সিন্ধু জলচুক্তি:
সময়, ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস। স্থান পশ্চিম পাঞ্জাবের কোনো একটি গ্রাম (পাকিস্তান)। খবর আসে ভারত নদীর জল আটকে দেবে। কৃষিপ্রধান গ্রামে খবরটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। মহিলাদের মধ্যে কথা ওঠে, নদীর জল বন্ধ করে দেবে? এও কি সম্ভব? এ কি ঘরের জোয়ান মেয়ে যে ঘরেই আটকে রাখবে? পঞ্চায়েত বসে, নেহরু সহ ভারত সম্বন্ধে কুকথা ওঠে পঞ্চায়েত প্রধানের মুখে আর প্রতিধ্বনিত হয় মুখে মুখে। এরই মধ্যে এক যুবক বলে ওঠে, আমাদের করনীয় কি সেটা ভাবা হোক, গালাগালি দেয়ার সময় পাওয়া যাবে অনেক। ওরা আমাদের বন্ধু নয়, তাই আমাদের জন্য বাগান সাজিয়ে দেবে না, ওদের জায়গায় আমরা হলে একই কাজ করতাম না কি?......... 'ইয়েজিদ', সাদাত হাসান মানটো।

স্বাধীনতার প্রায় আট মাস পর ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদীর জলবন্টন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় । ভারতের পূর্ব পাঞ্জাব প্রদেশ সরকার আপার বারি দোয়াব খালের প্রধান শাখা এবং ফিরোজপুর দীপালপুর খালের মাধ্যমে পাকিস্তানের পশ্চিম পাঞ্জাব প্রদেশে প্রবাহিত জল সাময়িক বন্ধ করে দেয়।
ভারত বিভাগের ফলে সিন্ধু নদী এবং তার পাঁচটি উপনদী নিয়ে গঠিত সিন্ধুনদী ব্যবস্থা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সীমানা আলোচনার সময় স্যার সিরিল ৱ্যাডক্লিফ জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, নদীর জল যৌথ ব্যবস্থাপনার অধীনে রাখা যেতে পারে কিনা। কিন্তু সীমান্ত কমিশনে পাকিস্তানি বা ভারতীয় প্রতিনিধিরা কেউই এই প্রস্তাবে রাজি হননি। ফলত: নদী গুলির নিয়ন্ত্রণ পূর্ব পাঞ্জাব সরকারের তথা ভারত সরকারের অধীন ছিল।
রবি নদী এবং শতদ্রু নদী পূর্ব পাঞ্জাব থেকে পশ্চিম পাঞ্জাবে প্রবাহিত হয়। দেশভাগের সময় মাধবপুর হেডওয়ার্কশে রবি নদীর একটি বাঁধ ছিল। এবং উচ্চ বারি দোয়াব খাল বরাবর জল প্রবাহিত হতো, যা অমৃতসর এবং লাহোর শহরগুলিতে জল সরবরাহ করতো। পাশাপাশি পাঞ্জাবের উভয় অংশের বিশাল অঞ্চলগুলিতে সেচের জল সরবরাহ করতো। ফিরোজপুরে শতদ্রু বাঁধ দেওয়া হয়েছিল যার দীপালপুর খাল পশ্চিম পাঞ্জাব প্রদেশে জল বহন করত। পূর্ব পাঞ্জাব সরকারের অধীনে এই খালগুলির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল।
পূর্ব পাঞ্জাব এবং পশ্চিম পাঞ্জাবের প্রকৌশলীরা ১৯৪৭ সালের ২০ ডিসেম্বর একটি স্থিতাবস্থা চুক্তি (standstill agreement) স্বাক্ষর করেন। যার অর্থ রবি ফসলের সময় পশ্চিম পাঞ্জাবে জল সরবরাহ ৩১ মার্চ পর্যন্ত বজায় থাকবে। পশ্চিম পাঞ্জাব সরকার তার জন্য অর্থ প্রদান করবে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আরও একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে পাকিস্তান অবহেলা করে। বকেয়া অর্থ দেয় না এবং ভারত বিরোধী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। ১ লা এপ্রিলে পূর্ব পাঞ্জাব সরকার পশ্চিম পাঞ্জাব প্রদেশে জল প্রদান বন্ধ করে দেয়। সেই সময় প্রদেশগুলির একের অপরের প্রতি ক্ষমতা প্রয়োগ করার অন্যতম কৌশল ছিল জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া। পাকিস্তান আলোচনার জন্য আন্ত:-আধিপত্য চুক্তি (inter-hegemony agreement) সম্মেলনে যোগ দিতে রাজি হলে এটি পুনরায় চালু করা হলেও ভারতীয় পদক্ষেপ পাকিস্তানে গভীর আশঙ্কা সৃষ্টি করে যা শেষ পর্যন্ত ১৯৬০ সালে সিন্ধু জলচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সমাধান করা হয়।
