তৃষ্ণার প্রকৌশল: নদী সংযোগ প্রকল্প ও জলবিদ্যুতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল্য
বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো বাজি ধরছে প্রকৌশলের এক প্রাচীন কল্পনায়: যাতে নদীগুলোকে অন্যদিকে প্রবাহিত করা যায়, একে অপরের সঙ্গে জোড়া লাগানো যায়, আর অর্থনৈতিক যুক্তির নির্দেশ মতো চলিত করা যায়। নদী সংযোগ—অর্থাৎ বড় মাত্রায় এক নদী থেকে জল টেনে নিয়ে অন্য নদী অববাহিকাগুলির মধ্যে জল সরানো—জল সংকটের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর সমর্থকেরা খরা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, শহরের মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর জরুরী প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।কিন্তু এই প্রযুক্তিগত বাগাড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এমন কিছু প্রবণতা যা অস্বস্তিকরভাবে বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, গঙ্গার সমভূমি থেকে ব্রাজিলের সের্তাঁও, ইয়াংৎসে উপত্যকা থেকে মৃত আরাল সাগরের অবশিষ্টাংশ পর্যন্ত। অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির লাভ ভোগ করে শহর ও কৃষি-ব্যবসাগুলি। পরিবেশগত ধ্বংস জমা হয় বাস্তুতন্ত্রে। মানবিক মূল্য চাপিয়ে দেওয়া হয় সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর— যারা সেই নতুন খালের জল কোনওদিন ছুঁতেও পারে না।
সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও তাদের অসম বাস্তবতা
নদী সংযোগের যুক্তি তার সরলতার জন্যই মোহময়: যে নদীগুলিতে ‘অতিরিক্ত’ জল আছে সেখান থেকে তা সরিয়ে নিয়ে ‘ঘাটতি’ অঞ্চলগুলিতে পৌঁছে দিলেই সমৃদ্ধি চলে আসবে। এই প্রসঙ্গে সাফল্য হিসাবে চীনের সাউথ-নর্থ ওয়াটার ট্রান্সফার প্রকল্প (SNWTP)- এর কথা উল্লেখ করা যায় যা ২০১৪ সাল থেকে চালু রয়েছে। এর পূর্ব ও মধ্য রুট এখন প্রতি বছর প্রায় সাড়ে নশো কোটি ঘনমিটার জল সরবরাহ করছে বেইজিং, তিয়ানজিন ও আশপাশের প্রদেশগুলোতে, যা কয়েক দশকের অতিরিক্ত উত্তোলনে ক্ষয়প্রাপ্ত ভূগর্ভস্থ জলাধারকে স্থিতিশীল করেছে এবং প্রায় ১৫ কোটি মানুষকে সেবা দিচ্ছে [Internet Geography, n.d.]। উত্তর চীনে সেচ-নির্ভর গম ও তুলা উৎপাদন টিকিয়ে রেখেছে, খরা-কবলিত গ্রামীণ অভিবাসন কমিয়েছে, এবং হেবেইয়ের মতো অঞ্চলে শিল্প সম্প্রসারণকে সম্ভব করেছে।

ভারতের ‘জাতীয় নদী সংযোগ পরিকল্পনা’ (NRLP)—যা এখনও মূলত পরিকল্পনায় আটকে আছে তাতে দাবি করা হচ্ছে সাড়ে তিন কোটি হেক্টর জমিতে সেচ হবে, ৩৪,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ তৈরী হবে, এবং পালা ক্রমে ঘটে চলা বন্যা ও খরার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়ে প্রতিবছর বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি থেকে দেশকে রক্ষা করবে [PMF IAS, 2025]। অস্ট্রেলিয়ায় মারে-ডার্লিং অববাহিকা ব্যবস্থা প্রতিবছর প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষি উৎপাদনকে সহায়তা করে; যুক্তরাষ্ট্রে টেনেসি-টম্বিগবি জলপথ পণ্য পরিবহন খরচ ৩০–৫০% কমিয়েছে [Drishti IAS, 2019]।
