ভারত নাকি গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ধর্মমত নিরপেক্ষ এক এমন বৈচিত্র্যময় উপমহাদেশ যেখানে নদ-নদী সমুদ্র পাহাড় মরুভূমি সবুজ ঘাসের প্রান্তর ছড়িয়ে রয়েছে। যেই দেশের রয়েছে ঐতিহ্যপূর্ণ সমৃদ্ধ ইতিহাস। যে দেশে নজরুল থেকে রবীন্দ্রনাথ, রামমোহন থেকে ভগত সিং, প্রেমচাঁদ থেকে মহাশ্বেতা দেবী, সাবিত্রী বাঈ ফুলে থেকে ভীম আম্বেদকর, ক্ষুদিরাম থেকে সুভাষচন্দ্র, বীরসা মুন্ডা থেকে রাণী রাসমণি জন্মেছেন, বড় হয়েছেন, নিজেদের কর্মভূমি তৈরি করেছেন। যে দেশের গুরু শিষ্য পরম্পরা স্বপ্নের মত। যেখানে শিক্ষকদের স্থান মা-বাবার পরেই। যেখানে শিক্ষার্থী স্থান সন্তানের মতই। যে দেশে লেখা হয়েছে মাতৃদেবো ভব পিতৃদেবো ভব আচার্যদেবো ভবর মতো কথা। যে দেশে গল্পের মধ্যে দিয়ে এই গুরু শিষ্য ভালবাসার কথা প্রবাহিত হয়েছে যুগের পর যুগ ধরে।

উপরের কথাগুলি শুনতে বড় ভালো। বলতে বড় ভালো। বিশ্বাস করতেও ইচ্ছে করে। কথাগুলোর মধ্যে কোন মিথ্যা তো নেই। কিন্তু এই সত্যি কথার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে কী ভীষণ অন্ধকার। সেগুলিকেও তো দেখতে হবে। ইন্দ্রিয় খুলে রাখতে না পারলে, প্রশ্ন করতে না জানলে তো সমস্ত শিক্ষাই বৃথা বারবার বারবার বারবার প্রশ্ন করতে হবে নিজের মনে আলোচনা করতে হবে। চিন্তন মনন যুক্তিসহ বিশ্লেষণ ছাড়া কোন কিছুই তো শেখার সম্পূর্ণ হয় না, এই কথাই জেনেছি উপনিষদ থেকেও। অথচ কবে থেকে যেন এই প্রশ্ন করা, এই বিশ্লেষণ করা, বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা বন্ধ হয়ে গেল! মনের জানালা গুলোর কপাট এক এক করে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের আলো না ঢুকলে মনের ভেতর আলো জ্বলবে কি করে! রবি ঠাকুরের তোতা কাহিনী কথা, অচলায়তনের কথা আমরা কে না জানি। শিক্ষা যদি হয়ে যায় যন্ত্র তৈরি করার পদ্ধতি, তবে সেই শিক্ষা দিয়ে গড়ে উঠবে একের পর এক স্বার্থপর দৈত্য। অথবা এমন, যাদের মাথায় নিজের কোন বুদ্ধি থাকবে না, বোধ থাকবে না, কোন আবেগ থাকবে না, কোন স্বতন্ত্রতা থাকবে না। থাকবে সারি দিয়ে কতগুলি এক ধরনের যন্ত্র। যারা শুধুমাত্র উপর তলার নির্দেশ পালন করে।
যবে থেকে শুরু হল জন্মের ভিত্তিতে ভাগ, ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ, যবে থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, সেই সময় থেকে শুরু হল নিচের তলায় মানুষের প্রতি নির্যাতন বঞ্চনা প্রতারণা। মানুষ যেদিন থেকে নিজের ক্ষমতাগুলি বুঝতে শিখলো, সেই সময় থেকেই শুরু হয়ে গেছিল ক্ষমতার ভিত্তিতে ভাগাভাগি। সেই ভাগাভাগি বেড়ে গেল সম্পত্তি বা সম্পদের উপর ভিত্তি করে। সেই ভাগাভাগি আস্তে আস্তে ছড়িয়ে গেল ধর্ম জাতি বর্ণ লিঙ্গ অর্থ এই সবকিছুকে ভিত্তি করে। ভাগ হতে হতে আমরা এখন এমন একটি ক্ষুদ্র সীমার