২২ এপ্রিল ২০২৫ পহেলগাঁওন, কাশ্মীরের বৈশরণ উপত্যকায় সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমনে ২৬ জন সাধারণ ভারতীয় টুরিস্টদের সাথে একজন স্থানীয় কাশ্মীরির নির্মম হত্যার পরিপ্রেক্ষীতে ভারত সরকার ২৩ এপ্রিল ঘোষণা করে যে, “রক্ত ও জল একসাথে প্রবাহিত হতে পারে না”, এবং ১৯৬০ সালের সিন্ধু উপত্যকার নদীগুলির ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে জল বন্টন চুক্তি স্থগিত করে। এই সিদ্ধান্ত উচিৎ কি উচিৎ নয়, সিন্ধু উপত্যকার পশ্চিম দিকের নদীগুলি যেমন সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাবের জল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া সম্ভব কি অসম্ভব সেকথায় আসার আগে চলুন একটু ফিরে দেখি সিন্ধু উপত্যকার নদী ও তার জল বন্টনের ইতিহাস।

মানব সভ্যতা এক একটি নদীর ধারাপথ অনুসরণ করে চলে। নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠে সংস্কৃতি ও সভ্যতা। যেমন মহাসিন্ধু, বিতস্তা, কৃষ্ণগঙ্গা বা চেনাব ও উপসিন্ধু ও জম্মু হিমাচল পাঞ্জাবের যেমন চন্দ্রভাগা ইরাবতী, বিপাশা ও শতদ্রু। এই নদী গুলির পার্বত্য জলধারা তীরের মতো হাজার হাজার বছর ধরে এক একটি পর্বতকে দীর্ণ বিদীর্ণ করে যখন নিচের দিকে নামে, তখন সে নদ বা নদীতে পরিণত হয়। এই বিদারণ বা ভাঙ্গন বড় বড় উপত্যকা সৃষ্টি করে চলে। সেই উপত্যকাই মানব সভ্যতার আদিবাসগৃহ।
সিন্ধু উপত্যকা ভারত মহাদেশের প্রবেশদ্বার। নদীর জলধারার প্রাচুর্য ঐ অঞ্চলে বসতী স্থাপনের অনুকূল। সেকারণে হাজার হাজার বছর ধরে ঐ অঞ্চলে মানব বসতী গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কাররই মনে নদী দখলের ধারণা গড়ে ওঠেনি। চাহিদা সীমিত হওয়া হয়তো একটা অন্যতম কারণ ছিল সেকালে।
যে মূল নদীগুলি সিন্ধু উপত্যকার জলভান্ডার সেগুলি হোলো পশ্চিমের সিন্ধু, ঝিলাম, চেনাব এবং পূর্বের বিয়াস, রবি ও সুতলেজ। এছাড়াও পুরাকালে সরস্বতী নামক অপর একটি নদী ছিল, যা বর্তমানে অদৃশ্য। এই পার্বত্য খরশ্রোতা নদীগুলি সম্বন্ধে আগে একটু জেনে নেয়া যাক।
সিন্ধু: সিন্ধুনদী (৩১৮০ কিমি ) তিব্বতের মানস সরোবরের কাছে বোখার-চুল গ্লেসিয়ার থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ডেমচকের কাছে ভারতের লাদাখে প্রবেশ করে। পরে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্থানের গিলগিট পর্বত শ্রেণীর নাঙ্গা পর্বতের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে চিলাসের কাছে পাকিস্থানে প্রবেশ করে ও প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে প্রবেশ করে।

ঝিলাম: জম্মু কাশ্মিরের ভেরিনাগ পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে কাশ্মিরের উলার লেক স্পর্শ করে ভারত পাকিস্তান মধ্যবর্তী স্থান মঙ্গলার কাছে পাকিস্তানে প্রবেশ করে এবং চেনাব নদীর সাথে মিলিত হয়। এই নদীর দৈর্ঘ্য ৭২৫ কিমি।
চেনাব: ৯৭৪ কিমি দীর্ঘ এই নদীটি হিমাচল প্রদেশের বড়লাচা-লা-পাস থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রথমে চন্দ্র ও ভাগা দুটি নদীতে বিভক্ত হয়। অনতিদূরে লাহল স্পিতি জেলার কেলঙ এর কাছে পুনরায় মিলিত হয়ে কাশ্মীরে প্রবেশ করে চেনাব নামে। অনেকে একে চন্দ্রভাগা নদীও বলে থাকে। চেনাব কাশ্মিরের ওপর প্রবাহিত হয়ে পিরপাঞ্জালের(বর্তমানে বেনিহাল) কাছে পাকিস্তানে প্রবেশ করে এবং সিন্ধু নদীতে মেশে।