তবুও সব সময় এই লাভগুলি ভোগ করে ক্ষমতাবান ও সম্পদশালী অল্প সংখ্যক মানুষ। চীনের প্রকল্পের ফলে জল ও বিনিয়োগ শুধুমাত্র শহরের দিকেই প্রবাহিত হয়েছে; যদিও হুবেই ও হেনান অববাহিকার জল দেওয়া সম্প্রদায়গুলো জল পেয়েছে কম এবং সামান্য ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। ভারতের পোলাভরম প্রকল্প যা কিনা বৃহত্তর NRLP-এর পূর্বসূরি ছিল তা প্রায় ১,৫০,০০০ মানুষকে—প্রধানত আদিবাসী কৃষকদের—উচ্ছেদ করেছে। পুনর্বাসন তহবিল ব্যাপকভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়েছে বলে রিপোর্ট রয়েছে, ফলে অনেকেই ভূমিহীন শ্রমিকে পরিণত হয়েছে, যারা আগে যে আয় করতেন তার সামান্য অংশ উপার্জন করছে [BBC, 2025]।
ব্রাজিলের প্রোজেক্টো দে ইন্টেগ্রাসাও দো রিও সাও ফ্রান্সিসকো (PISF), যা উনবিংশ শতকে পরিকল্পিত হয়েছিল এবং অবশেষে ২০০৭ সাল থেকে নির্মাণ শুরু হয়, একটি সতর্কতামূলক সমান্তরাল উদাহরণ দেয়। ব্রাজিলের ইতিহাসে বৃহত্তম জল অবকাঠামো প্রকল্পটি—৪৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৩টি জলসেতু, ৯টি পাম্পিং স্টেশন এবং ২৭টি জলাধারসহ—উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চারটি খরাপীড়িত রাজ্যে সাও ফ্রান্সিসকো নদী থেকে জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছিল [Wikipedia, 2025]। তবে ২০২৪ সালে Land (MDPI)-এ প্রকাশিত একটি ক্ষেত্র সমীক্ষায় দেখা গেছে, পারাইবা ও পারনামবুকো-র গ্রামীণ গ্রামগুলিতে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো তাদের জীবিকা, পরিচয় ও ভূমি-অধিকার নিয়ে গভীর বিপর্যয়ের কথা জানিয়েছে, যেখানে ন্যায্য জলবণ্টনের ব্যবস্থা ছিল ‘অপর্যাপ্ত ও অপরিকল্পিত’ [Pontes et al., MDPI, 2024]। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা শুরু থেকেই সতর্ক করেছিলেন যে এ ধরনের জলবিভাজনের ফলে ঐতিহাসিকভাবে বিচ্ছিন্ন অববাহিকাগুলির মধ্যে আক্রমণাত্মক প্রজাতি ছড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, যা নদীগুলির নিজস্ব আলাদা আলাদা জীববৈচিত্র্যেকে ধ্বংস করে সমরূপীকরণ ঘটাতে পারে—অর্থাৎ স্বতন্ত্র নদীভিত্তিক জীবসমাজগুলোকে একরকম, দরিদ্র ও বৈচিত্র্যহীন সমষ্টিতে পরিণত করে [Vitule et al., Ambio, 2019]।

সুযোগ হারানোর খরচের যুক্তি হয়তো সবচেয়ে কঠোর। স্বাধীন বিশ্লেষণগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখায় যে বিকেন্দ্রীভূত বিকল্প—বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, ড্রিপ সেচ, জলাধার পুনরুদ্ধার—এক-দশমাংশ খরচে সমতুল্য বা আরও উন্নত জল নিরাপত্তা দিতে পারে, উচ্ছেদ ছাড়া, পরিবেশগত বিপর্যয় ছাড়া, কিংবা ভূরাজনৈতিক সংঘাত ছাড়া [Quartz, 2025; Drishti IAS, 2019]।
পরিবেশগত বিপর্যয়: জলবিদ্যা পুনর্লিখন
নদী কোনো পাইপ নয়। তা হলো একটি জীবন্ত ব্যবস্থা—যা হাজার হাজার বছর ধরে গঠিত হয়েছে পলি, প্রবাহ, তাপমাত্রা ও জীববিজ্ঞানের জটিল পরিবেশে। নদী সংযোগ এই সবকিছুকে অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে, যা কিনা মারাত্মক ভুল ও যার ফল ভয়াবহ।
প্রবাহ পরিবর্তনের ফলে বদ্বীপগুলি তাদেরকে টিকিয়ে রাখা পলি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং জলবিভাজন কিছু অঞ্চলে জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ আচ্ছাদের ৯০% ক্ষতি করেছে, ২০ লক্ষ হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি লবণাক্ত করেছে এবং বারবার মাছের গণমৃত্যু ঘটিয়েছে [Bihar PSC Notes, 2025]। চীনের SNWTP শুধু জলই নয়, ইয়াংৎসে নদীর দূষণও— যার মধ্যে রয়েছে ভারী ধাতু, নাইট্রেট, ওষুধের অবশিষ্টাংশ, সবকিছুকেই —পরিষ্কার উত্তরাঞ্চলীয় অববাহিকায় স্থানান্তর করেছে, যার ফলে শৈবাল বিস্তার ঘটেছে এবং জলজ খাদ্যজাল বিপর্যস্ত হয়েছে [Jia, 2025]।

