্রায় আলোচিত হয়নি।
শেষ কথা:
“স্বাধীনতার পর ভারত তার জাতীয় আত্মপরিচয় কোন ভাষায় নির্মাণ করতে চেয়েছিল—একজন চিরন্তন অধিনায়কের নেতৃত্বে, নাকি জনগণ ও দেশের নিজস্ব সার্বভৌম অস্তিত্বকে কেন্দ্র করে?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ‘জন গণ মন’, ‘শুভ সুখ চৈন’, বন্দে মাতরম। কান্ডারী হুঁশিয়ার, এবং ১৯৪৮–৫০-এর রাষ্ট্রীয় নথি—সবকটিকে একই হিস্টোরিক্যাল ফ্রেম -এ রাখতে হয়।
আইএনএ যখন একই রবীন্দ্র-সুরকে স্বাধীনতার গান হিসেবে পুনর্লিখন করলো, তখন ‘অধিনায়ক’-কে সরিয়ে ‘দেশ’কে সামনে আনল। অথচ স্বাধীন ভারত ১৯৫০ সালে আবার মূল ‘অধিনায়ক’-সহ গানটিকেই গ্রহণ করল।
এটি কোনও ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নয়। কিন্তু একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অধিনায়ক না ভারত? স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীতের ভাষা নিয়ে একটি প্রশ্ন যার উত্তর পাওয়া যায় নি।
আলোচনা 2 comments