রবি (ইরাবতী): ৭২০ কিলোমিটার দীর্ঘ রবি হিমাচল প্রদেশের কাঙ্গরা জেলার রোহতাং পাস থেকে উৎপন্ন হয়ে পাঞ্জাব জম্মুর সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে লাহোরের কাছে পাকিস্তানে প্রবেশ করে এবং চেনাব নদীর সাথে মিলিত হয়।
বিয়াস: ৪৭০ কিমি দীর্ঘ বিয়াস বা বিপাশা হিমাচল প্রদেশের রোহতাঙ্গ পাসের বিয়াস কুন্ড থেকে উৎপন্ন হয়ে কুলুর কাছ দিয়ে বয়ে পাঞ্জাবে প্রবেশ করে এবং হরিকে নামক স্থানে সুতলেজ নদীর সাথে মিলিত হয়।
সুতলেজ (শতদ্রু) : ১৪৭০ সুদীর্ঘ পথ চলা শতদ্রু মানস সরোবরের কাছে রাক্ষসতাল ঝিল থেকে উৎপন্ন হয়ে হিমাচল ও পাঞ্জাবে প্রবাহিত হয়। এর ওপর ভাকড়া ড্যাম ও গোবিন্দ সাগর ঝিল গঠিত। পাঞ্জাবে লুধিয়ানার পাস দিয়ে বয়ে সুতলেজ হরিকে নামক স্থানে বিয়াসের সাথে মিলিত হয়। হরিকে ব্যারেজ থেকেই ভারতের সর্ববৃহৎ ক্যানাল ইন্দিরা গান্ধী কানাল অবস্থিত।

১৮৫০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ধীরে ধীরে (বর্তমান ভারত ও পাকিস্তান অন্তর্গত) সিন্ধু অঞ্চলের নদীগুলিকে জোড়ার জন্য খালের জাল বিছানো হয় এবং সিন্ধু অঞ্চলটি পৃথিবীর সর্বাধিক সিঞ্চিত ক্ষেত্র হিসেবে পরিণত হয়। ইংরেজ অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সিন্ধু নদীর তীরেই প্রথমে বসতি স্থাপন করে। "ব্লাড এন্ড ওয়াটার” বইতে ডেভিড গিলমার্টিন লিখেছেন কিভাবে ইংরেজরা সিন্ধু নদীর তীরে বসতি স্থাপন করার পর উপলব্ধি করে যে এই অঞ্চলে, বিশেষত পাঞ্জাবে, আধিপত্য বিস্তার করতে গেলে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জল সেচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে হবে।
১৮৪৫-৪৬ শতদ্রু (sutlej) নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে আধিপত্য স্থাপনের জন্য ফিরোজপুরের নিকটে প্রথম ইঙ্গ শিখ যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধের স্মৃতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ তাদের যুদ্ধজাহাজের নাম রাখে HMS SUTLEJ এবং স্বাধীনতার পর ভারত তার একটা যুদ্ধজাহাজের নামকরণ করে INS SUTLEJ, ঐতিহাসিকগণের অনেকের মতে এই যুদ্ধটি হয়েছিল মূলত শতদ্রু নদীর বিস্তীর্ণ উপত্যকার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে আধিপত্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে। তৎকালীন বিভিন্ন লেখকের পুস্তকে এমন বর্ণনা পাওয়া যায়।
এলিস আলবানিয়ার বই “এম্পায়ার অফ ইন্দাস” -এ লেখক বলছেন যে ইংরেজরা সিন্ধুর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের উপানিবেশবাদের বিস্তার করার জন্য সিন্ধু অঞ্চলের নদীগুলিকে ব্যবহার করেছে। সিন্ধু নদীর তীরে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট আসেন। নদীগুলির তীরে ছোট বড় শহর স্থাপিত হয়। এই নদীগুলি ভারত ও পাকিস্তানকে জুড়ে রাখে। আবার এই নদীগুলিকেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিয়ত্রণও করা হয়। সাদাত হাসান মানটো তার রচনা “ইয়েজিদ”-এ লিখছেন, কিভাবে স্বাধীনতা উত্তর ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর সাথে জল সরবরাহ বন্ধের খবর গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