জলবায়ু প্রসঙ্গটি নিয়ে বৈজ্ঞানিক আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। একটি পিয়ার-রিভিউড জলবিদ্যা সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে যে ভারতের প্রস্তাবিত নদী সংযোগ প্রকল্প দাতা অববাহিকায় ভূমি-আকাশ আর্দ্রতা প্রতিক্রিয়া চক্রকে ব্যাহত করে মৌসুমি বৃষ্টিপাতকে ১০–২০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে [Chauhan et al., 2022]। এমন এক দেশে যেখানে কৃষি বিপুলভাবে বৃষ্টিনির্ভর, এটি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়—এই প্রকল্পের নিজস্ব জলবিদ্যার ভেতরেই লেখা রয়েছে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।
কেন-বেতওয়া সংযোগ—ভারতের প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত আন্তঃঅববাহিকা নদী সংযোগ— যা পান্না টাইগার রিজার্ভকে হুমকির মুখে ফেলছে, যেখানে প্রায় ৯,০০০ হেক্টর প্রধান বনভূমি যা বাঘ, শকুন ও শতাধিক উদ্ভিদ প্রজাতির আবাসস্থল তা ডুবে যাবে বলে পরিবেশগত মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে [TwoCircles, 2025]। বৃহৎ বাঁধে সৃষ্ট জলাধারও উল্লেখযোগ্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী: নিমজ্জিত জৈব পদার্থের অ্যানায়েরোবিক পচন থেকে নির্গত মিথেন জাতীয় নিঃসরণ জাতীয় কার্বন নির্গমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর উষ্ণ আবহাওয়ায় খোলা খাল থেকে প্রতিবছর ৩০–৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার জল বাষ্পীভূত হয়—যার ফলে সংযোগ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ক্ষুণ্ণ হয় [NextIAS, 2025]।
মধ্য এশিয়া সবথেকে কঠিন ঐতিহাসিক শিক্ষা দেয়, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬০-এর দশকে তুলা চাষের জন্য আমু দরিয়া ও সির দরিয়া নদীর প্রবাহপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—যা নথিভুক্ত ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে গণ্য হয়। মাত্র তিন দশকের মধ্যে ৬৮,০০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত আরাল সাগর—যা একসময় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিল—তা সঙ্কুচিত হয়ে আগের আয়তনের মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ আকারে পরিণত হয়, বিষাক্ত লবণাক্ত অবশেষে ভেঙে যায়, আর পেছনে ফেলে যায় কীটনাশক-মিশ্রিত এক মরুভূমি, যা এখন আরালকুম নামে পরিচিত [Britannica, 2023; NPR, 2024]। ময়নাক বন্দরনগরী, যেখানে একসময় ৪০,০০০ মানুষ বাস করত, এখন বালির মধ্যে রয়েছে যা মরচে ধরা জাহাজে ঘেরা, যেগুলো কোনোরকম জলের উত্স থেকে বহু কিলোমিটার দূরে আটকে আছে। তাজিকিস্তানের জাতিসংঘ প্রতিনিধি যেমন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, ‘প্রতিটি বিশাল দেশেই একটি বিশাল পরিকল্পনা থাকে’—কিন্তু এর পরিণতি সবসময় সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয় [UN Chronicle, n.d.]। ২০২৪ সালে উজবেকিস্তান ‘জল সংরক্ষণের জরুরি ব্যবস্থা’ ঘোষণা করে, আর কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান যৌথ পরিবেশগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা থেকে অবশিষ্টাংশ পুনরুদ্ধারের ধীর প্রচেষ্টা শুরু হয় [Geopolitical Monitor, 2026]।