মধ্যে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছি যেখানে নিজের বাইরে অন্য কারো স্থান নেই সহিষ্ণুতা এখন শূন্যে গিয়েছে গেছে অন্যের কথা শোনার সময় আর কারো কাছে নেই যে যার মত করে অন্যদের মেরে ধরে উপরে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে যেন ছোটবেলার সেই সাপ মই খেলার শক্ত বোর্ড। যেখানে তিন পা এগোলে সামনে পড়বে জিভ লকলক করা একটা সাপ যে তোমাকে সুযোগ পেলেই সরাৎ করে নামিয়ে আনবে। প্রয়োজন হলে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করবে না।
ক্ষমতা যার হাতে থাকে সে অন্যদের পোকামাকড় মনে করে। চিরকাল। ক্ষমতার এটাই মূল কথা। আর এই কথাটাই আক্ষরিকভাবে বেরিয়ে এলো এক ক্ষমতাবান ব্যক্তির মুখ থেকে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাবার পর হইচই করা ছাত্ররা বা যারা হইচই করছে তারা সব আরশোলের মত। যার মুখ দিয়ে এই কথাটি বেরিয়েছিল সে কল্পনাও করতে পারেনি দুঃস্বপ্নেও সত্যি সত্যি তৈরি হয়ে যাবে ককরোচ জনতা পার্টি। মুহূর্তে তার অনুসরণকারীদের সংখ্যা লক্ষ লক্ষ হয়ে যাবে। তারা শুধু আড়ালে লুকিয়ে থাকবে না। চলে আসবে একেবারে রাজধানীর বুকের ওপর। শুরু করবে অনশন। সেই অনশনে যোগ দেবে সোনাম ওয়াকচুকের মতো মানুষও। সারাদিন তাদের সমর্থনে উত্তাল হয়ে উঠবে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী আর তাদের বাবা-মারা বেরিয়ে আসবে রাস্তায়। আরশোলাদের সংখ্যায় এমন দ্রুত বৃদ্ধি পাবে তা সরকার ভাবতে পারেনি।

সরকার এখন নিঃসন্দেহে ভয় পাচ্ছে ভয় পাচ্ছে বলেই বর্বরোচিত আক্রমণ নামিয়ে আনছে। একটা স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর নির্মমভাবে লাঠিচার্জ হচ্ছে প্যালেট গান ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবহার করা হচ্ছে পেরেক দেওয়া লাঠি। আর আক্রমণ যত বাড়ছে লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে। পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে। পাবলিক সার্ভেন্ট নয়। তারা সরকারি চাকর। নয়তো এমন ইনকাম হবে মেরে রক্ত বার করে দিয়ে নিষ্ক্রিয় ভাবে বলতে পারত না যে আমরা কিছু করিনি। ওরা স্ট্যাম্পেড হয়েছে।
আমরা এখনো জানি না কি হতে চলেছে। শিক্ষা মন্ত্রী পদত্যাগ করবে কিনা, মোদি সরকারের পতন হবে কিনা, ছাত্র-ছাত্রীদের এবং যুবশক্তির এই বিপুল জোরালো আন্দোলন নতুন কোন দিশা দেখাবে কিনা। কিন্তু মনে এইটুকু আশা তৈরি হচ্ছে যে এখনো এই নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা যাদের আমরা স্বার্থপর প্রজন্ম বলি যারা নিজেদের ছাড়া অন্য কারুর কথা ভাবে না বলি তারা কিন্ত সকলের জন্য ভবিষ্যতের জন্য বেরিয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে এইটুকুই। সবাই মিলে চিৎকার করে বলি, আজাদী আজাদী।
Be the first to join the discussion.