অজয় সোডানির লেখা পুস্তক “এক থা জাসকার” এ লেখক দেখাচ্ছেন যে মোঘল আমল থেকে জলসেচের কারণে ও ব্রিটিশ দ্বারা নদী ও তার জলকে কূটনীতির উদ্দেশ্যে কিভাবে বাঁধ ও খালের দ্বারা নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা ঐ অঞ্চলে ধ্বংস ডেকে নিয়ে এসেছে বারে বারে। তার সাথে বদল হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্যবাদের সমীকরণ। বাঁধের গঠন কিভাবে স্থানীয় এলাকার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে। যার কারণে বাঁধের খবর ঐ অঞ্চলে আতঙ্ক নিয়ে আসতো। বর্তমানকালের মতো সেই সময়কালেও বাঁধের অপর নাম ছিল আতঙ্ক। জনসাধারনের কাছে বাঁধ ছিল শত্রু সম।
ডেভিড গিলমার্টিন তার পুস্তক “ব্লাড এন্ড ওয়াটার”-এ উল্লেখ করেছেন, কোটি কোটি বছর ধরে সিন্ধুর নদীগুলি হিমালয় থেকে সমতল অবধি বিস্তৃত ছিল। সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলি ছিল ঈশ্বরের দান। যুগ যুগ ধরে কেউ জানতো না যে সিন্ধু ও বাকি পাঁচ নদীর মালিক কে? ঐ অঞ্চলে, বিশেষত পাঞ্জাব প্রদেশে নদীর জলের অধিকার নিয়ে রাজা মজারাজা ও বিভিন্ন জমিদারদের মধ্যে ছোট বড় রক্তক্ষয়ী লড়াই চলতেই থাকতো।
প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পরে ব্রিটিশ সরকার শুরুতেই বুঝে গেছিলেন যে শান্তি বজায় রাখার সাথে আধিপত্য বজায় রাখতে নদী জলবন্টনের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে হবে। লর্ড ডালহৌসির আমলে পাঞ্জাবে প্রথম স্থাপনা করা হোলো PWD, পরবর্তী পর্যায় স্বাধীনতা উত্তর সময়ে সেটি CPWD নামে পরিচিত হয়। নদী ও তার জলের নিয়ত্রন ঈশ্বর আল্লার থেকে নিবেশিত হোলো ইঞ্জিনিয়ারদের হাতে।
প্রবোধ সান্যাল তার পুস্তক “উত্তর হিমাচল চরিত”-এ লিখছেন, কাশ্মীরকে নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যারা একের পর এক হিংস্র সংগ্রাম করে এসেছে তাদের প্রত্যেকটি দ্বন্দ্বের মূল কারণ ছিল কাশ্মীরের মোট আড়াই হাজার বর্গ কিলোমিটার সমতল ব্যাপী মৃন্ময় কোমল উপত্যকার উপর আধিপত্যলাভ। হুন, তাতার, তুর্কি, মোগল, পাঠান, আফগান, ইরান সকলের ওই একই লোভ। শুধু কাশ্মীরের পাহাড়গুলি দখল করে কেউ খুশি থাকে না। পাহাড়ের বন সম্পদ লাভ করেও কেউ তুষ্ট নয়, এই উপত্যকাটুকু তাদের চাই। দুর্ভাগ্যের কথা সেই চিরকালের দ্বন্দ্বটি আজও শেষ হয়নি।
লেখক গিলমার্টিন সিন্ধু নদী উপত্যকায় মোঘলদের সময়ে এবং তার পরবর্তী ব্রিটিশ শাসনকালে দীর্ঘ সময়কালে এই উপত্যকায় বিভিন্ন খাল ও প্রযুক্তির দ্বারা যে সেচের বিস্তার হয়েছে এবং তার প্রভাব অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে যে প্রভাব ফেলেছে তার বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে জলের বিভাজন ও সেই নিয়ে রাজনৈতিক জীবনে যে প্রভাব পড়েছে জওহরলাল নেহরু শুরুতে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন যে এই নদী উপত্যকায় জলের অধিকার ও জলের পরিচিতি নির্ভর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি গড়ে উঠতে পারে। আর সেটাই হয়েছিল। নেহেরু ভাকরা লাঙ্গল বাঁধকে সিন্ধু জলচুক্তির বাইরে রেখেছিলেন। কারণ ভারত সিন্ধুর পূর্বঘাটির নদীগুলোর দখল রাখতে চেয়েছিল। উপত্যকার নদীর জল নিয়ে সংঘর্ষে, বিশেষত পাঞ্জাব প্রদেশে খালিস্থানি আন্দোলনের অন্যতম দাবী ছিল নদী ও জলের অধিকার, যা স্বাধীনতার ৭৭ বছর পরেও একইভাবে বিদ্যমান।