আফ্রিকা একই ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি। ট্রান্সআকুয়া প্রকল্প—প্রতি বছর কঙ্গো নদী অববাহিকা থেকে ১০০ বিলিয়ন ঘনমিটার জল সরিয়ে দ্রুত সঙ্কুচিত লেক চাদ পুনরায় পূর্ণ করার প্রস্তাব—সাহেল অঞ্চলের খরা ও বোকো হারাম-সংক্রান্ত অস্থিরতার সমাধান হিসেবে আফ্রিকান ইউনিয়ন ও আঞ্চলিক সরকারগুলোর নতুন আগ্রহ আকর্ষণ করেছে। তবে Territory, Politics, Governance (২০২২)-এ প্রকাশিত গবেষণা সতর্ক করেছে যে এ ধরনের প্রকল্পগুলো জলবিদ্যাগত প্রমাণের চেয়ে ভূরাজনৈতিক কাঠামো ও উন্নয়ন বয়ানের দ্বারা বেশি চালিত হয়, এবং কঙ্গো অববাহিকার নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র—যা পৃথিবীর সবচেয়ে জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি—তা মৌলিকভাবে বদলে যেতে পারে [Sayan & Nagabhatla, 2022]।

মানবিক মূল্য: কারা বহন করে বোঝা?
একই প্রবণতা সারা বিশ্ব জুড়ে দেখা যায়: নদী সংযোগ প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া মানুষরা কখনোই এর সুফল ভোগ করতে পারে না। তারা হলেন জেলে পরিবার, জীবিকা নির্বাহকারী কৃষক, আদিবাসী সম্প্রদায়—যাদের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক লেনদেনমূলক নয়, বরং জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে অংগাঙ্গীভাবে জড়িত।
চীনের SNWTP প্রকল্পে ৩,৪৫,০০০ মানুষকে পুনর্বাসিত করতে হয়েছে, যাদের অধিকাংশই পুনর্বাসনের পর পর্যাপ্ত বাসস্থান ও কর্মসংস্থান পাননি; কৃষিজমি এবং সম্প্রদায়গত বন্ধন ভেঙে যাওয়ার পর কিছু জল দান করা এলাকায় আত্মহত্যার হার বেড়ে যায় [OneYoungIndia, 2024]। ভারতের NRLP প্রকল্প সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে ১০ থেকে ৫০ লক্ষ মানুষ উচ্ছেদ হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে প্রধানত আদিবাসী সম্প্রদায় যারা বনভিত্তিক জীবিকা—যেমন মধু, মহুয়া ফুল, ঔষধি গাছপালা, নদীর মাছ—এর ওপর নির্ভরশীল। নগদ অর্থ বা শহুরে পুনর্বাসন প্যাকেজ দিয়ে এই জীবিকা পূরণ করা সম্ভব নয় [Scribd, 2026]।
ব্রাজিলে আদিবাসী অধিকার নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক দেখেছেন যে সাও ফ্রান্সিসকো প্রকল্পটির ফলে প্রভাবিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর—যেমন ট্রুকা, টুম্বালালা, পিপিপা ও কাম্বিওয়া—সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই অনুমোদিত হয়েছে, যা ব্রাজিলের সংবিধানের সেই শর্ত লঙ্ঘন করে যেখানে আদিবাসী ভূমিতে জলসম্পদ ব্যবহারের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন আবশ্যক [UNSR James Anaya, n.d.]। প্রায় ৮,০০০ আদিবাসী মানুষ সরাসরি প্রভাবিত হয়েছিলেন, তবুও এবিষয়ে সরকারের তৈরী করা পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর এর প্রভাবের কোনো উল্লেখই ছিল না।
এর পাশাপাশি উচ্ছেদের ফলে জনগোষ্ঠীর লিঙ্গভিত্তিক মাত্রা ধারাবাহিক ভাবে কম রিপোর্ট করা হয়। যখন নদীর গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং যার ফলে দাতা অববাহিকার সম্প্রদায়গুলির কুয়ো শুকিয়ে যায়, তখন মূলত: নারীদেরকেই জল বয়ে আনার জন্য আরো আরো দূরে হাঁটতে হয়—কখনো প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা। এর ফলে দারিদ্র্যের প্রভাব আরও তীব্র হয়: উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হয়, শারীরিক ক্লান্তি বাড়ে, এবং এই কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হওয়া মেয়েদের স্কুলে উপস্থিতিও কমে যায় [Scribd, 2026]।