সিন্ধু উপত্যকার নদীর জল ও তার অধিকার নিয়ে লড়াই ও রক্তপাত প্রাক স্বাধীনতা আমল থেকে এতই প্রবল ছিল যে কারণে গিলমার্টিন তার বইয়ের নামকরণ করেন “ব্লাড এন্ড ওয়াটার”।
পাঞ্জাবি কবি অমৃতা প্রীতম তার কবিতায় লেখেন-
"ওঠো! হে শোকের বর্ণনাকারী;
ওঠো! তোমার পাঞ্জাবের দিকে তাকাও
আজ, মাঠগুলো মৃতদেহে ছেয়ে আছে,
আর রক্তে ভরে গেছে চেনাব
কেউ পাঁচ নদীর প্রবাহে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে
তাদের মারাত্মক জল এখন
আমাদের জমিতে প্রচুর পরিমাণে সেচ দিচ্ছে".
সাম্প্রতিক কেন্দ্র সরকারের সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিতের পর সিন্ধু ঘাঁটির রবি ও শতদ্রু নদীর জলের ভাগ নিয়ে রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টি হয়েছে। বিবাদ রয়েছে ভারতেরই দুটি অঙ্গরাজ্য পাঞ্জাব আর হরিয়ানার মধ্যে। পাঞ্জাব রবি নদীর ওপর গঠিত রঞ্জিত সাগর বাঁধের জল হরিয়ানাকে দেয়া বন্ধ করে বলেছে যে রঞ্জিত সাগর বাঁধের জল অনেক কমে যাওয়ার কারনে সে হরিয়ানাকে জল দিতে পারবে না। শতদ্রু নদীর ওপর রয়েছে ভাকরা লাঙ্গল বাঁধ। এ ছাড়াও শতদ্রু ও যমুনা নদীর সংযুক্তি নিয়েও বিবাদ দিল্লি অবধি পৌঁচেছে দীর্ঘকাল ধরে। ১৮৫০ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে সিন্ধু নদী উপত্যকা বিশ্বের অন্যতম সেচ সমৃদ্ধ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেই কারণেই পরবর্তী সময়ে কেন্দ্র সরকার পাঞ্জাব প্রদেশে কৃষির ওপর সবুজ বিপ্লব, green revolution নামক পরীক্ষা করে। যার পরিনাম ও ক্ষয় ক্ষতির হিসেব আজও গুনছে ঐ অঞ্চলের কৃষককূল।

সিন্ধু জলচুক্তি:
১৯৪৮ সালে সাময়িক জল বন্ধ করে দেয়ার ফলস্বরূপ পাকিস্তান নতুন জলাধার তৈরির প্রয়োজনের মুখোমুখি হয় এবং জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য ইঞ্জিনিয়ারদের তলব করে। ফিরোজপুরের পাশ দিয়ে গোপালপুর খালের সাথে একটি শতদ্রু সংযোগ প্রণালী নির্মাণ করে এবং ঝিলাম এবং চেনাব নদী থেকে জল পরিবহন এবং ভারত নিয়ন্ত্রিত জল সরবরাহ এর উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করার জন্য বাড়ি বারি দোয়াব সংযোগকারী চ্যানেল যা অবশেষে বিআরবি খাল নামে অভিহিত, গঠন করা হয়েছিল।
এই বছরগুলিতে ভারতের জলনীতির প্রতি পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইন মতবাদের ভিত্তিতে জলের অধিকার দাবি করার ক্ষেত্রে দৃঢ়তা আনে। দেশভাগ সত্ত্বেও তারা ভারতের সাথে ভাগ করা একটি নদী অববাহিকার প্রতি ঐক্য কল্পনা করতে থাকে অথচ ভারত বিরোধি কার্যকলাপ চালাতে থাকে। ১৯৫১ সালের মধ্যে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
সিন্ধু জলচুক্তি কেন হয়েছিল:
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের ফলে সিন্ধুনদী ব্যবস্থা যা দীর্ঘদিন ধরে বিশাল কৃষি জমি সেচ করে আসছিল, ভারত উপরের নদীগুলির আর পাকিস্তান নিম্ন নদীগুলির মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালের মধ্যে ভারতের নদীর জল ব্যবহার নবগঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। সেই সময়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল কিন্তু পাকিস্তান বলেছিল এটি ঝুঁকিপূর্ণ।

১৯৫৬ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু শতদ্রু নদীর উপর ভাকরা বাঁধ জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে এবং যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়। ‘টেক আপ আর্মস’ এবং ‘ব্ল্যাক ডে’ লাহোরের উর্দু সংঘাতপত্রের শিরোনাম হয়ে ওঠে। উল্লেখ করেছেন ভারতীয় আলোচক এবং কারিগরি উপদেষ্টা নিরঞ্জন দাস গুলাটি। চ্যালেঞ্জটি ছিল বিশাল। দুটি প্রতিকূল প্রতিবেশীর মধ্যে একটি একক সমন্বিত জল ব্যবস্থা ভাগ করে নেওয়া। সমাধানটি সিন্ধু জলচুক্তির রূপ নেয়। যা পরবর্তীতে সবথেকে জটিল আন্তর্জাতিক জলবন্টন চুক্তি গুলির মধ্যে একটি হয়ে ওঠে।
আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এবং সিন্ধু জলচুক্তির প্রথম বাধা:
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১৯৫২ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হয়, প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমে এগিয়ে যায়। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত উভয় দেশের প্রকৌশলীদের একটি কর্মী দল বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে প্রযুক্তিগত প্রস্তাব তৈরি করে।১৯৫৪ সালের তাদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করে যেখানে একটি বিভাগের পরামর্শ দেওয়া হয় যে, ভারত পূর্বনদীর এবং পাকিস্তান পশ্চিম নদীগুলির একচেটিয়া ব্যবহার পাবে।
পাকিস্তান নীতিটি মেনে নিয়েছিল কিন্তু পূর্বাঞ্চলীয় নদীর জলের ক্ষতিপূরণের জন্য একটি বিশাল প্রতিস্থাপন পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছিল এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিরাট অংকের অর্থ দাবী করেছিল।ভারত বলে যে তারা এই পুরো পরিকল্পনার জন্য অর্থায়ন করবে না, যার ফলে একটি অচল অবস্থা সৃষ্টি হয়।
নিরঞ্জন দাস গুলাটি তার ১৯৭৩ সালের বই “সিন্ধু জল চুক্তি আন্তর্জাতিকতা একটি অনুশীলন” বইতে উল্লেখ করেছেন,-
১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে আলোচনা বারবার স্থগিত হয়ে যায় ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই তাদের অবস্থানে অটল ছিল। ১৯৫৯ সালের আগে পর্যন্ত কোন অগ্রগতি সম্ভব বলে মনে হয়নি। সেই বছর বিশ্বব্যাংকের (তখন আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক নামে পরিচিত) কর্মকর্তারা যার মধ্যে ব্যাংকের সভাপতি ইউজিন ব্ল্যাক এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ডব্লিউ বি ইউ বিলিফ ছিলেন। তারা নয়া দিল্লী, করাচি ওয়াশিংটন ডিসি এবং লন্ডনের মধ্যে নিবিড় শাটেল কূটনীতি পরিচালনা করেন।
পাকিস্তানের আর্থিক বোঝা ভাগাভাগি করায় ভারত প্রতিরোধ করেছে। পাকিস্তানের সাহায্যের দাবির মূলে ছিল পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলি দ্বারা জল ব্যবহার সরবরাহ কাল এবং তাদের নেটওয়ার্কগুলিতে প্রবেশাধিকার হারিয়ে ফেলা যার কিছু head work তখন ভারতে স্থাপন করা হয়েছিল। কৃষি কাজে টিকে থাকার জন্য পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী গুলির সংযোগের জন্য নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে হয়েছিল।

সংযোগ খাল এবং ব্যারেজ আনুমানিক ব্যয় এক বিলিয়ন ছাড়িয়ে গিয়েছিল।বিশ্ব ব্যাংক বৃহৎ শক্তিগুলোর কাছ থেকে অবদান চাইতে শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং জার্মানি তহবিলের প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলির উপর একচেটিয়া অধিকার অর্জনকারী ভারত কোন অবদান রাখতে সম্মত না হলে চুক্তিটি এগিয়ে যেতে পারেনি। ভারত প্রথমে প্রতিরোধ করেছিল কিন্তু বিশ্ব ব্যাংক যুক্তি দিয়েছিল যে ভারত একচেটিয়া অধিকার অর্জনের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছে এবং তাই প্রতিস্থাপন খরচের একটি অংশ তাদের বহন করা উচিত। ব্যাংকার স্পষ্ট করে বলেছে যে ভারতের অবদান ছাড়া চুক্তিটি ভেঙে যাবে।