নাগরিক সমাজের উত্থান: প্রতিবাদ থেকে নীতিগত সংকট
এগুলো কোনো বিমূর্ত অভিযোগ নয়। এগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও নাগরিক প্রতিরোধের সৃজনশীল শক্তি।

ভারতের মধ্যপ্রদেশে কেন-বেতওয়া সংঘাত আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য আনুষ্ঠানিক আইনি সুরক্ষা, উন্নয়নের চাপের মুখে টিকে থাকতে পারবে কি না, তার একটি নির্ধারক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্তও ছাতারপুর জেলায় ৫,০০০-এরও বেশি আদিবাসী পরিবার—যেখানে দৌধান বাঁধের নির্মাণ পূর্ণ গতিতে চলছে—সেখানে টানা একাদশ দিনের প্রতিবাদে অংশ নেয়। আদিবাসী নারীরা বুকসমান জলে দাঁড়িয়ে জল, মাটি, বায়ু, আগুন, আকাশের সাথে নিজেদের অচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা জানান দিতে ‘পঞ্চতত্ত্ব আন্দোলন’ নামে —পবিত্র পাঁচ উপাদানকে আহ্বান জানিয়ে এক বিক্ষোভে অংশ নেন [ANI, 2026; Free Press Journal, 2026]। আগের প্রতিবাদে নারীরা তাদের শিশুদেরকে বুকে নিয়ে ‘চিতা আন্দোলন’ নামে প্রতীকী চিতায় শুয়ে পড়েছিলেন—য ছিল একটি গান্ধীয় প্রতিবাদ, যা ভয়াবহ স্পষ্টতায় জানিয়ে দেয় যে তাদের সামনে চাপিয়ে দেওয়া পছন্দটি হলো : উচ্ছেদ অথবা মৃত্যু। সরাসরি প্রভাবিত গ্রাম সংখ্যা চব্বিশ; এর মধ্যে আটটি সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হবে [NewsGram, 2026]।
জয় কিষাণ সংঘটনের নেতৃত্বে থাকা কর্মী অমিত ভাটনাগর সংগ্রামটিকে স্পষ্টভাবে সাংবিধানিক অধিকার ও বন আইনকে কেন্দ্র করে উপস্থাপিত করেছিলেন, উল্লেখ করেছেন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের বনাধিকার সংক্রান্ত রায়, যা প্রকল্প প্রশাসন এখনও বাস্তবায়িত করেনি [Down to Earth, 2026]। আদালত সময়ে সময়ে নির্মাণের ধাপগুলো স্থগিত করেছে; দক্ষিণ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপল (SANDRP)-এর মতো এনজিওগুলো ব্যাপক পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (EIA) দাখিল করেছে, যা প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াগত ও বৈজ্ঞানিক ত্রুটিগুলো উন্মোচন করেছে [BBC, 2025]।
অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকা নাগরিক সমাজের প্রকৃত নীতিগত পরিবর্তন অর্জনের একটি বিরল উদাহরণ। কৃষক, পরিবেশবাদী সংগঠন ও আদিবাসী অস্ট্রেলীয় সম্প্রদায়ের একটি জোট সফলতার সঙ্গে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক জল উত্তোলন সীমা নির্ধারণের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে, আর পরবর্তী ‘বাইব্যাক’ কর্মসূচি পরিবেশগত প্রবাহে প্রায় ২,০০০ গিগালিটার জল ফিরিয়ে দিয়েছে [Drishti IAS, 2019]। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লামাথ নদীর বাঁধগুলো—যাদের জলবিভাজন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্যামন মাছের চলাচল ও প্রজননকে ধ্বংস করেছিল—২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়, যা আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাঁধ অপসারণে পরিণত হয়। ইউরক ও কারুক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের ফলেই এটি সম্ভব হয় [International Rivers, 2024]।