নিরঞ্জন দাস গুলাটি তার বইতে লিখেছিলেন যে, এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে ওয়াশিংটন ত্যাগ করার আগে বিলিফ আমাকে বলেছিলেন যে, ব্ল্যাক প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে প্রস্তাব দেবেন যে পাকিস্তানের নির্মাণ কার্যের খরচের জন্য ভারতকে তার অবদান হিসেবে ২৫০ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে। আমি বলেছিলাম যে এটি অনেক বেশি। নয়া দিল্লিতে ঘোড়া কেনাবেচার পরিমাণ ১৫৮ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যা আমরা ন্যায্য বলে মনে করছি। বন্ধ দরজার আড়ালে বিলিফ এবং তৎকালীন অর্থ সচিব বি কে নেহেরু সহ ভারতীয় কর্মকর্তারা সংখ্যাগুলো নিয়ে বিতর্ক করেছিলেন। অনেক আলোচনার পর তারা ১৭৪.৮ মিলিয়ন ডলারের মীমাংসা করে এবং ভারত ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত সিন্ধু অববাহিকা উন্নয়ন তহবিলে ১০টি সমান বার্ষিক কিস্তিতে অর্থ প্রদান করবে। এই তহবিল পাকিস্তানের মঙ্গলা বাঁধ এবং বিভিন্ন সংযোগ খালের মত বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প গুলিতে অর্থায়ন করেছিল। সিন্ধু অববাহিকা উন্নয়ন পরিকল্পনার অধীনে পাকিস্তানের প্রতিস্থাপন কাজের জন্য ভারতের অবদান বিশেষভাবে নির্ধারিত ছিল। সুতরাং সিন্ধু চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত থেকে পাকিস্তানে শুধু জলই নয় অর্থও প্রবাহিত হয়েছিল।
সিন্ধু অববাহিকা উন্নয়ন তহবিলে চূড়ান্ত অবদান:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র - ৩১৫ মিলিয়ন ডলার
বিশ্বব্যাঙ্ক - ২৫০ মিলিয়ন ডলার
যুক্তরাজ্য - ৯০ মিলিয়ন ডলার
কানাডা - ৭০ মিলিয়ন ডলার
অস্ট্রেলিয়া - ২০ মিলিয়ন ডলার
পশ্চিম জার্মানি - ১২ মিলিয়ন ডলার
নিউজিল্যান্ড - ৬ মিলিয়ন ডলার
ভারত - ৬২ মিলিয়ন ডলার (৮০ কোটি)
পাকিস্তান
(স্ব-অর্থায়নে) - ১০০ মিলিয়ন ডলার
---------------------------------------------------------------------
মোট আনুমানিক খরচ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার
১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সাথে সিন্ধু জলচুক্তি সাক্ষর করে বিশ্বব্যাপী জল কূটনীতির বিজয় হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল। একটি চুক্তির জন্য ভারত কেবল নদীতেই নয় পয়সাতেও মূল্য পরিশোধ করেছে। সিন্ধু চুক্তির পেছনে লুকিয়ে আছে ভারত কিভাবে পাকিস্তানে জল পরিকাঠামোর অর্থায়ন করেছিল। এবং পাকিস্তান অনবরত প্রতিশোধ করে আসছে শত্রুতার মাধ্যমে।

“আমি বিভিন্ন গ্রুপ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সরকারের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের জন্য আমার পরিশ্রম করে গেছি”। অধৈর্য হয়ে বলেন বিশ্ব ব্যাংকের সভাপতি ইউজিন ব্ল্যাক। তিনি আরও বলেন, তিনি ১৯৫৯ সালের এপ্রিলে ভারতীয় ও পাকিস্তানী আলোচকদের বলেছিলেন যে, “সিন্ধুনদীর জলচুক্তি নিয়ে অচল অবস্থা ভাঙতে তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু সময় ফুরিয়ে আসছিল এবং আট বছর ধরে আলোচনার পরও সম্ভাব্য সিন্ধুজল চুক্তির জন্য একটি সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি”।
ভারত এবং অন্যান্য দাতা দেশ গুলি এক বিলিয়ন ডলার (আজ ১০ বিলিয়ন ডলার মুদ্রাস্ফীতির হার হিসাব করে) দিতে সম্মত হওয়ার পরই এই অচলাবস্থার অবসান ঘটে। এই দশ বিলিয়ন ডলারের এর মধ্যে ভারত পাকিস্তানকে ১৭৪ মিলিয়ন ডলার(আজ ১.৬ বিলিয়ন) দিয়েছে। এর ফলে ১৯৬০ সালে সিন্ধু জলচুক্তি স্বাক্ষরের পথ প্রশস্থ হয়। চুক্তির অধীনে পাকিস্তানকে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী যেমন সিন্ধু, চেনাব এবং ঝিলামের উপর একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয়েছিল। যেখানে ভারত পূর্বাঞ্চলীয় নদী রবি, বিয়াস এবং শতদ্রুর অবাধ ব্যবহার বজায় রেখেছিল। যদিও কোটি কোটি গ্যালন জলের সাথে দশ বছর ধরে পাকিস্তানে প্রবাহিত হতে থাকে ভারতের লক্ষ লক্ষ ডলার। যা পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলিতে ভারতের একচেটিয়া অধিকারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে।
প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময় পর সিন্ধু জলচুক্তি আবার আলোচনায়। কাশ্মীরের পাহেলগাঁও এর ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিতের ঘোষণা করে। পাকিস্তানি ও পাকিস্তান প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা ২৬ জন নাগরিককে হত্যা করে, যাদের বেশিরভাগই পর্যটক। নয়া দিল্লী বলেছে যে পাকিস্তানের পদক্ষেপ সিন্ধুচুক্তির সদিচ্ছা এবং বন্ধুত্বের মূলনীতি লঙ্ঘন করেছে। পাকিস্তান অপবর্তনীয়ভাবে ক্রমাগত সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন করার জবাব স্বরূপ চুক্তিটি স্থগিত রাখা হয়। ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরের পরে এই প্রথমবারের মতো ভারত চুক্তিটি স্থগিত করেছে।।
চুক্তি আপাতত স্থগিত। যদিও আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে নদীর জলপ্রবাহ আটকে দেয়া অনুচিৎ কিন্তু যে প্রতিবেশীর সাথে বণ্টনচুক্তি রয়েছে সেখানে সিন্ধু জলচুক্তি শুধুমাত্র নদীর জলচুক্তিই নয় তা আসলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে শান্তিস্থাপন প্রস্তাবও বটে। স্থগিত চুক্তিটি তার সীমা অতিক্রম করে গেছে।

বিশ্বউষ্ণায়নের সময়কালে যেখানে প্রায় সব দেশ মিঠা জল আটকানোর প্রকল্পে ব্যাস্ত সেখানে বিশ্ববাসীর চোখ থাকবে দুটি যুযুধান দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী সেই সিন্ধু জলচুক্তির দিকে। সিন্ধু জলচুক্তি প্রমাণ করে যে, জটিল রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেও প্রাকৃতিক সম্পদ ভাগাভাগির ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্ভব। এটি শুধু একটি জলবন্টন চুক্তি নয়। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।
অতএব, সিন্ধু জলচুক্তিকে একটি স্থির চুক্তি হিসেবে নয় বরং একটি প্রগতিশীল পরিকাঠামো হিসেবে দেখা প্রয়োজন, যা সময় এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান করতে সক্ষম। ২০২৬ সালের জলবণ্টনের চুক্তির পুনঃনবীকরণ কোন দিশা নিদের্শ করে সেটাই দেখার।
ছবির সূত্র: এআই দিয়ে তৈরী করা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
সবার আগে আলোচনায় যোগ দিন।