লাতিন আমেরিকায় বলিভিয়া, কলম্বিয়া ও ব্রাজিলে তৃণমূল পর্যায়ে জলের জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন নদীর বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বলিভিয়ার ‘জীবনের জন্য জল’ নামে নতুন কাঠামোগত আইন প্রণয়নের অসমাপ্ত সংগ্রাম, যা ২০১১ সাল থেকে স্থগিত রয়েছে, সেই একই কাঠামোগত টানাপোড়েনকে প্রতিফলিত করে যা সর্বত্র দৃশ্যমান: একদিকে খননশিল্প ও বৃহৎ কৃষির স্বার্থ, অন্যদিকে সম্প্রদায়ভিত্তিক জল শাসন [Transnational Institute, 2025]। উরুগুয়ের ২০২৩ সালের জল আন্দোলন—যা ভয়াবহ খরা ও কর্পোরেট জল ব্যবহারকারীদের প্রতি সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতির কারণে শুরু হয়েছিল — তা একটি স্লোগানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে: No es sequía, es saqueo— ‘এটি খরা নয়, এটি লুটপাট’ [Mongabay, 2023]।

ভিন্ন এক হিসাবের পথে
নদী সংযোগের বৈশ্বিক খতিয়ান ক্রমেই মেগা-প্রকল্পের পক্ষে ভারসাম্য করা কঠিন হয়ে উঠছে। অত্যধিক মাত্রায় ব্যয় বেড়ে গেছে—ভারতের NRLP আনুমানিক খরচ এক লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার কোটি টাকা থেকে সাড়ে চার লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছিয়েছে— অন্যদিকে সামাজিক-অর্থনৈতিক সুফলগুলো অনুমানযোগ্যভাবে গিয়ে পৌঁছায় তাদের কাছেই, যারা আগে থেকেই ক্ষমতা, অবকাঠামো ও পুঁজির সঙ্গে যুক্ত।[Quartz, 2025]। এদিকে পরিবেশগত ক্ষতি এমন হয়, যা প্রায়শই মানুষের সময়সীমার মধ্যে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
এর মানে এই নয় যে জলসংকট বাস্তবে ঘটছে না, কিংবা খরায় ভোগা জনগোষ্ঠীগুলো তাৎক্ষণিক গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়। এর মানে হলো ‘আমরা কীভাবে জল অন্যত্র সরাবো?’ এই প্রশ্নটির আগে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন আসা উচিত: ‘কারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর কারা তার জন্য মূল্য দেয়?’ আরাল সাগর সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে ৬৮,০০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে থাকা নীরবতায়।
নীতিনির্ধারকরা, নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক চাপের মুখে, এখন তা শুনতে শুরু করেছেন। সামনে এগোনোর পথের জন্য প্রয়োজন সব প্রভাবিত সম্প্রদায়ের বাধ্যতামূলক মুক্ত, পূর্ববর্তী ও অবগত সম্মতি (FPIC); নির্মাণ শুরু হওয়ার আগে কঠোর, স্বাধীন পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন; জলাধারের আকার ও অববাহিকা থেকে জল উত্তোলনের কঠিন আইনি সীমা; এবং বিকল্প পথে প্রকৃত বিনিয়োগ: ড্রিপ সেচ (যা জল ব্যবহার ৪০% পর্যন্ত কমাতে পারে), জলাধার পুনরুদ্ধার, ফসল বৈচিত্র্যকরণ, এবং বিকেন্দ্রীভূত বৃষ্টির জল সংরক্ষণ [Drishti IAS, 2019; IJRPR, n.d.]।

আসলে নদী ‘উদ্বৃত্ত’ বা ‘ঘাটতির’ কলসি নয়। নদী হলো একটা জীবন্ত প্রাকৃতিক অঞ্চলের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। আর যেসব সম্প্রদায় তাদের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকেন, তারা উন্নয়নের পথে বাধা নন — বরং উন্নয়নের লক্ষ্য তাদের জন্যই হওয়া প্রয়োজন। যখন এই যুক্তিটাই উল্টে দেওয়া হয়, তখন যা তৈরী হয় তা জলনিরাপত্তা নয়, বরং অবিচার। সেই সত্যটা যেদিন নীতি নির্ধারকরা বুঝবেন, সেদিন হয়তো নদীর জলে প্রকৌশল নয়, ন্যায্যতা খোঁজা হবে।
কিংশুক রায়
মন্তব্য